- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: আধুনিকীকরণ হলো একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি ঐতিহ্যবাহী সমাজ প্রথাগত ধ্যান-ধারণা ও অবক্ষয় থেকে মুক্ত হয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক এবং উন্নত সমাজে রূপান্তরিত হয়। এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের চিন্তা-চেতনা, সমাজকাঠামো এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এক সামগ্রিক ও ইতিবাচক পরিবর্তনের মহামিলন।
১। ঐতিহাসিক পটভূমি: আধুনিকীকরণ তত্ত্বের সূচনা প্রধানত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছিল। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে সদ্য স্বাধীন হওয়া অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে এই তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা এসব দেশের সামগ্রিক রূপান্তরের একটি বিশ্বজনীন মডেল হিসেবে এই তত্ত্বটিকে তুলে ধরেন।
২। অর্থনৈতিক রূপান্তর: এই তত্ত্বের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো একটি দেশের সনাতন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা। কৃষিভিত্তিক ও প্রাচীন উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে সেখানে বৃহৎ শিল্পকারখানা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। এর ফলে উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা পর্যায়ক্রমে একটি দেশের জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে।
৩। সামাজিক গতিশীলতা: প্রথাগত সমাজের স্থবিরতা ভেঙে সমাজে গতিশীলতা সৃষ্টি করা আধুনিকীকরণ তত্ত্বের একটি প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে মানুষ তার জন্মগত বা বংশগত পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিজস্ব যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সমাজে স্থান করে নিতে শুরু করে। ফলে পেশাগত পরিবর্তন ও ভৌগোলিক স্থানান্তর সহজ হয় এবং সমাজ একটি নতুন ও প্রাণবন্ত রূপ ধারণ করে।
৪। শিল্পায়নের গুরুত্ব: শিল্পায়নকে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকরী ইঞ্জিন বা চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ফলে কুটির শিল্পের জায়গায় বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারিং হাব বা শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়। শিল্পায়ন সমাজকে দ্রুত নগরায়ণের দিকে ধাবিত করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
৫। নগরায়ণের বিকাশ: শিল্পায়নের হাত ধরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ উন্নত জীবনের আশায় শহরে পাড়ি জমাতে শুরু করে। এর ফলে নতুন নতুন শহর ও মহানগরের সৃষ্টি হয়, যেখানে শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকে। নগরায়ণ মানুষের চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনে এবং প্রথাগত গোঁড়ামি থেকে তাদের মুক্ত করতে সাহায্য করে।
৬। শিক্ষার প্রসার: আধুনিকীকরণ তত্ত্বের মতে, একটি সমাজকে আধুনিক করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য। শিক্ষা মানুষের মনের কুসংস্কার ও অন্ধত্ব দূর করে যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটায়। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য এই তত্ত্ব সর্বদাই গণশিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে থাকে।
৭। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন: সনাতন উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এই তত্ত্বের অন্যতম মূল উপাদান। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কম সময়ে এবং কম খরচে বিপুল পরিমাণ মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির এই উন্নয়ন বিশ্বকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
৮। মানসিকতার পরিবর্তন: সমাজকাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অভ্যন্তরীণ চিন্তা-ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকীকরণ এই তত্ত্বের একটি প্রধান শর্ত। মানুষ যখন ভাগ্যবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের কর্মদক্ষতা এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে, তখনই প্রকৃত আধুনিকীকরণ ঘটে। এটি ব্যক্তিকে যেকোনো নতুন পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি জোগায়।
৯। ধর্মনিরপেক্ষতার বিকাশ: আধুনিকীকরণের ফলে সমাজে ধর্মীয় কট্টরতা হ্রাস পায় এবং ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় আবেগ বা অলৌকিক বিশ্বাসের চেয়ে যুক্তি ও বিজ্ঞানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এর ফলে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
১০। রাজনৈতিক উন্নয়ন: এই তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। বংশানুক্রমিক বা একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক এবং প্রতিনিধিত্বশীল সরকার ব্যবস্থা গঠনে এই তত্ত্ব উদ্বুদ্ধ করে। এর ফলে আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকার সুসংহত করার পথ সুগম হয়।
১১। আমলাতন্ত্রের আধুনিকায়ন: রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও দক্ষ, গতিশীল এবং পেশাদার করে তোলার ওপর এই তত্ত্ব বিশেষ গুরুত্ব দেয়। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পরিবর্তে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের কথা বলা হয়। একটি আধুনিক ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রই সরকারের উন্নয়নমূলক নীতি ও পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।
১২। গণমাধ্যমের ভূমিকা: সমাজে নতুন তথ্য, আধুনিক ধারণা এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মতো গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণমাধ্যম গ্রামীণ ও শহরের মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার দূরত্ব কমিয়ে আনে এবং সমাজকে দ্রুত গতিশীল করতে সাহায্য করে। এটি জনগণকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং সুস্থ জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
১৩। যোগাযোগের উন্নয়ন: সড়কপথ, রেলপথ, আকাশপথ এবং আধুনিক নৌপথের ব্যাপক উন্নয়ন আধুনিকীকরণ তত্ত্বের বাস্তব রূপায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও খুব সহজেই মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্রোতধারার সাথে যুক্ত হতে পারে।
১৪। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা: আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ায় মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানোর জন্য উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত আবশ্যক। আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, উন্নত চিকিৎসাপ্রযুক্তি এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সহজলভ্যতা জনস্বাস্থ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটায়। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই কেবল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সক্রিয় অবদান রাখতে সক্ষম হয়।
১৫। রোস্টোর মডেল: অর্থনীতিবিদ ডব্লিউ ডব্লিউ রোস্টো আধুনিকীকরণের পাঁচটি ধাপের একটি বিখ্যাত তত্ত্ব প্রদান করেছেন, যা এই আলোচনার অন্যতম মূল ভিত্তি। তাঁর মতে, প্রতিটি সমাজকে ঐতিহ্যবাহী পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ গণভোগের পর্যায়ে পৌঁছাতে নির্দিষ্ট কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এই অর্থনৈতিক মডেলটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
১৬। পশ্চিমা অনুকরণ: এই তত্ত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন মডেলকে আদর্শ হিসেবে গণ্য করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নত হতে হলে পাশ্চাত্যের প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও এই ধারণার কারণে তত্ত্বটি পরবর্তীতে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানীদের দ্বারা তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছিল।
১৭। তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা: আধুনিকীকরণ তত্ত্বের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, কারণ এটি প্রাচ্যের দেশগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে প্রায়শই অবহেলা করেছে। তত্ত্বটি ধরে নিয়েছিল যে পশ্চিমা পথ অনুসরণ করলেই সব দেশ উন্নত হবে, যা বাস্তবে অনেক দেশের ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। তদুপরি, এই তত্ত্বটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অনুন্নয়নের জন্য কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকেই দায়ী করেছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, নানাবিধ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও অনুন্নত সমাজের রূপান্তরে আধুনিকীকরণ তত্ত্বের গুরুত্ব ও আবেদন কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। এটি ঐতিহ্যবাহী সমাজকে ভেঙে একটি বিজ্ঞানমনস্ক, শিল্পায়িত এবং উন্নত সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পথ দেখায়। যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন এবং মানবসম্পদের প্রকৃত বিকাশের জন্য এই তত্ত্বের মূল আদর্শগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।