- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি গতিশীল ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হলো রাজনৈতিক উন্নয়ন। কিন্তু উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই অগ্রযাত্রা মোটেও মসৃণ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, যা রাজনৈতিক উন্নয়নের পথকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত ও সংকুচিত করে তোলে।
রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রধান সংকটসমূহ:
১। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: রাজনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সংকট হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারলে রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। যখন প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন স্থবির হয়ে যায়। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ছাড়া একটি টেকসই এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়।
২। নেতৃত্বের সংকট: একটি দেশের সঠিক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের বিকল্প নেই। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়ই সৎ, দক্ষ এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের তীব্র অভাব দেখা যায়। ব্যক্তিস্বার্থ ও সংকীর্ণ দলীয় মনোভাবের কারণে অনেক সময় যোগ্য ব্যক্তিরা দেশ পরিচালনার মূল ধারায় আসতে পারেন না। এই নেতৃত্বহীনতা বা অযোগ্য নেতৃত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ও বাইরে চরম বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
৩। রাজনৈতিক সহিংসতা: রাজনৈতিক অঙ্গনে সহনশীলতার অভাব এবং ক্রমাগত সহিংসতা উন্নয়নের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। ক্ষমতার লড়াইয়ে দলগুলোর মধ্যে সংঘাত, হরতাল, ভাঙচুর এবং জানমালের ক্ষতি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই কলুষিত করে না, বরং দেশের অর্থনীতিকেও ধ্বংস করে। সাধারণ মানুষ যখন রাজনীতিকে ভয়ের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করে, তখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পতন ঘটে।
৪। দুর্নীতির বিস্তার: দুর্নীতি হলো রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় যা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ, স্বজনপ্রীতি এবং ঘুষের সংস্কৃতি যখন রাজনীতিতে জেঁকে বসে, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। মেধার মূল্যায়ন না হওয়ায় যোগ্য ব্যক্তিরা দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান না। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক পরিবেশ জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় ঘটায় এবং রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি দুর্বল করে।
৫। অংশগ্রহণের অভাব: সুস্থ রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশের সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মতামত প্রকাশ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেক সমাজেই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকে। যখন একটি বড় জনগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়, তখন রাজনীতিতে একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া যেকোনো রাজনৈতিক সংস্কার বা উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।
৬। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি রাজনৈতিক উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। যখন অপরাধীরা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে আইনের প্রতি আস্থা উঠে যায়। এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা, অন্যায় এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সুগম করে তোলে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে না পারলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা সংকটের মুখে পড়ে।
৭। রাজনৈতিক মেরুকরণ: চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ বা দলগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত দূরত্ব সমাজের ঐক্য বিনষ্ট করে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে নিজেদের দলীয় স্বার্থকে বড় করে দেখে, তখন দেশ বিভাজনের দিকে এগিয়ে যায়। সাধারণ ইস্যুগুলোতেও দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্যমত্য তৈরি হয় না, যা জাতীয় নীতি নির্ধারণে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। এই ধরনের মেরুকরণ সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করে।
৮। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: রাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকে আমলাতন্ত্রের ওপর, কিন্তু অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রাজনৈতিক উন্নয়নকে ধীর করে দেয়। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং অদক্ষতা সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে জনগণের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। অনেক সময় আমলারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন, যার ফলে নিরপেক্ষ সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এই প্রশাসনিক জড়তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দেয়।
৯। অর্থনৈতিক বৈষম্য: একটি দেশের তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের হুমকি। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন নিম্নবিত্ত মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম নেয়। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অনেক সময় স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নাগরিক ছাড়া একটি সচেতন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সমাজ গঠন করা অসম্ভব।
১০। শিক্ষার অভাব: রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিস্তার অত্যন্ত অপরিহার্য একটি উপাদান। শিক্ষার অভাব থাকলে নাগরিকরা তাদের অধিকার এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন না। ফলে তারা সহজেই কুসংস্কার, গুজব ও অন্ধ দলীয় আনুগত্যের শিকার হয়ে পড়েন এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়, যা রাজনৈতিক অনগ্রসরতার মূল কারণ।
১১। সুশাসনের অভাব: সুশাসনের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে চিরতরে ধসিয়ে দেয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার অভাব থাকলে সরকারের কোনো পদক্ষেপই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। যখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে তাদের কল্যাণে কাজ হচ্ছে না, তখন সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সুশাসন ছাড়া রাজনৈতিক উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে রূপ নেয় না।
১২। দলীয়করণ নীতি: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত দলীয়করণ যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এর ফলে যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিরা উপেক্ষিত হন এবং অযোগ্যরা বড় বড় দায়িত্ব লাভ করেন। এই নীতি বিচার বিভাগ, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। দলীয়করণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবকের পরিবর্তে নির্দিষ্ট দলের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
১৩। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: স্বাধীন গণমাধ্যম হলো একটি গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থার চতুর্থ স্তম্ভ স্বরূপ। কিন্তু যখন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয় এবংcensorship আরোপ করা হয়, তখন সত্য চাপা পড়ে যায়। সরকারের ভুলত্রুটি ও দুর্নীতি জনসমক্ষে আসতে পারে না, যা একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ না থাকলে নাগরিকরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, যা রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটায় না।
১৪। নির্বাচন ব্যবস্থার সংকট: একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থায় কারচুপি, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং অর্থলিপ্সা এই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ কলুষিত করে তোলে। যখন জনগণ বুঝতে পারে তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই, তখন তারা নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থার সংকট রাজনৈতিক দলগুলোর বৈধতা কেড়ে নেয় এবং দেশে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনে।
১৫। বিদেশি হস্তক্ষেপ: উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরাশক্তি বা বিদেশি সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ একটি বড় সংকট। অনেক সময় বিদেশি সাহায্য বা ঋণের শর্ত হিসেবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয় এবং জাতীয় স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। নিজস্ব সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে বিদেশি প্রেসক্রিপশনে চলা রাজনীতি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।
১৬। সংবিধানের অবমাননা: সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এবং রাজনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। কিন্তু যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে সংবিধানের অপব্যবহার বা বারবার সংশোধন করে, তখন সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য না থাকলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্ম নেয়।
১৭। নাগরিক সচেতনতার অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নাগরিকদের অসচেতনতা ও উদাসীনতাও রাজনৈতিক উন্নয়নের একটি বড় সংকট। অনেকেই ভাবেন রাজনীতি কেবল রাজনীতিবিদদের কাজ, যার ফলে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হন না। অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন সমাজ থেকে কোনো সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না, তখন শাসকরা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। সচেতন নাগরিক সমাজই পারে একটি দেশকে সঠিক রাজনৈতিক পথে পরিচালিত করতে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক উন্নয়ন কোনো একক বা রাতারাতি ঘটিত বিষয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। উপরে আলোচিত সংকটগুলো একটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দেয় এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে। তাই একটি উন্নত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল এই সংকটগুলো কাটিয়ে একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব।