- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে মানুষের এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে নানা রূপে ও কাঠামোতে। সমাজবিজ্ঞানীরা পারিবারিক এই কাঠামোকে মূলত কর্তৃত্বের ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—একদিকে রয়েছে পুরুষ-শাসিত পিতৃতান্ত্রিক পরিবার, আর অন্যদিকে বিরল হলেও বিদ্যমান মাতৃতান্ত্রিক পরিবার। এই দুই ধরনের পরিবারই সমাজের সংস্কৃতি, নিয়মকানুন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
শাব্দিক অর্থ:
- পিতৃতান্ত্রিক (Patriarchy): এই শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Patria’ (পিতা বা গোত্রপতি) এবং ‘Archē’ (শাসন বা কর্তৃত্ব) থেকে, যার সম্মিলিত অর্থ হলো ‘পিতার শাসন’।
- মাতৃতান্ত্রিক (Matriarchy): এই শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘Māter’ (মাতা) এবং গ্রিক শব্দ ‘Archē’ (শাসন বা কর্তৃত্ব) থেকে, যার সম্মিলিত অর্থ হলো ‘মাতার শাসন’।
পারিবারিক সংগঠনের এই দুটি ধরন সমাজের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কার হাতে ন্যস্ত, সেই ভিত্তি নির্দেশ করে।
- পিতৃতান্ত্রিক পরিবার: যে পরিবারে কর্তৃত্ব, সম্পত্তি এবং বংশমর্যাদা প্রধানত পুরুষের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এখানে সংসারের কর্তা হন পুরুষ, তিনিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তার মাধ্যমেই উত্তরাধিকার বর্তায়।
- মাতৃতান্ত্রিক পরিবার: যে পরিবারে কর্তৃত্ব, সম্পত্তি এবং বংশমর্যাদা প্রধানত নারীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এখানে সংসারের প্রধান হন নারী, তিনিই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন এবং তার দিক থেকেই সন্তানেরা গোত্রের পরিচয় ও সম্পত্তি লাভ করে।
পারিবারিক এই দুটি কাঠামোকে সমাজবিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ ও গবেষকগণ নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন:
১।ম্যাকাইভার এবং পেজ (MacIver and Page): তারা পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকে সেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে পিতা অথবা বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ সদস্যই হলো পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু এবং তার হাতেই থাকে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব।
২।অধ্যাপক এম. এন. শ্রীনিবাস (M. N. Srinivas): তিনি পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বলতে সেই কাঠামোকে বোঝান, যেখানে পুরুষ-সদস্যরা শুধু পরিবারের প্রধানই নন, বরং বংশধারাও তাদের নামেই প্রচলিত থাকে এবং সম্পত্তি পুরুষদের মাধ্যমে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায়।
৩।ই. বি. টাইলর (E. B. Tylor): নৃতত্ত্ববিদ ই. বি. টাইলর মাতৃতান্ত্রিক সমাজের কাঠামোকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যেখানে মাতৃসূত্রেই উত্তরাধিকার ও বংশ গণনা করা হয় এবং সাধারণত নারীরাই সম্পত্তির অধিকারী হন।
৪।অধ্যাপক ই. এ. ওয়েস্টারমার্ক (E. A. Westermarck): তাঁর মতে, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে কেবল মায়ের মাধ্যমেই বংশের পরিচয় পাওয়া যায় এবং পরিবারে নারীর স্থান পুরুষের চেয়ে উচ্চে থাকে।
৫।স্যার হেনরি মেইন (Sir Henry Maine): তিনি তার ‘Ancient Law’ গ্রন্থে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারকে একটি প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে কর্তার ক্ষমতা প্রায় স্বৈরাচারী ছিল এবং তিনি পরিবারের সমস্ত সদস্যদের উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ রাখতেন।
৬।লুইস হেনরি মর্গান (Lewis Henry Morgan): তিনি মানব সমাজের বিবর্তনের ধারণায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে একটি প্রাচীন স্তর হিসেবে চিহ্নিত করেন, যেখানে নারীর অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও প্রভাবশালী।
৭।ড. আর. এম. ম্যাকাইভার (R. M. MacIver): তিনি সংক্ষেপে পিতৃতন্ত্রকে সেই শাসন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন যেখানে পিতার হাতে পরিবারের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে।
পিতৃতান্ত্রিক পরিবার হলো সেই সাংগঠনিক কাঠামো, যেখানে পরিবারের জৈবিক ও সামাজিক কর্তৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সম্পত্তি ভোগের অধিকার মূলত পুরুষের হাতে ন্যস্ত থাকে এবং উত্তরাধিকার পুরুষ-সূত্রেই বর্তায়। অন্যদিকে, মাতৃতান্ত্রিক পরিবার হলো এক বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে পরিবারের মুখ্য ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নারীর হাতে ন্যস্ত এবং বংশমর্যাদা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার মাতৃসূত্রেই নির্ধারিত হয়।
উপসংহার: পিতৃতান্ত্রিক ও মাতৃতান্ত্রিক উভয় পরিবারই মানব সমাজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। একটিতে পুরুষের প্রাধান্য, অন্যটিতে নারীর। পিতৃতান্ত্রিক পরিবার বিশ্বজুড়ে প্রধান ধারা হলেও, কিছু কিছু সমাজে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার তার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ক্ষমতা বন্টন এবং উত্তরাধিকারের ধারা বজায় রেখে চলেছে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে আধুনিক পরিবারে এখন একক কর্তৃত্বের চেয়ে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে এই দুই চিরায়ত কাঠামোর বাইরে একটি নতুন, আরও সমতাপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থার দিকে সমাজকে চালিত করতে পারে।

