- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশ সংবিধান কেবল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনই নয়, এটি ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা এক অনন্য দলিল। ১৯৭২ সালে প্রণীত এই সংবিধান বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাম্যের প্রতীক। যুগের প্রয়োজনে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে এটি পরিবর্তিত হলেও এর মূল চেতনা ও বৈশিষ্ট্য আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
১। লিখিত দলিল: বাংলাদেশের সংবিধান একটি সম্পূর্ণ লিখিত দলিল যা মোট ১১টি ভাগে বিভক্ত। এতে ১৫৩টি অনুচ্ছেদ, একটি প্রস্তাবনা এবং বেশ কয়েকটি তফসিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সকল নিয়মকানুন, নাগরিক অধিকার এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ক্ষমতা এখানে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে শাসনব্যবস্থায় যেকোনো বিভ্রান্তি এড়ানো সহজ হয় এবং এটি দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে গণ্য হয়।
২। দুষ্পরিবর্তনীয় প্রকৃতি: এই সংবিধানের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি সহজে পরিবর্তন করা যায় না। সংবিধানের কোনো ধারা সংশোধন বা পরিবর্তন করতে হলে জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হয়। সাধারণ আইন পাসের মতো সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এটি সংশোধন করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব এবং আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য এই কঠোর নিয়ম রাখা হয়েছে।
৩। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি: সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চারটি প্রধান মূলনীতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এই মূলনীতিগুলো হলো—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। দেশের যেকোনো আইন প্রণয়ন এবং শাসনকাজ পরিচালনায় এই চার নীতিকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলো মূলত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও আদর্শিক চরিত্রকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে।
৪। মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা: সংবিধানে নাগরিকদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য বেশ কিছু মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জীবনের অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা অন্যতম প্রধান। কোনো নাগরিক এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তিনি সরাসরি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আদালত আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের এই অধিকারগুলো সুরক্ষা করতে সম্পূর্ণ বাধ্য থাকে।
৫। সর্বোচ্চ আইন: এই সংবিধানকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ এবং চূড়ান্ত আইন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের কোনো ধারার সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেই আইন বাতিল হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার সংবিধানের অধীন এবং এর বাইরে কারও কোনো ক্ষমতা নেই। এই ধারাটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
৬। সংসদীয় গণতন্ত্র: বাংলাদেশে মন্ত্রিসভা শাসিত বা সংসদীয় পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় দেশের প্রকৃত শাসনক্ষমতা ন্যস্ত থাকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার ওপর। নির্বাহী বিভাগ তাদের সমস্ত কাজের জবাবদিহিতার জন্য জাতীয় সংসদের কাছে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ থাকে। রাষ্ট্রপতির নামে দেশের সকল শাসনকাজ পরিচালিত হলেও তিনি মূলত আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৭। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র: সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ও পরিচালিত হয়। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো কোনো প্রাদেশিক সরকার বা রাজ্য ব্যবস্থা নেই। সমগ্র দেশের শাসনভার একটিমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ঢাকা হলো এর রাজধানী। স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা থাকলেও সব সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে কেন্দ্র থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়।
৮। এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: বাংলাদেশের আইনসভা বা সংসদ এক কক্ষবিশিষ্ট এবং এর নাম ‘জাতীয় সংসদ’। বর্তমানে মোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে এই আইনসভা গঠিত হয়। এর মধ্যে ৩০০ জন সদস্য জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন এবং ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। দেশের আইন প্রণয়ন ও বাজেট পাস করার একমাত্র সার্বভৌম ক্ষমতা এই সংসদের হাতে ন্যস্ত থাকে।
৯। স্বাধীন বিচারবিভাগ: সংবিধানে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পালন এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে। শাসন বিভাগ বা নির্বাহী বিভাগ চাইলেই বিচার বিভাগের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষ সমাজে ন্যায়বিচার ও আইনের সঠিক শাসন লাভ করতে সক্ষম হয়।
১০। জনগণের সার্বভৌমত্ব: সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক দেশের সাধারণ জনগণ। জনগণের পক্ষে এই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর করা সম্ভব হয়। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে কোনো রাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের স্থান নেই। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই কেবল নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেশ পরিচালনার বৈধ অধিকার লাভ করেন।
১১। সার্বজনীন ভোটাধিকার: দেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা পেশা নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়সী প্রতিটি নাগরিকের জন্য ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই একজন নাগরিক জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে নিজের ভোট প্রদান করতে পারেন। সুস্থ মস্তিস্কের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের এই অধিকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করে। এটি দেশের প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক সমতা নিশ্চিত করার একটি অনন্য মাধ্যম।
১২। ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই পবিত্র দলিলে। ফলে সমাজে সব ধর্মের মানুষের মাঝে একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় থাকে।
১৩। প্রজাতন্ত্র ঘোষণা: বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম এবং একক প্রজাতন্ত্র হিসেবে সংবিধানে ঘোষিত হয়েছে। এখানে বংশানুক্রমিক কোনো রাজা বা রানীর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রতিনিধিদের দ্বারা পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন। এই প্রজাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করে থাকেন।
১৪। ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি: প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংবিধানে ‘ন্যায়পাল’ পদ সৃষ্টির বিধান রাখা হয়েছে। জাতীয় সংসদ আইনের মাধ্যমে এই পদ তৈরি করে যেকোনো ব্যক্তিকে ন্যায়পাল হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে। সরকারের যেকোনো মন্ত্রণালয় বা সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করার ক্ষমতা ন্যায়পালের থাকবে। যদিও এই পদটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, তবুও এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য।
১৫। জরুরি অবস্থা জারি: দেশ বহিরাক্রমণ, অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়লে রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি অনূর্ধ্ব ১২০ দিনের জন্য এই বিশেষ অবস্থা জারি করতে পারেন। এই সময়ে নাগরিকদের কিছু মৌলিক অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিধান সংবিধানে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে এই বিশেষ ধারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৬। জাতীয় প্রতীক ও ভাষা: সংবিধানে রাষ্ট্রের ভাষা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় প্রতীকের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতীক। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের প্রথম দশ চরণকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই উপাদানগুলো আমাদের জাতীয় পরিচয়কে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে।
১৭। স্থানীয় শাসন জোরদার: সংবিধানে দেশের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে স্থানীয় শাসন বা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় সংস্থাগুলোর হাতে আইন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়নের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো উন্নয়নের সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এটি তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্ব বিকাশ এবং গণতন্ত্রের চর্চাকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধান একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল, মানবিক এবং উন্নত মানের রাজনৈতিক দলিল। এটি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি কাঠামোই সরবরাহ করে না, বরং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সাম্য নিশ্চিত করে। নানা রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা সত্ত্বেও এই সংবিধান দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সচল রাখতে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। একে সমুন্নত রাখা এবং এর প্রতি অনুগত থাকা প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব।