- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত একটি আইনসম্মত প্রক্রিয়া। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অধ্যায় VIA এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সাংগঠনিক, গণতান্ত্রিক ও আইনগত শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন লাভ করতে হয়।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া:
১। আইনগত ভিত্তি: রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের প্রধান আইনগত ভিত্তি হলো Representation of the People Order, 1972 বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০A–৯০I অনুচ্ছেদ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮। নির্বাচন কমিশন এসব বিধান অনুযায়ী আবেদন যাচাই ও নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
২। গণবিজ্ঞপ্তি: নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এবং আবেদনের সময়সীমা নির্ধারণ করে। আগ্রহী দলগুলোকে সেই সময়ের মধ্যে নির্ধারিত নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ কমিশনের কাছে আবেদন করতে হয়।
৩। নির্ধারিত ফরম: নিবন্ধনপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফরম-১ পূরণ করে আবেদন করতে হয়। এতে দলের পূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত নাম, প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা, যোগাযোগের তথ্য, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সাংগঠনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয় বিবরণ উল্লেখ করতে হয়।
৪। আবেদনকারীর স্বাক্ষর: নিবন্ধনের আবেদন সাধারণত দলের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক অথবা সমমর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির স্বাক্ষরে নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিতে হয়। এতে আবেদনটি দলের অনুমোদিত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয় এবং সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
৫। নিবন্ধন ফি: রাজনৈতিক দলকে আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত নিবন্ধন ফি জমা দিতে হয়। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী এ ফি অ-ফেরতযোগ্য পাঁচ হাজার টাকা এবং তা নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুকূলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
৬। প্রয়োজনীয় দলিল: আবেদনের সঙ্গে দলের গঠনতন্ত্র, নির্বাচনী ইশতেহার থাকলে তার কপি, দলীয় বিধিমালা, কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য, কার্যালয়ের প্রমাণপত্র এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিতে হয়। এসব দলিলের মাধ্যমে কমিশন দলটির সাংগঠনিক ও আইনগত অবস্থান যাচাই করে।
৭। সংসদীয় আসন: নিবন্ধনের যোগ্যতার একটি পথ হলো স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে অন্তত একটি আসনে জয়লাভ করা। দলটি এই শর্ত পূরণের প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে পারে।
৮। ভোটের হার: দ্বিতীয় বিকল্প শর্ত হলো স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলটি যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, সেসব আসনে প্রদত্ত মোট ভোটের অন্তত পাঁচ শতাংশ অর্জন করা। প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন ও নির্বাচনী তথ্যের মাধ্যমে এ যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।
৯। সাংগঠনিক বিস্তৃতি: পূর্ববর্তী নির্বাচনী শর্ত পূরণ না করলে দলকে কার্যকর কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় কমিটি, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর জেলা অফিস এবং অন্তত ১০০ উপজেলা বা মহানগর থানায় অফিস রাখতে হয়; প্রতিটিতে ন্যূনতম ২০০ ভোটার সদস্য থাকতে হয়।
১০। গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র: নিবন্ধনের জন্য দলের গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব স্তরের কমিটির সদস্য নির্বাচনের বিধান থাকতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো দলীয় নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিশ্চিত করা এবং একটি রাজনৈতিক দলকে কেবল ব্যক্তিনির্ভর সংগঠনে পরিণত হওয়ার প্রবণতা কমানো।
১১। নারী প্রতিনিধিত্ব: দলীয় গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব স্তরের কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হয় এবং বর্তমান আইনে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সেই লক্ষ্য অর্জনের বিধান রয়েছে। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
১২। সহযোগী সংগঠন: গঠনতন্ত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অথবা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পেশার সদস্যদের নিয়ে দলীয় অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন গঠনের বিধান রাখা যাবে না। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন সংগঠন গঠন এবং আইনসাপেক্ষে রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার অধিকার রাখেন।
১৩। প্রার্থী মনোনয়ন: দলের গঠনতন্ত্রে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থাকতে হয়। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা বা জেলা কমিটির সদস্যদের তৈরি প্যানেল বিবেচনা করে দলের কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড চূড়ান্ত প্রার্থী মনোনয়ন করবে—এমন বিধান থাকা প্রয়োজন।
১৪। অযোগ্যতার শর্ত: কোনো দলের উদ্দেশ্য সংবিধানবিরোধী হলে, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-ভাষা বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থাকলে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের ঝুঁকি সৃষ্টি করলে, একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থাকলে বা বিদেশে শাখা রাখার বিধান থাকলে নিবন্ধন পাওয়া যায় না।
১৫। মাঠ যাচাই: কমিশন আবেদন ও নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি সাংগঠনিক শর্ত বাস্তবে পূরণ হয়েছে কি না তা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করতে পারে। ২০২৬ সালের সংশোধনে সাংগঠনিক শর্তগুলো মাঠ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার বিষয়টি আইনে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
১৬। নিবন্ধন সনদ: সব শর্ত পূরণ ও যাচাই শেষে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট হলে দলটিকে নিবন্ধনের সিদ্ধান্ত দেয়, নির্ধারিত সনদ প্রদান করে এবং সরকারি গেজেটে তা প্রকাশ করে। আবেদন বাতিল হলে বর্তমান বিধান অনুযায়ী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দলকে লিখিতভাবে জানাতে হয়।
১৭। নিবন্ধন রক্ষা: নিবন্ধনের পরও দলকে আইন ও গঠনতন্ত্রের শর্ত মেনে চলতে হয়। টানা তিন বছর প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়া, নির্ধারিত সাংগঠনিক বিধান লঙ্ঘন বা পরপর দুই সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।
উপসংহার: বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কেবল একটি প্রশাসনিক অনুমোদন নয়; এটি দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা, গণতান্ত্রিক চরিত্র ও আইনসম্মত কার্যক্রমের স্বীকৃতি। নির্বাচন কমিশনের যথাযথ যাচাই, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আইন মেনে চলার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল দলীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।