- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে ‘আধুনিকীকরণ‘ একটি অত্যন্ত ব্যাপক এবং গতিশীল প্রত্যয়। এটি মূলত একটি সমাজকে মধ্যযুগীয় বা সনাতন ধাঁচ থেকে প্রগতিশীল ও উন্নত সমাজব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। মানুষের চিন্তাভাবনা, জীবনযাত্রার মান এবং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক রূপান্তরই হলো আধুনিকীকরণের মূল কথা, যা আমাদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়।
১। শিল্পায়ন: আধুনিকীকরণের অন্যতম প্রধান ও প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য হলো ব্যাপক শিল্পায়ন। এর ফলে সনাতন কৃষিনির্ভর অর্থনীতি দ্রুত শিল্প ও প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়। কলকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎপাদনে অভাবনীয় গতি আসে এবং মানুষের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। এটি সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে আমূল বদলে দেয় এবং জীবনযাত্রার মানকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
২। নগরায়ন: শিল্পায়নের হাত ধরেই সমাজে দ্রুত নগরায়ন বা শহরের বিকাশ ঘটে। কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা এবং উন্নত নাগরিক সুবিধার আশায় গ্রামীণ মানুষ দলে দলে শহরে পাড়ি জমায়। এর ফলে ছোট ছোট এলাকাগুলো আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশাল শহরে পরিণত হয়। নতুন নতুন আবাসন, রাস্তাঘাট এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবনধারা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
৩। শিক্ষার বিস্তার: আধুনিকীকরণ সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে এবং নিরক্ষরতা দূর করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়ায় সনাতন শিক্ষার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক, কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য শিক্ষা গ্রহণ বাধ্যতামূলক ও সহজলভ্য করা হয়। এর ফলে মানুষের ভেতরের অন্ধত্ব দূর হয় এবং সচেতন এক নতুন প্রজন্ম গড়ে ওঠে।
৪। প্রযুক্তির ব্যবহার: দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি আধুনিকীকরণের প্রধান লক্ষণ। কৃষি, শিল্প, চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রাচীন পদ্ধতির বদলে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োগ বাড়ানো হয়। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব মানুষের হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্বকে এনে দিয়েছে এবং প্রতিটি কাজকে করেছে সহজ। এর ফলে মানুষের সময় ও শ্রমের সাশ্রয় ঘটে এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৫। ধর্মনিরপেক্ষতা: আধুনিক সমাজে মানুষের চিন্তাভাবনায় ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির এক ব্যাপক বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় গোঁড়ামি বা কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে রেখে যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিজ্ঞানমনস্কতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ অলৌকিক বিশ্বাসের চেয়ে বাস্তবমুখী ও বৈজ্ঞানিক সত্যকে গ্রহণ করতে শুরু করে। এটি সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং পরমতসহিষ্ণুতা বৃদ্ধিতে এক দারুণ ভূমিকা পালন করে।
৬। যুক্তিবাদ: আধুনিকীকরণের ফলে মানুষের মধ্যে অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির এক নতুন জোয়ার আসে। যেকোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ এখন ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। কুসংস্কার ও প্রাচীন প্রথাকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে যুক্তির কষ্টিপাথরে তা যাচাই করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে এক প্রগতিশীল ও উন্নত চিন্তার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
৭। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ: আধুনিক সমাজব্যবস্থায় একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মূল্যবোধের এক দারুণ বিকাশ ঘটে। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায় এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো রাষ্ট্র কর্তৃক সুরক্ষিত হয়। বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং পরমতসহিষ্ণুতা আধুনিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর ফলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
৮। যোগাযোগের উন্নতি: আধুনিকীকরণ পুরো বিশ্বের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। জল, স্থল ও আকাশপথের অভাবনীয় উন্নতির ফলে যাতায়াত এখন অত্যন্ত দ্রুত এবং সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির কারণে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। এই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্বকে একটি ছোট গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত করেছে।
৯। নারীর ক্ষমতায়ন: আধুনিক সমাজব্যবস্থার অন্যতম এক প্রধান ও সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন। প্রাচীন রক্ষণশীলতার প্রাচীর ভেঙে নারীরা এখন শিক্ষা, চাকরি এবং রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে। সমাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদা ক্রমান্বয়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে পরিবার ও সমাজে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
১০। গতিশীলতা: আধুনিকীকরণ মানুষের সামাজিক এবং ভৌগোলিক গতিশীলতাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রাচীনকালের মতো মানুষ এখন আর এক স্থানে বা এক নির্দিষ্ট পেশায় সারাজীবন আটকে থাকে না। যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষ সহজেই এক সামাজিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে আরোহণ করতে পারে। পেশা পরিবর্তনের এই স্বাধীনতা মানুষের ভেতরের লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে বিকাশের চমৎকার সুযোগ করে দেয়।
১১। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: আধুনিকীকরণের ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিময় প্রথা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফলে মূলধন সৃষ্টি সহজ হয়। দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয়ের প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। এটি একটি দেশকে অনুন্নত অবস্থা থেকে দ্রুত উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।
১২। চিকিৎসা বিজ্ঞান: চিকিৎসা ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষের গড় আয়ু এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার মান অনেক বেড়েছে। জটিল ও কঠিন রোগ নির্ণয় এবং তার নিরাময়ে আবিষ্কার হয়েছে নিত্যনতুন ওষুধ ও উন্নত যন্ত্রপাতি। মহামারি ও বিভিন্ন মারাত্মক রোগকে জয় করে মানবজাতি এখন অনেক বেশি নিরাপদ জীবনযাপন করছে। এর ফলে শিশু মৃত্যুর হার কমেছে এবং মানুষের কর্মক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।
১৩। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ: আধুনিক সমাজে যৌথ পরিবারের ধারণা ভেঙে একক পরিবার এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের এক নতুন বিকাশ ঘটেছে। মানুষ এখন নিজের অধিকার, ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন ও সংবেদনশীল। সমষ্টির চেয়ে ব্যক্তির মেধা, ইচ্ছা এবং স্বাধীনতাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে বেশি মূল্যায়ন করা হয়। এটি মানুষকে স্বনির্ভর হতে এবং নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
১৪। আমলাতন্ত্র: রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একটি দক্ষ এবং সুসংগঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে ওঠে। আধুনিকায়নের ফলে সরকারি ও বেসরকারি কাজের পরিধি ও জটিলতা অনেক বৃদ্ধি পায়, যা সামাল দিতে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় এবং নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা হয়। এই পেশাদার কাঠামো সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নে সহায়তা করে।
১৫। গণমাধ্যমের ভূমিকা: আধুনিক সমাজে সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। এগুলো জনমত গঠনে, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সমাজকে সচেতন করতে কাজ করে। মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো তথ্য বা অন্যায়ের প্রতিবাদ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে গণমাধ্যম সাহায্য করে। এটি সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সর্বদা জাগ্রত রাখে।
১৬। বিশ্বায়ন: আধুনিকীকরণ স্থানীয় বা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে সমাজকে বিশ্বায়নের এক বিশাল স্রোতের সাথে যুক্ত করে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনীতির মধ্যে এক গভীর ও নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক দেশের পণ্য, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি খুব সহজেই অন্য দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় মিশে যায়। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মানবজাতিকে একটি বৈশ্বিক পরিবারের সদস্য হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
১৭। ভোক্তাবাদ: আধুনিক সমাজব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির সাথে সাথে নানাবিধ পণ্যের ভোগ ও বিলাসের প্রবণতা বা ভোক্তাবাদ বৃদ্ধি পায়। মানুষ এখন কেবল মৌলিক চাহিদাই পূরণ করে না, বরং আরামদায়ক ও বিলাসী জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিত্যনতুন গ্যাজেট, আধুনিক ফ্যাশন এবং উন্নত জীবনযাপনের সামগ্রী মানুষের মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বর্ধিত চাহিদা শিল্প উৎপাদন এবং বাজার অর্থনীতিকে অনবরত সচল ও গতিশীল রাখছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিকীকরণ হলো একটি প্রাচীন ও সনাতন সমাজকে প্রগতির আলোয় আলোকিত করার চিরন্তন প্রক্রিয়া। এটি মানুষের চিন্তার সংকীর্ণতা দূর করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তবে এই প্রক্রিয়ার সুফল পেতে হলে এর নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে মানবকল্যাণমুখী উপাদানগুলোকে গ্রহণ করতে হবে। তবেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সাম্যবাদী ও সুন্দর আধুনিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে।