- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কার্ল মার্কসের অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো তাঁর ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব’ (Theory of Surplus Value)। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণি কীভাবে শোষিত হয় এবং ধনকুবেররা কীভাবে শ্রমিকের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে, মার্কস তাঁর এই তত্ত্বে অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিকভাবে তা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।
১। পটভূমি: কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত ‘ডাস ক্যাপিটাল’ গ্রন্থে এই তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী ইউরোপীয় পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক শোষণকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি এই তত্ত্বটি নির্মাণ করেন। এটি মূলত ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডোর শ্রমমূল্য তত্ত্বের একটি পরিমার্জিত এবং বৈপ্লবিক রূপ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভেতরের অন্তর্নিহিত শোষণ ও সংকটকে উন্মোচিত করাই ছিল মার্কসের এই তত্ত্বের মূল লক্ষ্য।
২। মূল ভিত্তি: এই তত্ত্বের প্রধান ভিত্তি হলো শ্রমের মূল্য বা শ্রমের পণ্য উৎপাদনকারী ক্ষমতা। মার্কসের মতে, যেকোনো পণ্যের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হয় সেটি তৈরি করতে কতটা সামাজিক প্রয়োজনীয় শ্রম ব্যয় হয়েছে তার ওপর। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকের শ্রমকে একটি সাধারণ পণ্য হিসেবে কেনাবেচা করা হয়। পুঁজিবাদের এই অদ্ভুত নিয়মটিই মূলত উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরির পথ প্রশস্ত করে দেয়। ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রমিকের উৎপাদনী শক্তিই সমস্ত মূল্যের একমাত্র উৎস হিসেবে কাজ করে।
৩। শ্রমশক্তি: মার্কসের মতে, শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি করে না, বরং সে বাজারে তার ‘শ্রমশক্তি’ বা কাজ করার ক্ষমতা বিক্রি করে। পুঁজিবাদী মালিক নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে শ্রমিকের এই কাজ করার ক্ষমতা বা শক্তিটুকু সাময়িকভাবে কিনে নেয়। শ্রমশক্তি নিজেই এমন একটি বিশেষ পণ্য, যা ব্যবহারের মাধ্যমে তার নিজের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। এই শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহারই পুঁজিবাদী বাজারে নতুন নতুন মূল্যের জন্ম দিয়ে থাকে।
৪। মজুরি নির্ধারণ: পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারিত হয় তার জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খরচের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, একজন শ্রমিক এবং তার পরিবার বেঁচে থাকার জন্য এবং পুনরায় কাজ করার শক্তি পাওয়ার জন্য যতটুকু খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুর মূল্যই মজুরি হিসেবে দেওয়া হয়। একে মার্কস ‘শ্রমশক্তির মূল্য’ বা জীবনধারণের ব্যয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। পুঁজিবাদী মালিকেরা কখনই শ্রমিককে তার কাজের প্রকৃত মূল্যের সমান মজুরি প্রদান করে না।
৫। প্রয়োজনীয় শ্রমকাল: একজন শ্রমিক প্রতিদিনের কাজের একটি নির্দিষ্ট অংশে তার মজুরির সমপরিমাণ মূল্য উৎপাদন করে। দিনের এই নির্দিষ্ট সময়টুকুকে কার্ল মার্কস ‘প্রয়োজনীয় শ্রমকাল’ (Necessary Labor Time) বলে অভিহিত করেছেন। ধরা যাক, একজন শ্রমিক ৪ ঘণ্টা কাজ করে তার দৈনিক মজুরির সমমূল্যের পণ্য উৎপাদন করে ফেলে। এই সময়ের মধ্যে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি শ্রমিকের নিজের জীবনধারণের ব্যয়ের সমান হয়। এর মাধ্যমে শ্রমিকের দৈনিক বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদাটুকু পূরণ করা সম্ভব হয়।
৬। অতিরিক্ত শ্রমকাল: প্রয়োজনীয় শ্রমকাল শেষ হওয়ার পরও শ্রমিককে কারখানায় মালিকের অধীনে আরও কয়েক ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে কাজ করতে হয়। এই বাড়তি সময়টুকুকে কার্ল মার্কস ‘অতিরিক্ত শ্রমকাল’ (Surplus Labor Time) বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই অতিরিক্ত সময়ে শ্রমিক যে পণ্য বা মূল্য উৎপাদন করে, তার জন্য তাকে কোনো মজুরি দেওয়া হয় না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শ্রমিকের কাছ থেকে মালিক আদায় করে নেয়। পুঁজিবাদী শোষণের মূল চালিকাশক্তি এখানেই লুকিয়ে থাকে।
৭। উদ্বৃত্ত মূল্য: অতিরিক্ত শ্রমকালের মধ্যে শ্রমিক যে বাড়তি মূল্য সৃষ্টি করে, তা-ই হলো আসল উদ্বৃত্ত মূল্য। সহজ কথায়, শ্রমিকের উৎপাদিত মোট মূল্য থেকে তার বেঁচে থাকার জন্য প্রদত্ত মজুরি বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটিই উদ্বৃত্ত মূল্য। এই বাড়তি মূল্যের ওপর শ্রমিকের কোনো অধিকার থাকে না। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুঁজিবাদী মালিকের পকেটে চলে যায়। শ্রমিকের এই বিনা মজুরির শ্রমই পুঁজিবাদের মূল মুনাফা হিসেবে গণ্য হয়।
৮। শোষণের হার: প্রয়োজনীয় শ্রমকাল এবং অতিরিক্ত শ্রমকালের অনুপাত থেকেই কারখানায় শোষণের হার পরিমাপ করা যায়। মার্কসের মতে, উদ্বৃত্ত মূল্যকে প্রয়োজনীয় শ্রম বা মজুরি দিয়ে ভাগ করলে এই শোষণের হার পাওয়া যায়। এই হার যত বেশি হবে, শ্রমিকের ওপর পুঁজিবাদের শোষণের মাত্রা ততটাই তীব্র ও অমানবিক হবে। পুঁজিবাদী মালিকেরা সবসময় এই শোষণের হারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এর ফলে শ্রমিক ক্রমান্বয়ে আরও দরিদ্র হতে থাকে।
৯। পুঁজির রূপান্তর: উদ্বৃত্ত মূল্যই পরবর্তীতে মালিকের হাতে গিয়ে নতুন পুঁজিতে রূপান্তরিত বা সঞ্চিত হয়। এই সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে মালিক আরও বড় কারখানা স্থাপন করে এবং আরও বেশি শ্রমিক নিয়োগ করে। এভাবে উদ্বৃত্ত মূল্য ক্রমাগত পুঁজিপতিদের সম্পদ বৃদ্ধি করতে থাকে এবং সমাজে পুঁজির পাহাড় গড়ে ওঠে। শ্রমিকের নিজের শ্রমের ফলই শেষ পর্যন্ত তার নিজের বিরুদ্ধে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। একেই মার্কস পুঁজির পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়া বলেছেন।
১০। শ্রেণি বৈষম্য: উদ্বৃত্ত মূল্যের এই অসম বণ্টনের কারণেই সমাজে তীব্র শ্রেণি বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। একদিকে শ্রমিক শ্রেণি দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার পরও ক্রমশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও নিঃস্ব হতে থাকে। অন্যদিকে, অলস পুঁজিপতি বা মালিক শ্রেণি শ্রমিকের রক্ত জল করা শ্রমের মুনাফায় অতি দ্রুত ধনী হতে থাকে। এর ফলে সমাজে মূলত দুটি চরম ও বৈরী শ্রেণির জন্ম হয়—বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েত। এই দুই শ্রেণির অর্থনৈতিক দূরত্ব সমাজকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
১১। শ্রমের বিচ্ছিন্নতাবোধ: এই ব্যবস্থার কারণে শ্রমিক তার নিজের উৎপাদিত পণ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ওপর শ্রমিকের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানা অধিকার থাকে না। পণ্যটি শ্রমিকের কাছে একটি অচেনা এবং বৈরী শক্তিতে পরিণত হয়। মার্কস একে ‘শ্রমের বিচ্ছিন্নতাবোধ’ বা Alienation বলে অভিহিত করেছেন। নিজের সৃজনশীল শ্রম যখন অন্য কারও সম্পদে পরিণত হয়, তখন শ্রমিকের মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় ঘটে।
১২। প্রযুক্তির ভূমিকা: পুঁজিপতিরা উদ্বৃত্ত মূল্য বাড়াতে কারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকের প্রয়োজনীয় শ্রমকাল কমিয়ে অতিরিক্ত শ্রমকালকে আরও দীর্ঘ করা। প্রযুক্তির ফলে কম সময়ে বেশি পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়, যা মালিকের উদ্বৃত্ত মূল্যের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই যান্ত্রিকীকরণ শ্রমিকের কাজের সুযোগ কমিয়ে দেয় এবং তাদের আরও বেশি যন্ত্রের দাসে পরিণত করে তোলে।
১৩। বেকারত্ব সৃষ্টি: প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ এবং তীব্র শোষণের ফলে সমাজে একটি বিশাল বেকার বাহিনী তৈরি হয়। কার্ল মার্কস এই অংশটিকে ‘শিল্পের সংরক্ষিত বাহিনী’ (Industrial Reserve Army) বলে উল্লেখ করেছেন। বাজারে বেকারের সংখ্যা বেশি থাকলে মালিকেরা খুব কম মজুরিতে শ্রমিক খাটানোর সুযোগ পায়। এই বেকারত্বকে পুঁজি করে মালিকেরা কর্মরত শ্রমিকদের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে শ্রমিকের দরকষাকষির ক্ষমতা একদম শেষ হয়ে যায়।
১৪। বাজার সংকট: উদ্বৃত্ত মূল্য ব্যবস্থার কারণে পুঁজিবাদী সমাজে মাঝে মাঝেই তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা বা সংকট দেখা দেয়। কারণ, শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। অথচ কারখানায় বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হয়ে বাজারে জমা হতে থাকে। এই অতি-উৎপাদন এবং কম ক্রয়ক্ষমতার অসঙ্গতি পুরো বাজার ব্যবস্থাকে অচল করে দেয়। এই অর্থনৈতিক সংকট পুঁজিবাদের এক অনিবার্য এবং চিরস্থায়ী রোগ।
১৫। শ্রমিক আন্দোলন: এই তীব্র শোষণ এবং বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে একসময় শ্রেণিচেতনার উদয় হয়। শ্রমিকেরা বুঝতে পারে যে তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ছাড়া এই শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো বিকল্প পথ নেই। ফলস্বরূপ, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অধিকার আদায়ের জন্য বড় বড় শ্রমিক আন্দোলন ও ধর্মঘটের সূত্রপাত ঘটে। উদ্বৃত্ত মূল্যের এই শোষণই মূলত শ্রমিকদের বিপ্লবের পথে ধাবিত হতে বাধ্য করে।
১৬। পুঁজিবাদের পতন: কার্ল মার্কস মনে করতেন, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্বের ভেতরের এই চরম শোষণই একদিন পুঁজিবাদের ধ্বংস ডেকে আনবে। পুঁজিবাদ নিজের ভেতরেই নিজের ধ্বংসের বীজ বা ‘কবর খননকারী’ শ্রমিক শ্রেণিকে লালন করে। চরম শোষণ ও অর্থনৈতিক সংকটের একপর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণি একতাবদ্ধ হয়ে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব ঘোষণা করবে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর চূড়ান্ত পতন ঘটবে বলে মার্কস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
১৭। সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর: পুঁজিবাদের পতনের পর সমাজে একটি সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এই নতুন সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপায়ের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন আর কোনো ব্যক্তিগত উদ্বৃত্ত মূল্য থাকবে না এবং মানুষের শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। প্রত্যেকের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগের নীতিতে সমাজ পরিচালিত হবে।
উপসংহার: কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব মূলত পুঁজিবাদী সমাজের ভেতরের আসল অর্থনৈতিক শোষণকে সবার সামনে উন্মোচিত করার একটি অনন্য দর্পণ। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে শ্রমিকের শ্রমকে সস্তায় লুটে নিয়ে পুঁজিপতিরা ধনী হয় এবং সমাজকে চরম বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেয়। বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই তত্ত্বটি প্রমাণ করে যে, মানব মুক্তির জন্য শোষণের এই পুঁজিবাদী চক্র ভাঙা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রমিক অধিকারের লড়াইয়েও মার্কসের এই তত্ত্ব সমভাবে প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।