- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বে রাষ্ট্রের ধারণা ও শাসনব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। প্রাচীনকালের ‘ক্ষুদ্র’ বা ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে’। নাগরিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গিয়ে আধুনিককালে সরকারের কর্মপরিধি দিন দিন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সরকারের কর্মপরিধি বৃদ্ধির কারণসমূহ
১। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠন: আধুনিক যুগে প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে। এর ফলে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব এখন সরকারের ওপর বর্তায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের কাজের ক্ষেত্র ও পরিধি পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২। জনসংখ্যা বৃদ্ধি: বর্তমান বিশ্বে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসন, কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য সরকারকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হচ্ছে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের লক্ষে সরকারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করতে হয়।
৩। অর্থনৈতিক উন্নয়ন: দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের দায়িত্ব সরাসরি সরকারের কাঁধে থাকে। শিল্পায়ন, কৃষি আধুনিকীকরণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব নীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে করতে হয়। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কারণে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক পরিধি এবং কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
৪। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা: সমাজের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব। আধুনিক জটিল সমাজে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে অপরাধ প্রতিরোধ, বিচার ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্মদক্ষতা বাড়াতে সরকারকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সম্পদ ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে।
৫। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি: একবিংশ শতাব্দীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতি সরকারের কাজের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স বা ই-গভর্নেন্স চালুর মাধ্যমে নাগরিক সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। এছাড়া সাইবার অপরাধের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণে সরকারকে বিশাল ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।
৬। শিক্ষা বিস্তার: একটি মেধাভিত্তিক ও দক্ষ জাতি গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং উচ্চশিক্ষার প্রসারে সরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ফলে সরকারের কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
৭। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন: দেশের নাগরিকদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য হাসপাতাল নির্মাণ, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, টিকাদান কর্মসূচি সফল করা এবং সংক্রামক ব্যাধি দূরীকরণে সরকার কাজ করছে। স্বাস্থ্য খাতের এই বিপুল ব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের জনবল ও কাজের পরিধি উভয়ই অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
৮। অবকাঠামো নির্মাণ: দেশের যোগাযোগ ও যাতায়াত ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, রেলপথ, বিমানবন্দর এবং গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্পগুলো সরকার একাই বাস্তবায়ন করে থাকে। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল থাকে এবং সরকারের কর্মব্যস্ততা বাড়ে।
৯ | সামাজিক নিরাপত্তা: সমাজে পিছিয়ে পড়া, অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আধুনিক কল্যাণকামী সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং দুস্থদের জন্য খাদ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার বিশাল বাজেট বরাদ্দ রাখে। এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি ও তা সফলভাবে পরিচালনার কারণে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেড়েছে।
১০। শ্রমিক কল্যাণ: দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমিক সমাজ। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগের কাজ সরকারকে করতে হয়। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শ্রমবাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়কে সর্বদা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়।
১১। পরিবেশ সুরক্ষা: জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বনায়ন কর্মসূচি, নদী দূষণ রোধ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকারের বন ও পরিবেশ বিভাগের কাজের পরিধি অনেক বেড়েছে।
১২। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও খরা সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি, দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে হয়। এই জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকারকে স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করতে হয়েছে।
১৩। বৈদেশিক সম্পর্ক: বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, রেমিট্যান্সের বাজার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহির্বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে চুক্তি সম্পাদন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
১৪। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য: বাজারে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখা সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃত্রিম সংকট রোধ এবং বাজার মনিটরিং বা তদারকি করার জন্য সরকারকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হয়। টিসিবির মাধ্যমে কম মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে সরকার সাধারণ ভোক্তার অধিকার রক্ষা করে।
১৫। সংস্কৃতি ও ক্রীড়া: দেশের যুবসমাজকে মাদক ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ, স্টেডিয়াম তৈরি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা সরকার করে থাকে। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ব্যাপক কাজ করছে।
১৬। জাতীয় প্রতিরক্ষা: দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পরম কর্তব্য। আধুনিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গঠন, উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এই যুগে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে গিয়ে সরকারের কাজের গুরুত্ব বাড়ছে।
১৭। নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণ: গ্রামীণ জনসংখ্যার একটি বড় অংশ উন্নত জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত শহরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে আবাসন সমস্যা, যানজট এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নানাবিধ নাগরিক সংকট তৈরি হচ্ছে। সুপরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা প্রদানের জন্য সরকারকে পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের কাজের পরিধি বাড়াতে হয়েছে।
১৮। আইন প্রণয়ন: পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে সংগতি রেখে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হয়। যুগের প্রয়োজনে পুরোনো আইনের সংশোধন, কর কাঠামো সংস্কার এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় সংসদকে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করার জন্য সরকারের বিচার ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক রাষ্ট্রের মূল দর্শনই হলো জনকল্যাণ সাধন করা। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং চাহিদার ধরণও অনেক বদলে গিয়েছে। ফলশ্রুতিতে, নাগরিকদের একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও উন্নত জীবন উপহার দেওয়ার মহৎ লক্ষ্যেই সরকারের কর্মপরিধি আজ এত ব্যাপক ও বিস্তৃত রূপ ধারণ করেছে।