- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কৃষি মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ভিত্তি, আর এই কৃষিরই এক বিশেষ পদ্ধতি হলো জুম চাষ। এটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার এক চিরায়ত ধারা, যা তাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই পদ্ধতিটি স্থানান্তরিত চাষ নামেও পরিচিত, যেখানে কৃষক একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর জমির স্থান পরিবর্তন করে থাকে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম মেনে চলার এই কৌশলটি যুগে যুগে পাহাড়ি জনজীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে কাজ করে আসছে।
শাব্দিক অর্থ:
জুম শব্দটি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও, এর মূল ভাবার্থ হলো ‘পুড়িয়ে ফেলা’ বা ‘স্থানান্তর করা’ (Burning and Shifting)। যেহেতু এই চাষ পদ্ধতিতে বনভূমি পুড়িয়ে পরিষ্কার করে চাষ করা হয় এবং কিছু বছর পর স্থান পরিবর্তন করা হয়, তাই এই নামটি সার্থক।
পরিচয়:
জুম চাষ হলো এক ধরনের স্থানান্তরযোগ্য কৃষি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকগণ বনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে পরিষ্কার করে এবং শুকানোর পর তা পুড়িয়ে ফেলে। পোড়ানো ছাই জমির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে। এরপর সেই জমিতে বীজ বুনে ফসল ফলানো হয়। কয়েক বছর ধরে এই জমিতে চাষ করার পর মাটির উর্বরতা কমে গেলে কৃষকগণ সেই জমি ছেড়ে নতুন জমিতে স্থানান্তরিত হন। পুরোনো জমিটি প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় উর্বরতা ফিরে পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর পতিত থাকে।
১।ডক্টর ডি. এন. মজুমদার (Dr. D. N. Majumdar): জুম চাষ হলো একটি আদিম কৃষি পদ্ধতি, যেখানে বনের একটি অংশ কেটে তা পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং সেখানে স্বল্প সময়ের জন্য চাষ করা হয়। উর্বরতা হ্রাস পেলে চাষের স্থান পরিবর্তন করা হয় এবং পুরোনো জমিকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
২।অধ্যাপক জি. এস. ভুজ্জান (Prof. G. S. Bhujjan): এটিকে তিনি ‘স্থানান্তর কৃষি’ (Shifting Cultivation) হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা মূলত পাহাড়ের ঢালে একটি অস্থায়ী ভিত্তিতে ফসল ফলানোর প্রক্রিয়া এবং যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে স্থান পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল।
৩।ডব্লিউ. জি. ফুগ (W. G. Fogg): ফুগ জুম চাষকে এমন একটি পদ্ধতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যা বনভূমিকে ব্যবহার করে এবং যেখানে জমির উর্বরতা মূলত ছাইয়ের উপর নির্ভর করে, এবং যা নির্দিষ্ট সময় পর পর চক্রাকারে চলতে থাকে।
৪।ডক্টর রমেশ চন্দ্র রায় (Dr. Ramesh Chandra Roy): তার মতে, এটি শুধুমাত্র একটি চাষ পদ্ধতি নয়, এটি পাহাড়ি উপজাতিদের একটি জীবনশৈলী, যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।
৫।স্যার জে. এইচ. হাভার্ড (Sir J. H. Havard): তিনি জুম চাষকে এমন এক আদিম কৃষি রূপ হিসেবে দেখেছেন যেখানে যন্ত্রপাতি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে, এবং যা সম্পূর্ণভাবে শ্রম নির্ভর।
৬।অধ্যাপক ই. সি. ডাল্টন (Prof. E. C. Dalton): তিনি এটিকে পাহাড়িদের খাদ্য ও জীবনধারণের প্রাথমিক উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা তাদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭।ডক্টর সত্যেন্দ্রনাথ গোস্বামী (Dr. Satyendra Nath Goswami): তাঁর মতে, এই কৃষি পদ্ধতিটি পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্রের সাথে মানিয়ে চলার একটি স্থানীয় জ্ঞান, যা পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ কমাতে সক্ষম।
আমরা জুম চাষকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি: “জুম চাষ হলো মূলত পাহাড়ের ঢালে সীমিত সরঞ্জাম ব্যবহার করে এক ধরনের স্থানান্তরভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি, যেখানে বনভূমি পুড়িয়ে তার ছাইকে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং মাটির উর্বরতা কমে গেলে নতুন স্থানে চাষের জন্য স্থানান্তর করা হয়, যার ফলে পরিত্যক্ত জমিটি প্রাকৃতিকভাবে পুনরায় সজীব হওয়ার সুযোগ পায়।”
উপসংহার: জুম চাষ পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জন্য কেবল একটি কৃষি পদ্ধতি নয়, এটি তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবন-জীবিকার প্রতিচ্ছবি। এটি একদিকে যেমন তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে একটি প্রাচীন সংযোগ বজায় রাখে। তবে বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে এই প্রথাটির আধুনিকায়ন ও টেকসই বিকল্প খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতিকে সম্মান জানিয়ে এবং আধুনিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির একটি উন্নত সংস্করণ নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।

