- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সমাজতন্ত্র হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় বা যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সমাজে শ্রেণীভেদ দূর করে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখায়। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই মতবাদটি যেমন বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তেমনি এর বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক।
১। সাম্য প্রতিষ্ঠা: সমাজতন্ত্রের প্রধান লক্ষ্য হলো সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দূর করা। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান অধিকার এবং সুযোগ লাভ করে। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর হাতে পুঁজি বা সম্পদ কুক্ষিগত হতে দেওয়া হয় না। ফলে সমাজে শ্রেণীহীন ও শোষণমুক্ত একটি মানবিক পরিবেশ তৈরি হয়, যা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে।
২। মৌলিক অধিকার: এই ব্যবস্থায় নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করে। কোনো ব্যক্তিই যেন এই ন্যূনতম সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করা হয়। এটি জনগণের জীবনযাত্রার একটি নিরাপদ মান বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে মানুষ তীব্র অভাবের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পায়।
৩। বেকারত্ব দূরীকরণ: সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মক্ষম নাগরিকের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা সরকারের আইনি দায়িত্ব। এখানে কৃত্রিম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে হুট করে শ্রমিক ছাঁটাই করার সুযোগ থাকে না। প্রত্যেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পায় এবং রাষ্ট্র তার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করে। ফলে সমাজে বেকারত্বের মতো অভিশাপ পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়।
৪। পরিকল্পিত অর্থনীতি: পুঁজিবাদী বাজারের মতো এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা থাকে না। রাষ্ট্র একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে দেশে কী পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হবে এবং কীভাবে তা বণ্টন করা হবে। এর ফলে সম্পদের অপচয় রোধ হয় এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। জনগণের প্রকৃত চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে সমস্ত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৫। শোষণ অবসান: পুঁজিপতিদের দ্বারা শ্রমিক শ্রেণীর ওপর যে তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ চলে, সমাজতন্ত্রে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শ্রমের সঠিক মূল্য এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। উৎপাদিত উদ্বৃত্ত মূল্য কোনো ব্যক্তির পকেটে না গিয়ে সমাজের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। এর ফলে শ্রমিকরা তাদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার ফিরে পায় এবং আত্মমর্যাদা পায়।
৬। নিখরচায় শিক্ষা: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষাকে কোনো বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, বরং এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। মেধা অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সমান সুযোগ পায়, যা একটি শিক্ষিত ও সচেতন জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে। অর্থের অভাবে কারও শিক্ষা জীবন ব্যাহত হয় না।
৭। বিনামূল্যে চিকিৎসা: জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্র নিজের কাঁধে তুলে নেয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সমাজতন্ত্রের অন্যতম বড় গুণ। এখানে নামী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য কোনো বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে কখনো সর্বস্বান্ত বা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে না।
৮। সম্পদের বণ্টন: সমাজতন্ত্রে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ জাতীয় সম্পদ পুঞ্জীভূত হতে দেওয়া হয় না। রাষ্ট্রের নীতি অনুযায়ী সমস্ত জাতীয় আয় ও সম্পদ জনগণের কল্যাণে সুষমভাবে বণ্টন করা হয়। এই ব্যবস্থার ফলে সমাজে চরম দারিদ্র্য বা অতিরিক্ত বিলাসিতার কোনো স্থান থাকে না। একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং শান্তিময় অর্থনৈতিক পরিবেশ সমাজ জুড়ে বজায় থাকে।
৯। একচেটিয়া রোধ: মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বড় বড় কোম্পানিগুলো যেভাবে সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া বাজার তৈরি করে, সমাজতন্ত্রে তা অসম্ভব। কারণ সমস্ত বৃহৎ শিল্প, কলকারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থা সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি বা শোষণ করতে পারে না। ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে সবসময় তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারেন।
১০। নারী উন্নয়ন: সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের পুরুষদের সমকক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাদের সমঅধিকার দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমকাজের জন্য সমমজুরি প্রদান করা হয়। এছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ডে-কেয়ার বা শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন করে নারীদের কর্মজীবন সহজ করা হয়। এর ফলে সমাজে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি অত্যন্ত দ্রুত ঘটে।
১১। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব: সমাজতন্ত্রের অন্যতম বড় দোষ হলো এখানে ব্যক্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। রাষ্ট্র সবকিছুর নিয়ন্তা হওয়ায় নাগরিকরা নিজেদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ পায় না। সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা বা বিরোধিতা করার অধিকার এখানে থাকে না। ফলে ব্যক্তি মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ অনেক ক্ষেত্রে রুদ্ধ হয়ে পড়ে।
১২। একদলীয় শাসন: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত একটি মাত্র রাজনৈতিক দল দ্বারা কঠোরভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। এখানে কোনো বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বা বিরোধী দলের অস্তিত্বের সুযোগ দেওয়া হয় না। সমস্ত ক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট দলের শীর্ষ নেতাদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে। এর ফলে শাসন ব্যবস্থায় স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল থাকে।
১৩। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: রাষ্ট্রের সমস্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সরকারি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় আমলাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। প্রতিটি ছোটখাটো কাজের জন্য দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা কাজে স্থবিরতা আনে। এই অতিরিক্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক সময় সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সাধারণ মানুষ নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়।
১৪। দক্ষতার অবমূল্যায়ন: এই ব্যবস্থায় মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অনেক সময় বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে কাজের কঠোর তদারকি না থাকায় কর্মচারীদের মধ্যে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। অনেক সময় অযোগ্য ব্যক্তিরা দলীয় প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়। এর ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
১৫। প্রণোদনার ঘাটতি: সমাজতন্ত্রে কঠোর পরিশ্রমী এবং অলস ব্যক্তির আয়ের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না। অতিরিক্ত কাজের জন্য আলাদা কোনো বড় অর্থনৈতিক মুনাফা বা বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এই ব্যক্তিগত লাভের আশা না থাকায় মানুষ কঠোর পরিশ্রম করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। নতুন কিছু আবিষ্কার বা ব্যবসার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হয় না।
১৬। পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা: রাষ্ট্র নিজেই পণ্য উৎপাদন করায় বাজারে প্রতিযোগিতার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে ভোক্তারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী হরেক রকমের পণ্যের মধ্য থেকে বাছাই করার সুবিধা পান না। বাজারে পণ্যের গুণগত মান উন্নত করার জন্য যে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন, তা এখানে অনুপস্থিত থাকে। সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহকৃত নির্দিষ্ট ও সীমিত ডিজাইনের পণ্যই ব্যবহার করতে হয়।
১৭। অর্থনৈতিক স্থবিরতা: দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করায় এবং মুক্ত বাজারের প্রতিযোগিতা না থাকায় অর্থনীতি একঘেয়ে হয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারের পরিবর্তনের সাথে এই রাষ্ট্রগুলো দ্রুত নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন না হওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা একসময় ভেঙে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী, এই অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণেই অনেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতন ঘটেছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সমাজতন্ত্র হলো মানব কল্যাণের একটি চমৎকার তাত্ত্বিক দর্শন, যা সামাজিক সমতা ও মানুষের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। তবে এর বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব একে বিতর্কিত করে তুলেছে। গুণ ও দোষের এই দ্বন্দ্বের কারণেই আধুনিক বিশ্বে সমাজতন্ত্রের পাশাপাশি মিশ্র অর্থনীতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে সমাজতন্ত্রের কল্যাণকর দিকগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।