- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সুশাসন ও গণতন্ত্র আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার দুটি অবিচ্ছেদ্য ধারণা। একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে সুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম, আর এই সুশাসন নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রয়েছে নানা মতভেদ। একমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সুশাসনের একমাত্র চাবিকাঠি নাকি অন্য কোনো উপাদানের উপস্থিতি এখানে মুখ্য, তা গভীরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
১। জনগণের অংশগ্রহণ: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। যখন দেশের সাধারণ মানুষ নিজেদের মতামত প্রকাশের অবাধ অধিকার লাভ করে, তখন প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। জনগণের এই সক্রিয় অংশগ্রহণই মূলত একটি দেশের সুশাসনের ভিত্তিপ্রস্তর মজবুত করে এবং সরকারকে জনকল্যাণমুখী কাজে বাধ্য করে।
২। আইনের শাসন: সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আইনের চোখে সবার সমান অধিকার এবং তা নিশ্চিত করতে গণতন্ত্রের বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের সংবিধানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়, যার ফলে শাসক ও শাসিত উভয়ই একই আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়—এই নীতিটি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যায় ও অপরাধ প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পায় এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
৩। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: গণতন্ত্র ক্ষমতার একক কেন্দ্রীকরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং শাসন ক্ষমতাকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে দেয়। কেন্দ্র থেকে শুরু করে একদম স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই সরকারি সেবা লাভ করতে পারে। এই বিকেন্দ্রীকরণের ফলে প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা দূর হয় এবং তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায়।
৪। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: একটি সমাজ কতটা উন্নত ও সুশাসিত, তা বোঝা যায় সেখানকার মানুষের বাকস্বাধীনতার পরিমাপ দেখে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদ মাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকরা নির্ভয়ে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও গঠনমূলক মতামত প্রকাশ করতে পারে। এই স্বাধীন পরিবেশ সরকারকে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করতে সাহায্য করে এবং প্রশাসনে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব রুখে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
৫। জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকারকে তার প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে এবং জাতীয় সংসদে জবাবদিহি করতে হয়। যেহেতু নির্দিষ্ট সময় পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের মুখোমুখি হতে হয়, তাই শাসকরা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে ভয় পায়। এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা দুর্নীতি রোধে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে কাজ করে এবং সুশাসনের পথকে সুগম করে।
৬। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা: সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি যা কেবল গণতন্ত্রেই সম্ভব। নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে বিচারকরা যখন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা পায়। দুর্বল ও ধনীদের বৈষম্য দূর করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে বিচারবিভাগের এই স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৭। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: নিয়মিত এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব। যখন একটি দেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকার পরিবর্তন হয়, তখন সেখানে চরমপন্থী আন্দোলন বা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সুশাসন বজায় রাখার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
৮। মানবাধিকার রক্ষা: মানবতাবোধ ও মানুষের মৌলিক অধিকারের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার এবং সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকার গণতন্ত্রে সুরক্ষিত থাকে। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের এসব মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, তখনই সমাজে প্রকৃত সুশাসন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
৯। দুর্নীতি প্রতিরোধ: সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় বা বাধা হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি যা সমাজকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী তথ্য অধিকার আইন, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এবং গণমাধ্যমের নজরদারির কারণে দুর্নীতি সহজে লুকিয়ে রাখা যায় না। স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ থাকার ফলে সরকারি অর্থের অপচয় কমে এবং সম্পদের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত হয়।
১০। সংখ্যালঘুদের অধিকার: একটি রাষ্ট্রে বসবাসকারী পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা সুশাসনের একটি বড় মাপকাঠি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরুদের পাশাপাশি সব ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা বাড়ায় এবং জাতিগত বৈষম্য ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা দূর করতে সাহায্য করে।
১১। শক্তিশালী বিরোধীদল: কার্যকর গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হলো একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং গঠনমূলক ভূমিকা পালনকারী বিরোধীদলের উপস্থিতি। সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধীদল সরকারের ভুল নীতি ও জনবিরোধী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনা করতে পারে। এই নিয়মিত গঠনমূলক সমালোচনা সরকারি দলকে সবসময় সতর্ক ও কর্মঠ রাখে, যা পরোক্ষভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে।
১২। যোগ্য নেতৃত্ব: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দের যোগ্য ও সৎ প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে। বংশানুক্রমিক বা জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলের কোনো সুযোগ না থাকায় কেবল জনগণের ভালোবাসাপ্রাপ্ত নেতারাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। একজন দূরদর্শী ও জনবান্ধব নেতাই পারেন রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে দেশে সুশাসনের আদর্শ উদাহরণ সৃষ্টি করতে।
১৩। অর্থনৈতিক মুক্তি: সুশাসনের সাথে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে এবং দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রতিযোগিতামূলক ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্য দূর হয় এবং দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হওয়া সহজ হয়।
১৪। সামাজিক ন্যায়বিচার: সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাকে সামাজিক ন্যায়বিচার বলা হয়। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো সাধারণত লোকরঞ্জনী ও কল্যাণমুখী বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে, যা সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সহায়তায় কাজ করে। সম্পদ যখন সমাজের সব স্তরে সুষমভাবে বণ্টিত হয়, তখন সামাজিক অপরাধ কমে এবং সুশাসনের আদর্শ রূপটি প্রকাশ পায়।
১৫। প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন: সুশাসন কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত করার চেষ্টা করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করে, তখন সুশাসন স্থায়ী রূপ লাভ করে।
১৬। জাতীয় ঐক্য: একটি দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য থাকা আবশ্যক। গণতন্ত্র সব মত ও পথের মানুষকে একসঙ্গে বসে দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি উন্মুক্ত ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ তৈরি করে দেয়। এই জাতীয় ঐকমত্যের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার হয় এবং সবাই মিলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে।
১৭। বিকল্প শাসনব্যবস্থা: সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কেবল গণতন্ত্রই নয়, কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন শাসনব্যবস্থাতেও সুশাসনের কিছু উপাদান দেখা গেছে। যেমন অনেক দেশে নিয়ন্ত্রিত বা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে চমৎকার সুশাসন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে সেসব ব্যবস্থায় নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই থেকে যায় যা কাম্য নয়।
১৮। বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা: বর্তমান আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক বেশি সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা পেয়ে থাকে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এসব দেশের সাথে ব্যবসা ও সাহায্য চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই বৈশ্বিক সহযোগিতা দেশের সার্বিক অবকাঠামো ও সুশাসন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে প্রত্যক্ষ সাহায্য করে।
সমাপ্ত: পরিশেষে বলা যায়, তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই সুশাসন ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। যদিও কিছু অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাময়িক শৃঙ্খলা বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন দেখা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সুশাসন, মানবাধিকার এবং টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তাই নিঃশঙ্ক চিত্তে বলা যায়, একমাত্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই নাগরিকের পূর্ণাঙ্গ সুশাসন নিশ্চিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য পূর্বশর্ত।