- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানুষের অতীত জীবনযাত্রা ও সভ্যতাকে জানার অদম্য কৌতূহল থেকেই জন্ম নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব নামের এই রোমাঞ্চকর বিজ্ঞান শাখাটির। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো দিনের জিনিসপত্র, স্থাপত্য এবং নানা নিদর্শনকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবিষ্কার, বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণ করার মাধ্যমে এই বিজ্ঞান আমাদের মানব ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে পুনরুদ্ধার করে। প্রত্নতত্ত্ব হলো সেই সেতু, যা বর্তমানের সঙ্গে অতীতের বন্ধনকে মজবুত করে এবং সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারাকে তুলে ধরে।
প্রত্নতত্ত্ব হলো ইংরেজি শব্দ ‘Archaeology’-এর বাংলা প্রতিশব্দ। এটি এমন একটি বিজ্ঞান যা মূলত বস্তুগত নিদর্শনের ভিত্তিতে মানুষের অতীত সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে জানতে সাহায্য করে। প্রত্নতত্ত্বের কাজ শুধু পুরনো জিনিস খুঁজে বের করাই নয়, বরং সেগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে অতীত সমাজের সম্পূর্ণ চিত্রটি নির্মাণ করা।
শাব্দিক অর্থ
বাংলা ‘প্রত্নতত্ত্ব’ শব্দটি দুটি সংস্কৃত শব্দের সমন্বয়ে গঠিত:
- প্রত্ন (প্র + ত্ন): যার অর্থ পুরাতন বা প্রাচীন।
- তত্ত্ব (তৎ + ত্ব): যার অর্থ জ্ঞান বা বিজ্ঞান।
সুতরাং, শাব্দিক অর্থে প্রত্নতত্ত্ব বলতে ‘পুরাতন বা প্রাচীন বিষয়ক জ্ঞান’-কে বোঝায়।
বিভিন্ন গবেষক ও মণিষীদের প্রদত্ত সংজ্ঞা
বিভিন্ন গবেষক, বিজ্ঞানী এবং মণিষী প্রত্নতত্ত্বকে নিম্নোক্তভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
১।ভি. গর্ডন চাইল্ড (V. Gordon Childe): তাঁর মতে, প্রত্নতত্ত্ব হলো “অতীত সমাজের বস্তুগত সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিজ্ঞান, যা মানুষের জীবনযাত্রা এবং সমাজের পরিবর্তন সম্পর্কে আলোকপাত করে।”
২।কার্বন-ডেটিং পদ্ধতিতে প্রাপ্ত সংজ্ঞানুসারে: প্রাচীন বা প্রাগৈতিহাসিক কালের প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবাশ্ম ও মানুষের ব্যবহার্য সামগ্রী, যুদ্ধাস্ত্র, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাটি খুঁড়ে বের করে সে সম্পর্কে অধ্যয়ন করা হচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব।
৩।স্যার মর্টিমার হুইলার (Sir Mortimer Wheeler): তিনি প্রত্নতত্ত্বকে একটি শিল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার মাধ্যমে “মানুষের অতীত কর্মকাণ্ডের বস্তুগত প্রমাণাদি উদ্ধার ও পাঠোদ্ধার করা হয়।”
৪।জন লিল্যান্ড (John Leland): প্রাচীন নথিপত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক চর্চার প্রাথমিক ধারণা দেন এবং নিদর্শনগুলিকে স্থানিক প্রেক্ষিতের সাথে ব্যাখ্যা করার ওপর জোর দেন।
৫।বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়: “বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনধারার যাবতীয় তথ্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চিহ্নিতকরণ, প্রাপ্ত বস্ত্তর বিশ্লেষণ, সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে নিয়োজিত বিজ্ঞানভিত্তিক শাখাটির প্রতিনিধিত্ব করে।”
৬। ডিকশনারি অফ আর্কিওলজি (Dictionary of Archaeology) অনুসারে: প্রত্নতত্ত্ব হল “বস্তুগত নিদর্শনের মাধ্যমে মানবজাতির অতীত অধ্যয়নের বিজ্ঞান।”
৭।অধ্যাপক নুরুল কবির: তাঁর মতে, “আজ আমরা যে জীবনটা যাপন করছি, তার বিকাশ কীভাবে হলো, সেটা জানাই হলো প্রত্নতাত্ত্বিকের কাজ।”
প্রত্নতত্ত্ব হলো মানব সভ্যতার বিবর্তন এবং অতীতের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে বস্তুগত নিদর্শনের (যেমন—স্থাপত্য, হাতিয়ার, মুদ্রা, শিল্পকর্ম ইত্যাদি) বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করার বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ।
শেষকথা: প্রত্নতত্ত্ব আমাদের কেবল পুরোনো দিনের ভাঙাচোরা জিনিস সম্পর্কেই ধারণা দেয় না, বরং এই পৃথিবীর বুকে মানুষের যাত্রা কীভাবে শুরু হলো, সমাজ কীভাবে ধীরে ধীরে আজকের রূপ পেল—সেই সব অজানা অধ্যায়গুলোকে উন্মোচন করে। এটি একটি বিজ্ঞান, যা আমাদের ঐতিহাসিক শিকড়কে চিনতে শেখায় এবং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এইভাবেই প্রত্নতত্ত্ব অতীতকে বর্তমানের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এক সম্পূর্ণ মানব ইতিহাসের চিত্র তুলে ধরে।

