- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: জার্মান দার্শনিক জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল বিশ্ব দর্শনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর ‘ভাববাদ’ বা ‘আইডিয়ালিজম’ দর্শন জগতের এক জটিল ও গভীর তত্ত্ব, যা পরম সত্তা এবং মানুষের চিন্তার বিকাশকে ব্যাখ্যা করে। হেগেলের মতে, বাহ্যিক জগতের সমস্ত বস্তু আসলে এক পরম চেতনারই প্রকাশ এবং এই জগত সর্বদা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বিবর্তিত হচ্ছে।
১। পরম ভাববাদ: হেগেলের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো এই পরম ভাববাদ বা পরম চেতনা। তাঁর মতে, পরম মন বা ঈশ্বরই হলো এই মহাবিশ্বের একমাত্র প্রকৃত সত্তা। জড় জগত বা বাহ্যিক প্রকৃতি এই পরম চেতনারই এক বাহ্যিক রূপ প্রকাশ মাত্র। আমাদের চারপাশের সবকিছুই সেই এক পরম মনের ইচ্ছায় এবং নিয়মে পরিচালিত ও বিকশিত হচ্ছে।
২। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি: হেগেল বিশ্বাস করতেন যে জগতের সমস্ত বিকাশ একটি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে থাকে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি প্রধান স্তর রয়েছে, যা থিসিস, অ্যান্টি-থিসিস এবং সিন্থেসিস নামে পরিচিত। একটি ধারণার বিপরীতে আরেকটি বিরোধী ধারণার সৃষ্টি হয় এবং সংঘাতের মাধ্যমে একটি নতুন সত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমেই জগতের সমস্ত প্রগতি এবং পরিবর্তন সাধিত হয়ে থাকে।
৩। ভাব ও জড়: হেগেল ভাব বা চেতনাকে জড় বস্তুর চেয়ে অনেক বেশি প্রধান ও মৌলিক বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, জড় জগত নিজের থেকে নিজে কখনো সৃষ্টি বা বিকশিত হতে পারে না। চেতনার তাগিদেই জড়ের উৎপত্তি এবং চেতনা জড়কে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে নিজের প্রকাশ ঘটায়। অতএব, ভাবই হলো মূল চালিকাশক্তি এবং জড় হলো কেবল তার প্রকাশ মাধ্যম।
৪। যুক্তি এবং বাস্তব: হেগেলের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, যা কিছু যুক্তিসঙ্গত তাই বাস্তব এবং যা বাস্তব তাই যুক্তিসঙ্গত। এর অর্থ হলো, জগতের সবকিছুই একটি পরম যৌক্তিক নিয়ম বা বুদ্ধিমত্তা মেনে চলে। কোনো কিছুই নিয়মহীন বা আকস্মিক নয়, বরং সব ঘটনার পেছনেই গভীর যুক্তি থাকে। মানুষের বুদ্ধি যখন উন্নত হয়, তখন সে জগতের এই অন্তর্নিহিত যুক্তিকে বুঝতে পারে।
৫। ইতিহাসের দর্শন: হেগেল ইতিহাসকে কেবল রাজা-বাদশাদের যুদ্ধ বা ঘটনার সমষ্টি হিসেবে দেখেননি, বরং একে চেতনার বিকাশ বলেছেন। তাঁর মতে, ইতিহাস হলো পরম মনের ক্রমান্বয়ে নিজেকে প্রকাশ করার একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতিটি ঐতিহাসিক যুগ তার পূর্ববর্তী যুগের চেয়ে আরও উন্নত এবং যুক্তিসঙ্গত ভাব প্রকাশ করে। এভাবে মানব ইতিহাস ক্রমান্বয়ে একটি পরম লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে।
৬। স্বাধীনতার বিকাশ: হেগেলের মতে, মানব ইতিহাসের মূল লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হলো মানুষের স্বাধীনতার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো। আদিম যুগে কেবল একজন মাত্র মানুষ স্বাধীন ছিল, যা ছিল স্বৈরতন্ত্রের রূপ। পরবর্তীতে গ্রিক ও রোমান যুগে কিছু মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল। আধুনিক যুগে এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল মানুষের স্বাধীনতা ও চেতনার পূর্ণ প্রকাশ ঘটছে।
৭। বিশ্ব আত্মা: হেগেল ‘বিশ্ব আত্মা’ বা ‘গাইস্ট’ নামক একটি ধারণার প্রবর্তন করেন যা সমগ্র মহাবিশ্বে বিরাজমান। এই বিশ্ব আত্মা কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি প্রতিনিয়ত গতিশীল এবং আত্ম-উপলব্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রকৃতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানুষের চিন্তার মধ্য দিয়ে এই বিশ্ব আত্মা নিজেকে ধাপে ধাপে আবিষ্কার করে। যখন এই আত্মা পূর্ণ জ্ঞান লাভ করে, তখনই তার বিকাশ সম্পূর্ণ হয়।
৮। রাষ্ট্রের ধারণা: হেগেলের ভাববাদে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত পবিত্র এবং পরম একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রকে পৃথিবীতে ‘ঈশ্বরের পদচারণা’ বা ঈশ্বরের জীবন্ত প্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন। নাগরিকরা রাষ্ট্রের অধীনে থেকেই কেবল তাদের প্রকৃত স্বাধীনতা এবং নৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটাতে পারে। রাষ্ট্রের স্বার্থই হলো নাগরিকদের সর্বোচ্চ স্বার্থ এবং ব্যক্তির চেয়ে রাষ্ট্র সবসময় বড়।
৯। সমাজ ও ব্যক্তি: হেগেল মনে করতেন যে ব্যক্তি মানুষের অস্তিত্ব সমাজ এবং রাষ্ট্রের বাইরে কখনো পূর্ণতা পায় না। সমাজ মানুষকে নৈতিকতা, সংস্কৃতি এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের পথ প্রদর্শন করে থাকে। ব্যক্তি এককভাবে অহংকারী হতে পারে, কিন্তু সমাজের অংশ হলে সে বৃহত্তর কল্যাণের কথা ভাবে। তাই ব্যক্তির অধিকার সবসময় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের সাথে যুক্ত থাকে।
১০। ধর্মের স্থান: হেগেলের দর্শনে ধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চ মর্যাদাশীল স্থান রয়েছে। তাঁর মতে, ধর্ম হলো পরম সত্যকে অনুভূতির মাধ্যমে বা প্রতীকের সাহায্যে প্রকাশ করার একটি মাধ্যম। ধর্মের মাধ্যমে মানুষ পরম আত্মার সাথে নিজের একাত্মতা অনুভব করতে সক্ষম হয়। খ্রিস্টধর্মকে তিনি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম বলেছেন, কারণ এখানে ঈশ্বর মানুষের রূপ ধারণ করেছেন।
১১। শিল্পের মূল্যায়ন: হেগেল শিল্পকলাকে পরম সত্য বা ভাব প্রকাশের প্রাথমিক ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, সঙ্গীত এবং কাব্যের মাধ্যমে মানুষ পরম চেতনাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মনের আবেগ ও আধ্যাত্মিক ভাবনার একটি সুন্দর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে শিল্পের চেয়ে দর্শনকে তিনি সত্য প্রকাশের আরও উচ্চতর মাধ্যম বলেছেন।
১২। দর্শনের ভূমিকা: হেগেলের মতে, দর্শন হলো জ্ঞান এবং চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর যেখানে পরম আত্মা সম্পূর্ণ সচেতন হয়। শিল্প ও ধর্মের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দর্শন সম্পূর্ণ খাঁটি ও যৌক্তিক ধারণার মাধ্যমে সত্যকে তুলে ধরে। দর্শন কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, এটি হলো কোনো একটি যুগের চিন্তার নির্যাস। সংক্ষেপে, দর্শন হলো নিজের যুগকে চিন্তার ফ্রেমে বন্দি করার একটি যৌক্তিক প্রক্রিয়া।
১৩। বিবর্তন ও প্রগতি: হেগেলের ভাববাদী দর্শন এক গতিশীল বিশ্ব ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে স্থবিরতার কোনো স্থান নেই। জগতের প্রতিটি বস্তু এবং ধারণাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আরও উন্নত রূপ ধারণ করছে। এই প্রগতি কেবল সামনের দিকেই যায় এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয়। কোনো পতন বা বিপর্যয়ও আসলে বৃহত্তর প্রগতির একটি অংশ হিসেবে কাজ করে।
১৪। জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবাদ: হেগেল জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞাতা এবং জ্ঞেয় বস্তুর মধ্যে কোনো চিরন্তন পার্থক্য নেই। মানুষের মন যখন কোনো বস্তুকে জানে, তখন সে আসলে নিজেরই এক রূপকে বাহ্যিক জগতে দেখতে পায়। জগতের সবকিছুই যেহেতু পরম মনের অংশ, তাই মানুষের মন জগতকে সম্পূর্ণরূপে জানতে সক্ষম। জ্ঞান হলো আসলে পরম চেতনার নিজেকে নিজে জানার একটি প্রক্রিয়া।
১৫। বিমূর্ত ও মূর্ত: হেগেল কেবল বিমূর্ত বা কাল্পনিক ধারণার চেয়ে মূর্ত বা বাস্তব রূপকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো সত্য কেবল মনের ভেতর লুকিয়ে থাকলে তা পূর্ণাঙ্গ সত্য হয়ে ওঠে না। সত্যকে অবশ্যই বাস্তব জগতে, সমাজে এবং ইতিহাসে রূপ পরিগ্রহ করতে হবে। মূর্ত সত্য হলো এমন এক ধারণা যা নিজের অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।
১৬। পরাবিদ্যার স্বরূপ: হেগেলের পরাবিদ্যা বা মেটাফিজিক্স সম্পূর্ণভাবে ভাববাদী এবং যৌক্তিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি প্রচলিত ঈশ্বরতত্ত্বকে একটি নতুন যৌক্তিক রূপ দেন যেখানে ঈশ্বর জগত থেকে আলাদা কেউ নন। ঈশ্বর বা পরম সত্তা এই জগতের ভেতরেই তাঁর লীলা এবং বিকাশ ঘটিয়ে চলেছেন। জগতকে বাদ দিয়ে ঈশ্বরের কোনো আলাদা অস্তিত্ব হেগেলের দর্শনে কল্পনা করা যায় না।
১৭। নৈতিকতার আদর্শ: হেগেল নৈতিকতাকে কেবল ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ বিবেক বা ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর মতে, প্রকৃত নৈতিকতা হলো সামাজিক প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং রাষ্ট্রের আইনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত রূপ। সমাজ স্বীকৃত নিয়মকানুন পালন করার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃত নৈতিক জীবন গঠন করতে পারে। ব্যক্তিস্বার্থ যখন সমষ্টিগত কল্যাণের সাথে মিশে যায়, তখনই নৈতিকতার চরম আদর্শ অর্জিত হয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, হেগেলের ভাববাদী দর্শন মানব চিন্তার ইতিহাসে এক অতুলনীয় এবং যুগান্তকারী সৃষ্টি। তিনি জগত, ইতিহাস, রাষ্ট্র এবং মানব চেতনাকে একটি সুসংহত যৌক্তিক সুতোয় বেঁধেছিলেন। যদিও পরবর্তীতে তাঁর এই কঠিন ভাববাদের তীব্র সমালোচনা হয়েছে এবং মার্ক্সীয় বস্তুবাদের জন্ম হয়েছে, তবুও বিশ্ব দর্শনকে গভীরভাবে বুঝতে হলে হেগেলের ভাববাদের গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।