- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মানব ইতিহাসের গতিধারা পরিবর্তনে কার্ল মার্কসের চিন্তাধারা এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা।
১। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: মার্কসীয় দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। কার্ল মার্কসের মতে, সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনি রূপ নির্ধারণ করে। ইতিহাসের যেকোনো পরিবর্তন বা বিপ্লবের পেছনে মূলত অর্থনৈতিক কারণ এবং উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন কাজ করে। বস্তুর পরিবর্তনই সমাজের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য হয়।
২। শ্রেণি সংগ্রাম: মানব সমাজের ইতিহাস মূলত শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। সমাজে সর্বদা দুটি প্রধান বিরোধী শ্রেণি বিদ্যমান থাকে, যথা শোষক এবং শোষিত শ্রেণি। পুঁজিবাদী সমাজে এই দুই শ্রেণির স্বার্থের সংঘাত অনিবার্য রূপ নেয়। এই নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সমাজ এক স্তর থেকে অন্য স্তরে পদার্পণ করে।
৩। উদ্বৃত্ত মূল্য: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক তত্ত্ব হলো উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব। শ্রমিকের শ্রমের ফলে যে অতিরিক্ত মূল্য বা সম্পদ উৎপাদিত হয়, পুঁজিবাদী মালিকরা তা আত্মসাৎ করে। এই আত্মসাৎকৃত অর্থই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য, যা পুঁজিপতিদের আরও ধনী করে এবং শ্রমিকদের চরম শোষণের দিকে ঠেলে দেয়।
৪। বিপ্লবের অনিবার্যতা: পুঁজিবাদী শোষণের অবসান ঘটাতে মার্কসীয় তত্ত্ব বিপ্লবের ওপর জোর দেয়। শান্তিপূর্ণ উপায়ে পুঁজিপতিদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে মার্কস মনে করতেন। তাই শোষিত শ্রমিক শ্রেণির ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
৫। সর্বহারার একনায়কত্ব: পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যবস্থায় শ্রমিক শ্রেণি রাষ্ট্রের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেবে। পুঁজিপতিদের পুনর্বাসন ওcounter-revolution প্রতিরোধ করতে এই একনায়কত্ব অত্যন্ত জরুরি। এটি সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে যাওয়ার একটি রূপান্তরকালীন মাধ্যম মাত্র।
৬। শ্রেণিহীন সমাজ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি সম্পূর্ণ শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে সমাজে কোনো ধনী-দরিদ্র বা মালিক-শ্রমিক ভেদাভেদ থাকবে না। সব মানুষ সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে এবং সামাজিক বৈষম্যের চিরতরে অবসান ঘটবে। মানুষের পরিচয় হবে কেবলই একজন মুক্ত উৎপাদক হিসেবে।
৭। রাষ্ট্রহীন সমাজ: সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত স্তর বা সাম্যবাদে পৌঁছালে রাষ্ট্রের আর কোনো প্রয়োজন থাকবে না। মার্কসবাদীদের মতে, রাষ্ট্র হলো এক শ্রেণির দ্বারা অন্য শ্রেণিকে শোষণ করার যন্ত্র। যখন সমাজে কোনো শ্রেণিই থাকবে না, তখন শোষণ করার যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
৮। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ: পুঁজিপতিদের শোষণের মূল উৎস হলো উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা। মার্কসীয় সমাজতন্ত্রে এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। সমস্ত কলকারখানা, জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সমগ্র সমাজের তথা রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে।
৯। সামাজিক মালিকানা: ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে উৎপাদনের সমস্ত উপাদানের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হবে। সমাজের সকল সম্পদ যৌথভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হবে। এর ফলে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সমাজের প্রত্যেকের প্রয়োজন অনুযায়ী বণ্টন করা সম্ভব হবে। ব্যক্তিগত মুনাফার পরিবর্তে সামাজিক কল্যাণই হবে উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য।
১০। পরিকল্পিত অর্থনীতি: পুঁজিবাদী বাজারের বিশৃঙ্খলা দূর করতে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রে পরিকল্পিত অর্থনীতির কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা পরিচালিত হবে। জনগণের প্রকৃত চাহিদা মূল্যায়ন করে পণ্য উৎপাদন করা হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক মন্দা বা অপচয়ের কোনো সুযোগ থাকবে না।
১১। শ্রমের মর্যাদা: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রে শ্রমকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থায় অলস বসে থেকে অন্যের শ্রমে বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রত্যেকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করবে এবং কাজের পরিমাপ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। শ্রমই হবে মানুষের সামাজিক মর্যাদা মূল্যায়নের একমাত্র প্রধান মাপকাঠি।
১২। বুর্জোয়া সংস্কৃতির অবসান: পুঁজিবাদী সমাজে প্রচলিত শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ মূলত বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে। মার্কসীয় সমাজতন্ত্র এই শোষক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে শ্রমিক শ্রেণির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে মানবতাবোধ, সাম্য এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে। সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে সর্বজনীন কল্যাণে।
১৩। আন্তর্জাতিকতাবাদ: মার্কসীয় সমাজতন্ত্র জাতীয়তাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকতাবাদের কথা বলে। বিশ্বের সকল দেশের শোষিত শ্রমিকদের এক হওয়ার আহ্বান জানায় এই দর্শন। মার্কসের মতে, শ্রমিকের কোনো দেশ নেই, তাদের শত্রু আন্তর্জাতিক পুঁজিপতি শ্রেণি। তাই বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সংহতি অপরিহার্য।
১৪। ধর্মের অব্যাখ্যা: মার্কসীয় দর্শনে ধর্মকে মানব চেতনার একটি ভ্রান্ত রূপ হিসেবে দেখা হয়েছে। মার্কস ধর্মকে ‘জনগণের আফিম’ বলে অভিহিত করেছেন, যা মানুষকে বাস্তব শোষণ ভুলে পরকালের সুখে মগ্ন রাখে। সমাজতন্ত্রে মানুষকে ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞানমনস্ক ও বাস্তবমুখী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালানো হয়।
১৫। মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা: মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের মূল সুর হলো প্রকৃত মানবতাবাদের প্রতিষ্ঠা করা। পুঁজিবাদী সমাজ মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে এবং মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। সমাজতন্ত্র মানুষকে শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে তার সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটায়। এটি মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে দেয়।
১৬। শোষণহীন সমাজ: এই সমাজ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো সব ধরনের শোষণের চিরস্থায়ী অবসান ঘটানো। মানুষ দ্বারা মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক শোষণের কোনো সুযোগ এখানে থাকবে না। একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
১৭। যোগ্যতার নীতি: সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার প্রাথমিক স্তরে বণ্টনের মূল নীতি হবে কাজের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, ‘প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং প্রত্যেকে তার কাজ অনুযায়ী প্রতিদান পাবে।’ এই নীতি অলসতাকে নিরুৎসাহিত করে এবং সমাজের প্রতিটি মানুষকে উৎপাদনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, মার্কসীয় সমাজতন্ত্র কেবল একটি অর্থনৈতিক মতবাদ নয়, বরং মানবমুক্তির এক পূর্ণাঙ্গ দর্শন। এটি শোষিত মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখায়। নানা সমালোচনা ও বাস্তবায়নের জটিলতা সত্ত্বেও, বিশ্বের বুকে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মার্কসীয় আদর্শ আজীবন এক অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে টিকে থাকবে।