- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কালের আবর্তনে মানব সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। আদিম গুহাবাসী সমাজ থেকে আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পৌঁছানো মূলত এক অবিরাম পরিবর্তনের গল্প। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, স্থবিরতা নয়, বরং পরিবর্তনই হলো সমাজের আসল নিয়ম। যে সমাজ তার ভেতরের ও বাইরের উপাদানগুলোর প্রভাবে রূপান্তর লাভ করে, তাকেই আমরা পরিবর্তনশীল সমাজ বলি।
পরিবর্তনশীল সমাজের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
১। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ: আধুনিক পরিবর্তনশীল সমাজের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ এবং গতিশীল করে তুলছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব পুরো বিশ্বকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করেছে। মানুষের কাজের ধরণ এবং যোগাযোগের মাধ্যম প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে।
২। নগরায়ন ও শিল্পায়ন: গ্রামকেন্দ্রিক কৃষিভিত্তিক সমাজ ভেঙে ক্রমশ শহরকেন্দ্রিক শিল্পভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠছে। কলকারখানা প্রতিষ্ঠার ফলে গ্রামীণ মানুষ জীবিকার সন্ধানে দলে দলে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। এর ফলে নতুন নতুন শহর ও উপশহর গড়ে উঠছে এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের পেশা, বাসস্থান এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় ধরণের রূপান্তর ঘটছে।
৩। শিক্ষার প্রসার: পরিবর্তনশীল সমাজে শিক্ষার হার এবং সচেতনতা দিন দিন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূর করে সমাজকে যুক্তিবাদী করতে শিক্ষা প্রধান ভূমিকা পালন করে। নারী শিক্ষার প্রসারের ফলে সমাজে লিঙ্গবৈষম্য হ্রাস পাচ্ছে এবং সচেতন নাগরিক সমাজ তৈরি হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।
৪। যৌথ পরিবারের ভাঙন: পরিবর্তনের হাওয়া সবচেয়ে বেশি লেগেছে আমাদের সনাতন পারিবারিক কাঠামোর ওপর। অতীতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য যৌথ পরিবারের আধিক্য দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তি স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।
৫। নারীর ক্ষমতায়ন: আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা আর কেবল ঘরের চার দেয়ালে বন্দি নেই। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে তারা ঘরের বাইরে এসে পুরুষদের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করছে। রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তন সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং সামাজিকভাবে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলছে।
৬। গতিশীলতা বৃদ্ধি: পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষের পেশাগত এবং ভৌগোলিক গতিশীলতা বা ‘সোশ্যাল মোবিলিটি’ বহুগুণ বেড়ে যায়। বংশানুক্রমিক বা ঐতিহ্যগত পেশা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা ছেড়ে মানুষ যোগ্যতা অনুযায়ী নতুন পেশা বেছে নিচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এমনকি এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। যোগ্যতার ভিত্তিতে সমাজে উচ্চস্তরে আরোহণের সুযোগ এখানে উন্মুক্ত থাকে।
৭। মূল্যবোধের পরিবর্তন: সমাজের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন ঘটে। প্রাচীন অনেক রক্ষণশীল ধ্যানধারণা ও নিয়মনীতি ভেঙে মানুষ এখন অনেক বেশি উদার ও আধুনিক হচ্ছে। মানবিকতা, সমঅধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মতো প্রগতিশীল মূল্যবোধগুলো সমাজে ধীরে ধীরে স্থান করে নিচ্ছে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ ভালো-মন্দের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করছে।
৮। শ্রমের বিশেষায়ন: আধুনিক পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রম বিভাগের জটিলতা এবং বিশেষায়ন অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আদিম সমাজের মতো একজন মানুষ এখন আর সব ধরণের কাজ একাকী করতে পারে না। প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। চিকিৎসা, প্রকৌশল বা প্রযুক্তির মতো প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন অতি-বিশেষজ্ঞ কর্মীর চাহিদা তৈরি হয়েছে।
৯। অর্থনৈতিক রূপান্তর: সনাতন সমাজব্যবস্থার মূলত কৃষি বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল। কিন্তু পরিবর্তনশীল সমাজে তা বদলে গিয়ে শিল্প ও সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় এবং নতুন নতুন বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ও লেনদেন ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে। বাজার অর্থনীতির বিকাশ এবং ক্যাশলেস সোসাইটির ধারণা অর্থনৈতিক লেনদেনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
১০। আইনি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রচলিত আইনকানুন ও বিচার ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন ও সংস্কার করা হয়। পুরোনো ও অকার্যকর আইনগুলো বাতিল করে যুগের উপযোগী নতুন নতুন কঠোর ও সুরক্ষামূলক আইন প্রণয়ন করা হয়। যেমন সাইবার অপরাধ দমনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা নারী সুরক্ষায় বিশেষ আইন তৈরি হচ্ছে। এর ফলে নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।
১১। গণমাধ্যমের প্রভাব: সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমাজের রূপান্তরে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। গণমাধ্যম মুহূর্তের মধ্যে দেশের ও বিদেশের খবর মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে জনমত গঠনে সাহায্য করে। সামাজিক অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যম জনসচেতনতা তৈরি করে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। মানুষের বিনোদন এবং শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা এখন অপরিসীম।
১২। গণতান্ত্রিক চেতনা: স্বৈরতান্ত্রিক বা রাজতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করে পরিবর্তনশীল সমাজ ক্রমশ গণতান্ত্রিক রীতিনীতির দিকে ধাবিত হয়। নাগরিকরা তাদের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন ও সোচ্চার হয়ে ওঠে। সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনে জনগণ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডে এবং সাধারণ মানুষের চিন্তায় পরমতসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়।
১৩। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য: চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষের গড় আয়ু অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মহামারী ও জটিল রোগব্যাধি দূর করার জন্য নিত্যনতুন ওষুধ, টিকা এবং উন্নত প্রযুক্তির চিকিৎসা সরঞ্জাম আবিষ্কৃত হচ্ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে মা ও শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। মানুষ এখন রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রার প্রতি বেশি মনোযোগী হচ্ছে।
১৪। অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ: সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিক হিসেবে অপসংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বায়নের প্রভাবে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে অনেকেই নিজস্ব ঐতিহ্য ও চেতনা হারিয়ে ফেলছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি এবং অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলো ঘটছে। ফলে দেশীয় সংস্কৃতির সুস্থ ধারা বজায় রাখা সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৫। শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তন: প্রাচীন সমাজে মূলত ধনী ও দরিদ্র—এই দুই ধরণের স্পষ্ট সামাজিক শ্রেণি বা স্তর লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু আধুনিক পরিবর্তনশীল সমাজে একটি বিশাল ও শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। যোগ্যতার ভিত্তিতে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের মধ্যকার দেয়ালগুলো এখন কিছুটা শিথিল হচ্ছে।
১৬। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: বিশ্বায়নের যুগে এক দেশের সংস্কৃতি অন্য দেশের সংস্কৃতিকে খুব দ্রুত প্রভাবিত করছে। খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-আশাক, ভাষা এবং উৎসবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ব্যাপক আদান-প্রদান ঘটছে। মানুষ এখন বহুজাতিক সংস্কৃতি বা গ্লোবাল কালচারের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। এর ফলে রক্ষণশীলতা দূর হচ্ছে এবং বৈশ্বিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৭। পরিবেশগত সংকট: অতিমাত্রায় শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে পরিবর্তনশীল সমাজে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। কলকারখানার বর্জ্য এবং যানবাহনের ধোঁয়া বায়ু, পানি ও মাটিকে প্রতিনিয়ত দূষিত করে তুলছে। বনাঞ্চল ধ্বংস করার ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তন সমাজকে পরিবেশ রক্ষার জন্য নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
১৮। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিকাশ: পরিবর্তনশীল সমাজে সামষ্টিক স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং অধিকারের গুরুত্ব অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। মানুষ নিজের ক্যারিয়ার, সুখ এবং আত্মউন্নয়নের বিষয়ে অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও সচেতন হয়ে ওঠে। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের চেয়ে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। তবে অতিরিক্ত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ অনেক সময় মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, পরিবর্তনশীল সমাজ হলো একটি চলমান নদীর মতো, যা কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ নানা উপাদানের মিথস্ক্রিয়ায় এই সমাজ প্রতিনিয়ত নতুন রূপ ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের গতি কখনো ধীর আবার কখনো অত্যন্ত দ্রুত প্রকৃতির হয়ে থাকে। সমাজের এই রূপান্তরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো এড়িয়ে চলাই প্রগতির মূল চাবিকাঠি।