- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কার্ল মার্কস রাষ্ট্রকে কোনো কল্যাণকর বা নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মনে করতেন না। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো শোষক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার একটি হাতিয়ার, যা সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। নিচে মার্কসের এই বৈপ্লবিক রাষ্ট্রচিন্তার মূল দিকগুলো সহজ ও সাবলীল ভাষায় আলোচনা করা হলো।
১। রাষ্ট্রের উৎপত্তি: কার্ল মার্কসের মতে রাষ্ট্র মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই ছিল না। আদিম সাম্যবাদী সমাজে যখন ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ছিল না, তখন রাষ্ট্রের কোনো প্রয়োজনও ছিল না। সমাজে যখনই ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হয় এবং সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হয়ে পড়ে, তখনই মূলত শক্তিশালী শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
২। শ্রেণীর হাতিয়ার: মার্কসীয় দর্শনে রাষ্ট্রকে শোষক শ্রেণীর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্র তার আইন, আদালত, পুলিশ এবং সামরিক বাহিনী দিয়ে ধনী শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। এর মূল কাজ হলো উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর পুঁজিপতিদের আধিপত্য বজায় রাখা এবং সাধারণ শ্রমিক শ্রেণীকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে দমন করে রাখা।
৩। অর্থনৈতিক ভিত্তি: মার্কসের মতে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোই হলো আসল ভিত্তি, যার ওপর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো গড়ে ওঠে। অর্থনৈতিকভাবে যে শ্রেণী শক্তিশালী, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মূলত তাদের হাতেই কুক্ষিগত থাকে। তাই রাষ্ট্র কখনোই নিরপেক্ষ হতে পারে না, তা সবসময়ই অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শ্রেণীর হয়ে কাজ করে।
৪। বুর্জোয়াদের কমিটি: কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তাদের বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ গ্রন্থে রাষ্ট্রকে পুঁজিপতিদের একটি সাধারণ কমিটি বলেছেন। আধুনিক রাষ্ট্রের শাসনবিভাগ আসলে সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণীর সাধারণ কাজকর্ম পরিচালনা করার একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি মাত্র। এটি জনগণের সামগ্রিক কল্যাণের চেয়ে মুষ্টিমেয় ধনীদের মুনাফা নিশ্চিত করতে বেশি ব্যস্ত থাকে।
৫। শ্রেণী শোষণ: রাষ্ট্রের মূল চরিত্রই হলো এক শ্রেণী কর্তৃক অন্য শ্রেণীকে শোষণ ও নিপীড়ন করা। আইন কানুন এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ধনীদের সম্পদ সুরক্ষিত থাকে এবং শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের প্রক্রিয়াটিকে রাষ্ট্র তার আইনগত বৈধতা দিয়ে সমাজে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
৬। আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্র কেবল শক্তি প্রয়োগ করেই শাসন করে না, বরং বিভিন্ন আদর্শিক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্ম এবং গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র এমন এক চেতনা তৈরি করে যাতে শোষিত মানুষ তাদের শোষণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। মার্কস একেই ‘মিথ্যা চেতনা’ বা ‘ফলস কনশাসনেস’ বলেছেন।
৭। আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন: কোনো কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র আপাতদৃষ্টিতে দুটি বিবদমান শ্রেণীর ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার ভান করে। কার্ল মার্কস তাঁর ‘দ্য এইটিন্থ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্ট’ গ্রন্থে এই ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে এই আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন সাময়িক এবং চূড়ান্ত বিচারে তা পুঁজিপতি শ্রেণীর দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থই রক্ষা করে।
৮। সর্বহারার একনায়কত্ব: পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়কে মার্কস সর্বহারার একনায়কত্ব বলেছেন। এই পর্যায়ে শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেবে। তারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে পুঁজিপতিদের অবশিষ্ট প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেবে এবং সমাজ থেকে ধনিক শ্রেণীর অর্থনৈতিক সুবিধা চিরতরে বিলুপ্ত করবে।
৯। রাষ্ট্রের বিলুপ্তি: সমাজতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ বা সাম্যবাদ যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন সমাজে আর কোনো শ্রেণীভেদ থাকবে না। যখন কোনো শ্রেণী থাকবে না, তখন এক শ্রেণী কর্তৃক অন্য শ্রেণীকে শোষণ করারও কোনো প্রয়োজন থাকবে না। ফলে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে এবং রাষ্ট্র একসময় আপনাআপনিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
১০। ব্যক্তিগত সম্পত্তি: কার্ল মার্কসের রাষ্ট্র ধারণার সাথে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উচ্ছেদের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। রাষ্ট্র টিকে থাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির পাহাড়কে পাহারা দেওয়ার জন্য। সাম্যবাদী সমাজে যখন সমস্ত উৎপাদন উপায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন রাষ্ট্রের এই পাহারাদারি চরিত্রের অবসান ঘটবে এবং মানব সমাজ মুক্ত হবে।
১১। আইন ব্যবস্থা: মার্কসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনকানুন কোনো ঐশ্বরিক বা নিরপেক্ষ নিয়ম নয়। এই আইনগুলো হলো শাসক শ্রেণীর ইচ্ছারই আইনি রূপ প্রকাশ। আইন এমনভাবে সাজানো হয় যা ধনীদের সম্পত্তি চুরি হওয়া থেকে রক্ষা করে, কিন্তু শ্রমিকের শ্রম চুরি হওয়াকে আইনি স্বীকৃতি দেয়।
১২। আমলাতান্ত্রিক শাসন: রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে বিশাল আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠে, মার্কস তাকে সমাজের ওপর এক ধরনের পরজীবী সত্তা হিসেবে দেখেছেন। এই আমলাতন্ত্র সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শাসক শ্রেণীর স্বার্থের অনুগত সেবক হিসেবে কাজ করে। এরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নকে টিকিয়ে রাখে।
১৩। বিশ্বায়ন ও রাষ্ট্র: মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সাথে রাষ্ট্রের ভূমিকাও আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। পুঁজিপতিরা কেবল নিজ দেশের শ্রমিকদের শোষণ করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং রাষ্ট্রের শক্তি ব্যবহার করে অনুন্নত দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠন করে। আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ মূলত এই রাষ্ট্রীয় শক্তির আন্তর্জাতিক অপপ্রয়োগের একটি বাস্তব উদাহরণ।
১৪। মানবিক মুক্তি: কার্ল মার্কসের রাষ্ট্র ভাবনার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করা। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র মানুষকে নাগরিক সাম্য দিলেও অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারে না। প্রকৃত মানবিক মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন মানুষ রাষ্ট্রীয় দাসত্ব এবং অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে।
১৫। বলপ্রয়োগের মাধ্যম: রাষ্ট্র স্বভাবগতভাবেই একটি বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। পুলিশ, সামরিক বাহিনী, কারাগার এবং আদালত হলো রাষ্ট্রের এই বলপ্রয়োগের প্রত্যক্ষ ও দৃশ্যমান মাধ্যম। সাধারণ মানুষ যখনই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, তখনই রাষ্ট্র এই সশস্ত্র বাহিনীগুলো ব্যবহার করে জনতাকে নির্মমভাবে দমন করে।
১৬। ঐতিহাসিক বস্তুুবাদ: মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে রাষ্ট্রকে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্বের সাময়িক সৃষ্টি হিসেবে দেখা হয়। দাস সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজ—প্রত্যেক যুগেই রাষ্ট্রের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে শোষক শ্রেণীর রূপান্তরের সাথে সাথে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে রাষ্ট্রের এই শোষক চরিত্রও একদিন বদলে যাবে।
১৭। সাম্যবাদী সমাজ: মার্কসের রাষ্ট্র চিন্তার শেষ পরিণতি হলো একটি রাষ্ট্রহীন ও শ্রেণীহীন সাম্যবাদী সমাজ গঠন। এই সমাজে মানুষের ওপর মানুষের শাসনের পরিবর্তে শুরু হবে কেবল উৎপাদন সামগ্রী ও বস্তুনিচয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা। সেখানে প্রত্যেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করবে এবং প্রত্যেকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ভোগ করার সুযোগ পাবে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, কার্ল মার্কসের রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণাটি প্রচলিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে। তিনি রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের কোনো সৃষ্টি বা জনকল্যাণের মাধ্যম না ভেবে, একে একটি শ্রেণী শোষণের নির্মম যন্ত্র হিসেবে উন্মোচিত করেছেন। তাঁর এই বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বজুড়ে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আজও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।