- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: পরিবর্তনশীল পৃথিবীর বুকে মানব সভ্যতার ইতিহাসকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—সনাতন ও আধুনিক সমাজ। সনাতন সমাজ ঐতিহ্য, কৃষি ও প্রাচীন রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। অপরদিকে, আধুনিক সমাজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই দুই ধরণের সমাজের মধ্যে জীবনযাত্রার মান, মানসিকতা এবং কাঠামোগত দিক থেকে ব্যাপক ও গভীর পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।
সনাতন ও আধুনিক সমাজের পার্থক্যসমূহ:
১। অর্থনীতির ভিত্তি: সনাতন সমাজের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হলো কৃষি কাজ এবং কুটির শিল্প। এই সমাজে মানুষ জীবনধারণের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি, জমি এবং গবাদিপশুর ওপর নির্ভর করত। পক্ষান্তরে, আধুনিক সমাজের অর্থনীতি মূলত শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এখানে কলকারখানা ও সেবা খাতের অবদানই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
২। সামাজিক গতিশীলতা: সনাতন সমাজে সামাজিক গতিশীলতা ছিল অত্যন্ত ধীর এবং প্রায় স্থবির। মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হতো তার জন্মসূত্র, বংশমর্যাদা এবং জাতপ্রথার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আধুনিক সমাজে সামাজিক গতিশীলতা অত্যন্ত তীব্র ও উন্মুক্ত। এখানে মানুষ নিজের যোগ্যতা, শিক্ষা, মেধা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজের উচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারে।
৩। পরিবার কাঠামো: সনাতন সমাজে যৌথ পরিবারের আধিপত্য ছিল অত্যন্ত বেশি। বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী সবাই মিলে একসঙ্গে একান্নবর্তী পরিবারে বসবাস করত। এর বিপরীতে, আধুনিক সমাজে একক বা অণু পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ব্যস্ততা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে মানুষ এখন শুধু স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বাস করে।
৪। প্রযুক্তির ব্যবহার: সনাতন সমাজে বিজ্ঞানের আলো পৌঁছায়নি বলে প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল আদিম ও সীমিত। মানুষ চাষাবাদ বা যাতায়াতের জন্য লাঙল, গরু এবং ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভর করত। আধুনিক সমাজ প্রযুক্তি ছাড়া একদিনও কল্পনা করা যায় না। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত যন্ত্রপাতি এই সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
৫। শিক্ষার হার: সনাতন সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং তা নির্দিষ্ট উচ্চশ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষ লোকশিক্ষা বা ধর্মীয় শিক্ষার ওপর নির্ভর করত। অপরদিকে, আধুনিক সমাজে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার এবং এর হার অত্যন্ত উচ্চ। এখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হয়।
৬। চিকিৎসা ব্যবস্থা: সনাতন সমাজের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল মূলত ভেষজ, কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক এবং বিভিন্ন কুসংস্কারের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে গড় আয়ু কম ছিল এবং মহামারীতে বহু মানুষ মারা যেত। আধুনিক সমাজে চিকিৎসা বিজ্ঞান অবিশ্বাস্য রকম উন্নত ও গতিশীল। আধুনিক হাসপাতাল, উন্নত ওষুধ, শৈল্যচিকিৎসা এবং ভ্যাকসিনের কারণে মানুষের গড় আয়ু বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭। যোগাযোগ ব্যবস্থা: সনাতন সমাজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত এবং তথ্য আদান-প্রদান ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। মানুষ পায়ে হেঁটে বা পশুবাহিত যানে চলাচল করত এবং চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। আধুনিক সমাজে বুলেট ট্রেন, উড়োজাহাজ এবং মহাসড়ক যোগাযোগের আমূল পরিবর্তন এনেছে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের কল্যাণে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ করা সম্ভব।
৮। ধর্মের প্রভাব: সনাতন সমাজের মানুষের চিন্তাভাবনা, আইনকানুন এবং প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ধর্মের বাণীকে সেখানে অলঙ্ঘনীয় মনে করা হতো। পক্ষান্তরে, আধুনিক সমাজে ধর্মের গুরুত্ব ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকলেও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাব বেশি। মানুষ এখন অন্ধবিশ্বাসের চেয়ে যুক্তিতে বেশি বিশ্বাস করে।
৯। নারীর সামাজিক অবস্থান: সনাতন সমাজে নারীদের অবস্থান ছিল চার দেয়ালের মাঝে বন্দি এবং তারা কেবল গৃহস্থালি কাজের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা থাকত না। আধুনিক সমাজে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সমান অধিকার ভোগ করছে। তারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে এবং কর্মক্ষেত্রে উচ্চপদে আসীন হয়ে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে।
১০। রাজনৈতিক ব্যবস্থা: সনাতন সমাজের শাসনব্যবস্থা ছিল মূলত রাজতন্ত্র, সামন্তবাদ বা গোত্রপ্রধানের একনায়কতান্ত্রিক নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাধারণ মানুষের শাসনকার্যে কোনো মতামত দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আধুনিক সমাজে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জয়জয়কার পরিলক্ষিত হয়। এখানে জনমত, নির্বাচন, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
১১। পেশার বৈচিত্র্য: সনাতন সমাজে পেশার কোনো বৈচিত্র্য ছিল না এবং তা মূলত বংশানুক্রমিক হতো। কামারের ছেলে কামার এবং কৃষকের ছেলে কৃষক হওয়াই ছিল স্বাভাবিক নিয়ম। আধুনিক সমাজে হাজারো রকমের পেশার সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ব্যাংকিং, গবেষণা ও করপোরেট খাতের মতো নতুন নতুন পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা সবার রয়েছে।
১২। চিন্তাভাবনার ধরণ: সনাতন সমাজের মানুষের চিন্তাভাবনা ছিল ঐতিহ্যবাদী, রক্ষণশীল এবং অতীতমুখী। তারা যেকোনো পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করতে চাইত না এবং ভয় পেত। আধুনিক সমাজের মানুষ অত্যন্ত প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক এবং ভবিষ্যৎমুখী। তারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আইডিয়া, সংস্কার এবং উদ্ভাবনকে সানন্দে স্বাগত জানায় এবং খাপ খাইয়ে নেয়।
১৩। বিনোদন মাধ্যম: সনাতন সমাজে বিনোদনের উৎস ছিল গ্রামীণ মেলা, পালাগান, যাত্রা, পুতুলনাচ এবং বিভিন্ন দেশীয় খেলাধুলা। মানুষ সামাজিকভাবে একত্রিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করত। আধুনিক সমাজে বিনোদন হয়ে পড়েছে প্রযুক্তি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। টেলিভিশন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও গেম এবং সিনেমা এখন মানুষের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম।
১৪। অপরাধের প্রকৃতি: সনাতন সমাজে অপরাধের ধরণ ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও শারীরিক, যেমন চুরি, ডাকাতি বা জমিজমা নিয়ে মারামারি। এসবের বিচার হতো গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে। আধুনিক সমাজে অপরাধের ধরণ অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত হয়ে উঠেছে। বর্তমান যুগে সাইবার অপরাধ, ব্যাংক জালিয়াতি, হোয়াইট কলার ক্রাইম এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান ব্যাপক হারে বেড়েছে।
১৫। শহরায়ন: সনাতন সমাজ ছিল প্রধানত গ্রামভিত্তিক এবং প্রকৃতির কাছাকাছি শান্ত পরিবেশের। অধিকাংশ মানুষই গ্রামে বাস করত এবং নগরের ধারণা ছিল অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক সমাজ সম্পূর্ণভাবে নগরায়ন ও শহরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কর্মসংস্থান এবং উন্নত নাগরিক সুবিধার আশায় মানুষ প্রতিনিয়ত গ্রাম ছেড়ে বড় বড় মেগাসিটিতে ভিড় করছে।
১৬। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ: সনাতন সমাজে ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে সমষ্টিগত বা পারিবারিক স্বার্থকে সবসময় বড় করে দেখা হতো। সমাজের নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কিছু করা কঠিন ছিল। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ অত্যন্ত প্রবলভাবে প্রকাশ পায়। এখানে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা, গোপনীয়তা, পছন্দ-অপছন্দ এবং ব্যক্তিগত অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।
১৭। শ্রম বিভাগ: সনাতন সমাজে জটিল কোনো শ্রম বিভাগ ছিল না, একই মানুষ বহু রকমের কাজ একাই সম্পন্ন করত। কাজের মধ্যে বিশেষায়িত দক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হতো। আধুনিক সমাজে অত্যন্ত জটিল এবং উন্নত শ্রম বিভাগ দেখা যায়। এখানে প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ কর্মীবাহিনী থাকে, যা উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সনাতন সমাজ থেকে আধুনিক সমাজে রূপান্তর মানব ইতিহাসের এক অনিবার্য ও প্রগতিশীল ধারা। সনাতন সমাজ আমাদের ঐতিহ্য ও পারস্পরিক সম্পর্কের দৃঢ় বন্ধন শিখিয়েছে, আর আধুনিক সমাজ দিয়েছে গতি, বিজ্ঞান ও অধিকার সচেতনতা। তবে আধুনিক সমাজে যান্ত্রিকতা বাড়লেও সনাতন সমাজের মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব এখনো ফুরিয়ে যায়নি। এই দুই সমাজের ইতিবাচক দিকগুলোর সমন্বয় ঘটিয়েই আমাদের একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।