- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: শ্রীলঙ্কার (পূর্বতন সিলন) তামিল সমস্যা দেশটির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যার রেশ আজও কাটেনি। এই জাতিগত সংঘাত শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয়, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিভেদ। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী ও সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকার এবং পরিচয়ের প্রশ্নে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা-ই কালক্রমে গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়। এই সমস্যার মূলে থাকা প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো, যা শ্রীলঙ্কার সংঘাতপূর্ণ অতীত বুঝতে সাহায্য করবে।
১।ঔপনিবেশিক বিভেদ: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে তামিলদের প্রশাসন ও শিক্ষাব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ ও বঞ্চনার বোধ সৃষ্টি করে। এই বৈষম্যমূলক নীতিই স্বাধীনতার পর সিংহলীদের মধ্যে জাতিগত জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর সিংহলীরা তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিশোধ নিতে সরকারিভাবে এমন নীতি গ্রহণ করতে শুরু করে, যা তামিলদের প্রান্তিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রাথমিক বিভাজনই পরবর্তী সংঘাতের বীজ বপন করেছিল।
২।ভাষাগত বৈষম্য: ১৯৫৬ সালে ‘সিংহলী একমাত্র ভাষা আইন’ (Sinhala Only Act) পাস হওয়ার ফলে তামিলদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এই আইন সিংহলী ভাষাকে দেশের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যার সরাসরি ফলস্বরূপ সরকারি চাকরি, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তামিলরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়। এই নীতি তামিলদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পরিচয়কে অস্বীকার করে তাদের ওপর সিংহলী আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার শামিল ছিল, যা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে জোরদার করে।
৩।নাগরিকত্বের প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে ‘সিলন নাগরিকত্ব আইন’ পাস করে ‘ভারতীয় তামিল’ (পাহাড়ি অঞ্চলের বাগান শ্রমিক) নামে পরিচিত প্রায় দশ লক্ষ মানুষের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। এই পদক্ষেপের ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও এই আইনটি মূলত ভারতীয় তামিলদের লক্ষ্য করে করা হয়েছিল, কিন্তু এটি সামগ্রিকভাবে তামিল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিরাপত্তা ও আস্থাভঙ্গের জন্ম দেয়। একটি নবীন রাষ্ট্রের এই ধরনের কঠোর এবং বৈষম্যমূলক আইন তামিলদের মনে স্থায়ীভাবে সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি করে।
৪।সরকারি কর্মে বৈষম্য: সরকারি চাকরিতে নিয়োগ এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিংহলী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, যা উচ্চশিক্ষিত তামিল যুবকদের মধ্যে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করে। শিক্ষাব্যবস্থায় ভর্তির ক্ষেত্রেও কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, যা আপাতদৃষ্টিতে সমতা বিধানের জন্য হলেও বাস্তবে এর মাধ্যমে তামিলদের উচ্চশিক্ষা এবং ভালো চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এই আর্থ-সামাজিক বঞ্চনা তরুণ তামিলদেরকে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করে, কারণ তারা দেখছিল যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দাবি পূরণ হওয়া অসম্ভব।
৫।সংবিধানের কাঠামো: ১৯৭২ এবং ১৯৭৮ সালের সংবিধানে শ্রীলঙ্কাকে একটি ‘একক রাষ্ট্র’ (Unitary State) হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেখানে ক্ষমতা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে। তামিলরা বারবার একটি ফেডারেল কাঠামো বা বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানালেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। এই ক্ষমতা বন্টনের অসমতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের একচেটিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা তামিলদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে যে, তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যা তাদের বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যায়।
৬।ধর্মীয় বিভেদ: শ্রীলঙ্কায় সিংহলী জনগোষ্ঠী প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তামিল জনগোষ্ঠী মূলত হিন্দু ধর্মের অনুসারী, যা দুই জাতির মধ্যে আরও একটি গভীর বিভাজন রেখা টেনে দেয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ধর্মকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায় তামিলদের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের অনুভূতি তীব্র হয়। এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ সংঘাতকে আরও আবেগপ্রবণ ও কঠিন করে তোলে। যখন ধর্মীয় পরিচয় জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়, তখন সংঘাতের সমাধান করা আরও দুরূহ হয়ে পড়ে।
৭।ভূমি অধিগ্রহণ: উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সিংহলী বসতি স্থাপনকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিতর্কিতভাবে ভূমি পুনর্বণ্টন নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এই নীতিকে তামিলরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমির ওপর জবরদখল হিসেবে দেখত, যা তাদের কৃষি এবং সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করে। তামিল-অধ্যুষিত এলাকায় সরকারিভাবে সিংহলী বসতি স্থাপন স্থানীয় জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তন করে তামিলদের আরও সংখ্যালঘু করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যা তাদের প্রতিরোধকে উসকে দেয়।
৮।সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা: সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)-এর মতো শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এই গোষ্ঠীগুলো উত্তর ও পূর্ব শ্রীলঙ্কায় একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র (‘তামিল ইলম’) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে লড়াই শুরু করে। এলটিটিই-এর সামরিক শক্তি এবং নৃশংস কার্যকলাপ জাতিগত সমস্যাকে একটি পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ দেয়, যা দীর্ঘ তিন দশক ধরে দেশকে অস্থিতিশীল করে রাখে।
৯।রাজনৈতিক আলোচনার ব্যর্থতা: সংঘাত নিরসনে সরকার ও তামিল নেতাদের মধ্যে বহুবার আলোচনা হলেও, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং দুই পক্ষের চরমপন্থীদের অনমনীয় মনোভাবের কারণে কোনো টেকসই সমাধান আসেনি। সিংহলী নেতারা প্রায়শই তামিলদের দাবিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতেন। ফলস্বরূপ, আলোচনার টেবিলে অর্জিত ছোটখাটো সাফল্যও চরমপন্থীদের হস্তক্ষেপে ভেস্তে যায়, যা সংঘাতের পুনরাবৃত্তিকে অনিবার্য করে তোলে।
উপুসংহার: শ্রীলঙ্কার তামিল সমস্যা ছিল বহুস্তরীয় একটি সংকট, যা ঔপনিবেশিক নীতি, ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব, নাগরিকত্বের বঞ্চনা, এবং ক্ষমতা বন্টনের অন্যায্যতা থেকে জন্ম নিয়েছে। যদিও ২০০৯ সালে সামরিকভাবে এলটিটিই-এর পরাজয়ের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে, তবুও তামিলদের রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি এখনও অমীমাংসিত। শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে শ্রীলঙ্কা সরকারকে অবশ্যই সকল নাগরিকের সম-অধিকার নিশ্চিত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে তামিলদের সংস্কৃতি ও ভাষা সুরক্ষিত থাকবে।

