- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব বিধিমালার মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশে শৃঙ্খলা, সমতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা:
১। আইনগত ভিত্তি: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার মূল ভিত্তি হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০০৮। নির্বাচন কমিশন এই বিধিমালার মাধ্যমে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এর উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য রাখা।
২। প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ: প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। প্রচারণার মাধ্যমে কোনো প্রার্থী বা দল অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে মিথ্যা, অপমানজনক বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে পারে না। শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রচারণা চালানো বাধ্যতামূলক।
৩। সভা সমাবেশ: নির্বাচনী সভা, মিছিল ও সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হয়। জনসাধারণের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে বা জনদুর্ভোগ তৈরি করে এমন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হয়। নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য।
৪। মিছিল নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনী প্রচারণায় মিছিল করার সময় আচরণবিধি মেনে চলতে হয়। মিছিলে অস্ত্র বহন, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া নিষিদ্ধ। মিছিল যেন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত না করে তা নিশ্চিত করতে হয়।
৫। পোস্টার ব্যবহার: প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল পোস্টার, ব্যানার ও প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করবে। যত্রতত্র পোস্টার লাগানো, সরকারি স্থাপনা নষ্ট করা বা পরিবেশের ক্ষতি করা আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৬। সরকারি সুবিধা: কোনো প্রার্থী নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার জন্য সরকারি সম্পদ, যানবাহন বা প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করতে পারবেন না। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী যেন সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে অন্য প্রার্থীর তুলনায় অতিরিক্ত সুবিধা না পান, সে বিষয়ে আচরণবিধিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৭। ধর্মের ব্যবহার: নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে ভোট চাওয়া বা কোনো ধর্ম, সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। নির্বাচনকে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য এই বিধান রাখা হয়েছে।
৮। ব্যক্তিগত আক্রমণ: প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অশালীন মন্তব্য, অপপ্রচার বা চরিত্রহননমূলক বক্তব্য দিতে পারে না। নির্বাচনী প্রতিযোগিতা যেন নীতি, কর্মসূচি ও জনকল্যাণমূলক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য।
৯। ভোটার প্রভাবিতকরণ: ভোটারদের অর্থ, উপহার, ভয়ভীতি বা অন্য কোনো অবৈধ সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা আচরণবিধির পরিপন্থী। প্রত্যেক ভোটার যেন স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা প্রার্থীদের দায়িত্ব।
১০। নির্বাচনী ব্যয়: প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করতে হয়। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়, অবৈধ অর্থের ব্যবহার বা ব্যয়ের হিসাব গোপন করা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
১১। প্রতীক ব্যবহার: রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত প্রতীক ও নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রচারণা চালাতে হয়। অন্য কোনো প্রতীক, চিহ্ন বা এমন কোনো প্রচারণা ব্যবহার করা যাবে না যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
১২। সরকারি কর্মকর্তা ব্যবহার: নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার করা যাবে না। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যাতে কোনো প্রার্থী বা দল বিশেষ সুবিধা না পায়।
১৩। নির্বাচনী পরিবেশ: রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের এমন কোনো কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হয় যা সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা বা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম শর্ত।
১৪। ভোটকেন্দ্র শৃঙ্খলা: ভোটের দিন প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রের নিয়ম মেনে চলতে হয়। ভোটারদের বাধা দেওয়া, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করা বা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১৫। গণমাধ্যম ব্যবহার: নির্বাচনী প্রচারণায় গণমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রার্থী ও দলকে নৈতিকতা বজায় রাখতে হয়। মিথ্যা তথ্য প্রচার, বিভ্রান্তিকর সংবাদ বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা আচরণবিধির বিরোধী।
১৬। নির্বাচনী কর্মকর্তার প্রতি সম্মান: প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়া বা তাদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করা আইনবিরোধী।
১৭। আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তি: কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। সতর্কবার্তা, জরিমানা, প্রার্থিতা বাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়।
উপসংহার: জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বিধিমালা প্রার্থী ও দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করে এবং ভোটারদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করে। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সকল রাজনৈতিক পক্ষকে আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলেই একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।