- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক শাসনে উত্তরণের প্রক্রিয়া বা বেসামরিকীকরণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তৎকালীন দুই সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এইচ এম এরশাদ নিজ নিজ ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে এবং দীর্ঘস্থায়ী করতে এই প্রক্রিয়া শুরু করেন। উভয়ের লক্ষ্য এক হলেও তাদের কৌশল ও কার্যক্রমে কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল।
জিয়া ও এরশাদের বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ার তুলনামূলক আলোচনা
১। ক্ষমতা গ্রহণ: জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক চরম বিশৃঙ্খল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে, জেনারেল এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ ছিল সময়ের দাবি ও পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতা, কিন্তু এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ ছিল সুপরিকল্পিত সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
২। দল গঠন: জিয়াউর রহমান প্রথমে জাগদল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোকে একত্রিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন। এর বিপরীতে, এইচ এম এরশাদ প্রথমে জনদল এবং পরবর্তীতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও দলছুট নেতাদের নিয়ে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ায় এক ধরণের জাতীয়তাবাদী ঐক্যের প্রয়াস ছিল, কিন্তু এরশাদের দল গঠন ছিল মূলত ক্ষমতার দলছুট রাজনীতিকদের এক ছাতার নিচে আনা।
৩। গণভোট আয়োজন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে নিজের ১৯-দফা কর্মসূচির পক্ষে জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য একটি হ্যাঁ/না গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। একইভাবে জেনারেল এরশাদও ১৯৮৫ সালে তাঁর সামরিক নীতি ও নেতৃত্বের বৈধতা প্রমাণে দেশে একটি বিতর্কিত গণভোটের আয়োজন করেন। তবে জিয়ার গণভোটে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা থাকলেও এরশাদের গণভোটটি ব্যাপক জালিয়াতি ও ভোটারবিহীন প্রহসন হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল।
৪। মতাদর্শিক ভিত্তি: জিয়াউর রহমান তাঁর বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ায় ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত করে মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেন। অন্যদিকে, এরশাদ আরও এক ধাপ এগিয়ে ইসলামকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করার চেষ্টা করেন। জিয়ার আদর্শ ছিল জাতীয় সংহতি কেন্দ্রিক, আর এরশাদের আদর্শ ছিল মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির রাজনৈতিক ব্যবহার।
৫। সংবিধান সংশোধন: জিয়াউর রহমান সামরিক অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা দিতে এবং নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে সংবিধানের ঐতিহাসিক পঞ্চম সংশোধনী পাস করিয়েছিলেন। ঠিক একই কায়দায় জেনারেল এরশাদ তাঁর সামরিক শাসনের সব কর্মকাণ্ডকে আইনি সুরক্ষা দিতে সংবিধানে সপ্তম সংশোধনী আনেন। উভয় শাসকই নিজেদের অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ডকে বৈধ করতে দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানকে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করেছিলেন।
৬। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে নিজেকে বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দেশে একটি সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করেন এবং জয়ী হন। অন্যদিকে, এরশাদ ১৯৮৬ সালে প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন সত্ত্বেও একক আধিপত্যে একটি বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক রূপ নেন। জিয়ার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা থাকলেও এরশাদের নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ একতরফা।
৭। সংসদ নির্বাচন: জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে দেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে সব বড় দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা ঘটান। এর বিপরীতে, এরশাদ ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে দুটি সংসদ নির্বাচন করলেও সেগুলো ছিল ব্যাপক কারচুপি ও ভোটার উপস্থিতিশূন্য। জিয়ার সংসদ ছিল প্রাণবন্ত ও কার্যকর, কিন্তু এরশাদের সংসদ ছিল মূলত রবার স্ট্যাম্প বা আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান।
৮। স্থানীয় সরকার: জিয়াউর রহমান গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় নেতৃত্ব জোরদারে ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা চালু করেন যা তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এর বিপরীতে, জেনারেল এরশাদ প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ‘উপজেলা ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করেন যা অত্যন্ত যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত। জিয়ার ফোকাস ছিল গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর, আর এরশাদের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় পর্যায়ে একটি স্থায়ী অনুগত রাজনৈতিক শ্রেণি তৈরি করা।
৯। উন্নয়ন কর্মসূচি: জিয়াউর রহমান গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে খাল খনন কর্মসূচি, গণশিক্ষা ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার ডাক দিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করেন। অপরদিকে, এরশাদ মূলত রাস্তাঘাট, কালভার্ট, স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং ঢাকাকেন্দ্রীক বিলাসী অবকাঠামোগত উন্নয়নে বেশি মনোযোগী ছিলেন। জিয়ার উন্নয়ন ছিল উৎপাদনমুখী ও কৃষিভিত্তিক, আর এরশাদের উন্নয়ন ছিল দৃশ্যমান বাহ্যিক অবকাঠামো ও অনুদানভিত্তিক।
১০। বিরোধীদের দমন: জিয়াউর রহমান তাঁর শাসন আমলে সামরিক ও বেসামরিক বিরোধীদের কঠোর হস্তে দমন করলেও রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এরশাদ তাঁর দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনামলে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চরম নির্যাতন ও কারাদণ্ড নীতি অনুসরণ করেন। জিয়ার দমন-পীড়ন ছিল প্রধানত সেনানিবাস কেন্দ্রিক, পক্ষান্তরে এরশাদের দমন-পীড়ন ছিল সরাসরি রাজপথ ও রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর।
১১। অর্থনৈতিক নীতি: জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এরশাদও এই বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া চালু রাখেন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নানামুখী সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। তবে জিয়ার সময়ে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার চেষ্টা থাকলেও এরশাদের সময়ে দেশে একচেটিয়া ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা লুণ্ঠনমূলক অর্থনীতির বিকাশ ঘটে।
১২। পররাষ্ট্র নীতি: জিয়াউর রহমান সার্ক (SAARC) গঠনের উদ্যোগ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এবং মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের এক অনন্য ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। এরশাদও জিয়ার এই পররাষ্ট্র নীতি বজায় রাখেন এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণের ভিত্তি স্থাপন করেন। জিয়ার পররাষ্ট্র নীতি ছিল দূরদর্শী ও স্বাধীন, যেখানে এরশাদের নীতি ছিল মূলত পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের সাহায্য নির্ভর।
১৩। ছাত্র রাজনীতি: জিয়াউর রহমান তাঁর দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল গঠন করে ছাত্রদের একটি বড় অংশকে নিজের পক্ষে টানতে সফল হন। অন্যদিকে, এরশাদ তাঁর নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে অস্ত্র ও অর্থের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটান বলে অভিযোগ রয়েছে। জিয়ার ছাত্র রাজনীতিতে একটি আদর্শিক লড়াই ছিল, কিন্তু এরশাদের ছাত্র রাজনীতি ছিল মূলত পেশীশক্তি নির্ভর।
১৪। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: জিয়াউর রহমানের আমলে সংবাদপত্রের ওপর থেকে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং বহুদলীয় প্রচারের সুযোগ দেওয়া হয়। এর বিপরীতে, এরশাদের আমলে তথ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রেস অ্যাডভাইসের মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হরণ করা হয়েছিল। জিয়ার সময় মিডিয়া কিছুটা স্বস্তি পেলেও এরশাদের সময় গণমাধ্যম ছিল কঠোর সামরিক সেন্সরশিপের অধীন।
১৫। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা: জিয়াউর রহমান দেশের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী, টেকনোক্র্যাট ও সরকারি আমলাদের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে নীতি নির্ধারণে সম্পৃক্ত করেন। কিন্তু এরশাদ বুদ্ধিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বা কবি-সাহিত্যিকদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করেন। জিয়ার বুদ্ধিজীবী তোষণ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক, আর এরশাদের তোষণ ছিল ব্যক্তিগত স্তুতি ও সাংস্কৃতিক প্রচারণামূলক।
১৬। সামরিক সম্পর্ক: জিয়াউর রহমান বেসামরিকীকরণের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা সরাতে এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে সদা সচেষ্ট ছিলেন। এরশাদও সামরিক বাহিনীকে খুশি রাখতে আমলাতন্ত্র ও বিভিন্ন লাভজনক বেসামরিক পদে সেনা কর্মকর্তাদের ব্যাপক নিয়োগ প্রদান করেন। জিয়া সেনাবাহিনীকে পেশাদার বাহিনী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, আর এরশাদ সেনাবাহিনীকে ক্ষমতার অংশীদার বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।
১৭। পতনের ধরন: জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে নিহত হন, যা দেশবাসীকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করেছিল। এর বিপরীতে, জেনারেল এরশাদ ১৯৯০ সালে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং কারাবরণ করেন। জিয়ার অবসান ছিল আকস্মিক ও ট্র্যাজিক, আর এরশাদের অবসান ছিল দীর্ঘ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত যৌক্তিক পরিণতি।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদ উভয়েই সামরিক পোশাক খুলে ব্যালটের মাধ্যমে বেসামরিক শাসক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে জিয়াউর রহমান তাঁর জাতীয়তাবাদী নীতি ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দিয়ে জনগণের মাঝে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, এরশাদের বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া ছিল মূলত নানামুখী কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত গণআকাঙ্ক্ষার কাছে পরাজিত হয়।