- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দর্শন জগতের দুই মহান চিন্তাবিদ জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল এবং কার্ল মার্কস। হেগেল যেখানে জগতকে বোঝার জন্য ভাব বা ধারণাকে প্রধান উৎস মনে করতেন, মার্কস সেখানে বস্তু ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এই দুই দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা মানুষের ইতিহাস ও সমাজ পরিবর্তনের ধারাকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
১। মূল ভিত্তি: হেগেলের দর্শনের প্রধান ভিত্তি হলো ‘ভাব’ বা পরম চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাগতিক সবকিছুর পেছনে একটি আধ্যাত্মিক শক্তি বা বুদ্ধি কাজ করে। অন্যদিকে কার্ল মার্কসের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘বস্তু’ বা অর্থনৈতিক শক্তি। মার্কস মনে করতেন যে মানুষের বস্তুগত ও অর্থনৈতিক জীবনই তার চেতনা এবং সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।
২। দ্বন্দ্ববাদের উৎস: হেগেলের মতে দ্বন্দ্বের সূচনা ঘটে মানুষের চিন্তাজগতে বা ধারণার স্তরে। একটি ধারণার বিপরীতে আরেকটি ধারণার সংঘর্ষের মাধ্যমে নতুন সত্যের জন্ম হয়। পক্ষান্তরে কার্ল মার্কস মনে করতেন দ্বন্দ্বের উৎস কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং বাস্তব সমাজের অর্থনৈতিক ও শ্রেণীগত স্বার্থের সংঘাত। উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই দ্বন্দ্ব বাস্তব রূপ লাভ করে।
৩। জগতের ব্যাখ্যা: হেগেল সমগ্র মহাবিশ্ব ও মানব ইতিহাসকে পরমাত্মার বা ঈশ্বরের আত্মপ্রকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে বস্তু জগত আসলে ভাব জগতেরই একটি বাহ্যিক রূপ মাত্র। কিন্তু মার্কস এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে বলেন যে বস্তু জগতই একমাত্র বাস্তব সত্য। মানুষের মন ও চেতনা হলো উন্নত স্তরের বস্তুর বা মস্তিষ্কের প্রতিফলিত রূপ।
৪। ইতিহাসের গতিধারা: হেগেলের দর্শনে ইতিহাসের অগ্রগতি চালিত হয় ধারণার বিবর্তনের মাধ্যমে, যাকে তিনি ‘যুগচেতনা’ বা ‘বিশ্বাত্মা’ বলে অভিহিত করেছেন। সমাজ এই চেতনার টানেই সামনের দিকে এগিয়ে যায়। অপরদিকে মার্কস ইতিহাসের গতিধারাকে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফসল হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে আদিম সমাজ থেকে আজকের পুঁজিবাদ পর্যন্ত সব পরিবর্তনই উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তর।
৫। শ্রেণী সংগ্রাম: হেগেল সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শ্রেণী সংগ্রামের ভূমিকাকে কোনো আলাদা গুরুত্ব দেননি। তিনি সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের বিকাশকে একটি সমন্বিত আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু মার্কসের দর্শনে শ্রেণী সংগ্রাম হলো ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর বিখ্যাত উক্তি অনুযায়ী, আজ পর্যন্ত মানব সমাজের যত ইতিহাস তা আসলে শ্রেণী সংগ্রামেরই ইতিহাস।
৬। রাষ্ট্রের ভূমিকা: হেগেল রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের পৃথিবীতে এক স্বর্গীয় প্রকাশ বা পরম যৌক্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে রাষ্ট্র নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা করে। এর বিপরীতে মার্কস রাষ্ট্রকে একটি শোষণের যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মার্কসের মতে, শাসক শ্রেণী বা পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা এবং সর্বহারা শ্রেণীকে দমন করার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
৭। স্বাধীনতার ধারণা: হেগেলের কাছে স্বাধীনতা হলো মানুষের আত্মোপলব্ধি এবং রাষ্ট্রের আইন ও নিয়মকানুনের সাথে নিজের ইচ্ছাকে মিলিয়ে দেওয়া। রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েই মানুষ প্রকৃত স্বাধীন হয়। অন্যদিকে মার্কসের মতে স্বাধীনতা হলো মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর সবার সমান অধিকার থাকবে, সেখানেই মানুষ প্রকৃত স্বাধীন হবে।
৮। ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি: হেগেল ধর্মকে পরম সত্য বা ঈশ্বরকে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম এবং মানুষের চেতনার উচ্চতর প্রকাশ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু কার্ল মার্কস ধর্মকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন এবং একে শোষকদের হাতিয়ার বলেছেন। মার্কসের মতে, ধর্ম হলো শোষিত মানুষের আফিম, যা তাদের বাস্তব দুঃখ-কষ্ট ভুলে পরকালের কল্পিত সুখে মগ্ন রাখে।
৯। বিকাশের প্রক্রিয়া: হেগেলীয় দ্বন্দ্ববাদের বিকাশের প্রক্রিয়াটি হলো থিসিস বা বাদ, অ্যান্টি-থিসিস বা প্রতিবাদ এবং সিন্থেসিস বা সংবাদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটি একটি চক্রাকার আধ্যাত্মিক যাত্রা। মার্কস এই একই ত্রিমুখী সূত্র গ্রহণ করলেও তার প্রয়োগ করেছেন সম্পূর্ণ বস্তুগত ক্ষেত্রে। মার্কসের মতে, পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতর থেকেই নতুন ব্যবস্থার জন্ম হয়।
১০। বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা: হেগেল সমাজ বা চিন্তার পরিবর্তনের জন্য কোনো সশস্ত্র বা সহিংস বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। তিনি মনে করতেন বিবর্তন ও চেতনার প্রসারের মাধ্যমেই পরিবর্তন আসে। তবে মার্কস মনে করতেন যে বিপ্লবী পরিবর্তন ছাড়া সমাজের মৌলিক রূপান্তর অসম্ভব। শোষক শ্রেণীকে ক্ষমতা থেকে হটাতে সর্বহারা শ্রেণীর সশস্ত্র বিপ্লব অপরিহার্য।
১১। চূড়ান্ত লক্ষ্য: হেগেলের দ্বন্দ্ববাদী দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পরম জ্ঞান বা পূর্ণাঙ্গ আত্মচেতনা অর্জন করা, যেখানে সব দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। মার্কসের বস্তুবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি শ্রেণীহীন ও রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে মানুষের শ্রমের কোনো শোষণ থাকবে না এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে।
১২। আদর্শ বনাম বাস্তবতা: হেগেলের দর্শন মূলত আদর্শবাদী দর্শন যা বাস্তব জগতকে ধারণার অধীনস্থ মনে করে আলোচনা পরিচালনা করে। তাঁর তত্ত্ব অনেক সময় জটিল এবং রহস্যময় রূপ নেয়। মার্কসের দর্শন সম্পূর্ণ বাস্তবমুখী এবং এটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে। মার্কস বাস্তব জীবনের দুঃখ, কষ্ট ও শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন।
১৩। বিচ্ছিন্নতাবাদের ব্যাখ্যা: হেগেলের মতে বিচ্ছিন্নতাবাদ হলো মানুষের পরমাত্মা বা ঈশ্বর থেকে সামাজিকভাবে দূরে সরে যাওয়ার একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। মার্কস এই ধারণাটিকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক নিজের উৎপাদিত পণ্য, নিজের শ্রম এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১৪। সামাজিক চেতনা: হেগেল বিশ্বাস করতেন যে মানুষের সামাজিক চেতনা বা চিন্তা তার সামাজিক অস্তিত্বকে বা বাস্তব জীবনকে নির্ধারণ করে। অর্থাৎ মানুষ যেভাবে ভাবে সেভাবেই সমাজ গড়ে ওঠে। মার্কস এর তীব্র বিরোধিতা করে বলেন যে মানুষের সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে। মানুষের বেঁচে থাকার অর্থনৈতিক পরিবেশই তার চিন্তাধারা তৈরি করে।
১৫। দর্শনের উদ্দেশ্য: হেগেল মনে করতেন দর্শনের মূল কাজ হলো জগতকে কেবল ব্যাখ্যা করা এবং এর পেছনের যৌক্তিক কারণগুলো বোঝা। তবে মার্কস দর্শনের এই সনাতন উদ্দেশ্যকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন। মার্কসের মতে, দার্শনিকরা এযাবৎ জগতকে কেবল বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাই করেছেন, কিন্তু আসল কাজ হলো জগতকে পরিবর্তন করা।
১৬। ব্যক্তির গুরুত্ব: হেগেলের দর্শনে ব্যক্তি মানুষের চেয়ে বিশ্বাত্মা বা সমষ্টিগত রাষ্ট্র শক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল। ব্যক্তি এখানে বড় উদ্দেশ্যের অংশ মাত্র। মার্কসীয় দর্শনেও সামষ্টিক স্বার্থ বড়, তবে তা মূলত শ্রমিক শ্রেণীর যৌথ শক্তির ওপর জোর দেয়। মার্কস প্রতিটি ব্যক্তির শ্রমের মূল্য এবং তার শোষণ মুক্তির ওপর আলোকপাত করেছেন।
১৭। ভবিষ্যতের রূপরেখা: হেগেল তাঁর সমসাময়িক প্রুশীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেই যৌক্তিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখতে পেয়েছিলেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন রূপরেখা দেননি। কিন্তু মার্কস পুঁজিবাদের পতন অবশ্যম্ভাবী বলে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদ ধ্বংস হয়ে সমাজতন্ত্র এবং পরবর্তীতে সাম্যবাদের দিকে মানব সমাজ এগিয়ে যাবে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, হেগেল এবং মার্কস উভয়েই দ্বন্দ্ববাদের ধারণাকে গ্রহণ করলেও তাদের প্রয়োগ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। মার্কস নিজেই বলেছিলেন যে হেগেলের দ্বন্দ্ববাদ মাথায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তিনি সেটাকে পায়ের ওপর খাড়া করেছেন। হেগেলের ভাববাদ আমাদের চিন্তার গভীরতা দেয়, আর মার্কসের বস্তুবাদ আমাদের বাস্তব সমাজ পরিবর্তনের পথ দেখায়।