- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে এই গণজাগরণ ছিল মাইলফলক। আর এই মহান গণঅভ্যুত্থানের পেছনে যিনি মূল চালিকাশক্তি ও নেপথ্য নায়ক হিসেবে কাজ করেছিলেন, তিনি হলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তাঁর আপসহীন নেতৃত্বই পুরো আন্দোলনকে বেগবান করেছিল।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা হিসেবে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অবদান:
১। পটভূমি তৈরি: মওলানা ভাসানী ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের বহু পূর্ব থেকেই শোষণের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেন। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তিনি গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলেন। তাঁর এই দীর্ঘদিনের প্রচারণাই মূলত ঊনসত্তরের গণজাগরণের শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছিল। সাধারণ কৃষক-শ্রমিককে তিনি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শামিল হতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
২। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: আইয়ুব সরকার যখন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে, তখন মওলানা ভাসানী এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি এই মামলাকে বাঙালি জাতিকে দমনের একটি গভীর চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করেন। ভাসানী দেশজুড়ে জনসভা করে এই মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন। তাঁর এই অবস্থান আন্দোলনের গতিকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
৩। নেতৃত্ব প্রদান: ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে মওলানা ভাসানী ছিলেন সামনের সারির আপসহীন এক দিকপাল নেতা। যুবসমাজ ও সাধারণ জনতাকে তিনি রাজপথে নেমে আসার জন্য সরাসরি ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং আপসহীন মনোভাব পুরো জাতিকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি যেভাবে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা সত্যিই এক অভাবনীয় ব্যাপার ছিল।
৪। জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ: মওলানা ভাসানী সবসময় সাধারণ মানুষের অতি কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর জাদুকরী ও সহজ-সরল বক্তব্যের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে রাজপথে নামাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের মনের ভাষা তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারতেন।
৫। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন: স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী প্রথম থেকেই অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করেন। তিনি আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক প্রহসনকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর প্রতিটি সভা-সমাবেশ থেকে আইয়ুব সরকারের পতনের ডাক দেওয়া হতো। এই আপসহীন অবস্থানের কারণে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে।
৬। ঘেরাও কর্মসূচি: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে মওলানা ভাসানীর দেওয়া ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল। সরকারি দফতর, সচিবালয় এবং শোষকদের বাড়ি-ঘেরাও করার এই অভিনব কৌশল আন্দোলনকে এক নতুন মাত্রা দেয়। এই কর্মসূচির ফলে আইয়ুবের শাসনযন্ত্র পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষ এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়।
৭। শ্রমিক-কৃষক সংহতি: মওলানা ভাসানী কেবল শহরকেন্দ্রিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্ত করেছিলেন। মেহনতি মানুষকে আন্দোলনের মূল স্রোতে নিয়ে আসা ছিল তাঁর এক বিশাল রাজনৈতিক সাফল্য। ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের কলকারখানার শ্রমিকরা তাঁর ডাকে একযোগে রাজপথে নেমে এসেছিল। এতে আন্দোলনের পরিধি ও শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৮। আন্দোলনের ডাক: ১৯৬৯ সালের শুরুতেই মওলানা ভাসানী ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে হরতাল ও ধর্মঘটের ডাক দেন। তাঁর এই ডাকে সাড়া দিয়ে পুরো দেশের মানুষ স্থবির হয়ে পড়েছিল। দোকানপাট, যানবাহন এবং অফিস-আদালত সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে জনগণ তাঁর কর্মসূচির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। এই সর্বাত্মক আন্দোলন আইয়ুব সরকারকে চরম বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল।
৯। ডক্টর শামসুজ্জোহা হত্যাকাণ্ড: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডক্টর শামসুজ্জোহাকে যখন পাকিস্তানি বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন মওলানা ভাসানী তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা দেশে তীব্র আন্দোলনের ডাক দেন। এই ঘটনার পর তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্দোলন আরও বেশি মারমুখী রূপ ধারণ করে। তিনি শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা করেন।
১০। আসাদ হত্যার প্রতিবাদ: ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বা আসাদ শহীদ হওয়ার পর মওলানা ভাসানী ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছুটে যান। তিনি আসাদের রক্তভেজা শার্ট দেখে আবেগাপ্লুত হন এবং পাকিস্তানি শোষকদের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে বলে ঘোষণা করেন। আসাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার আহ্বান জানান। এতে ছাত্রসমাজ আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়।
১১। ঐক্য প্রতিষ্ঠা: মওলানা ভাসানী আন্দোলনের স্বার্থে তৎকালীন সকল রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য বজায় রাখার চেষ্টা করেন। তিনি জানতেন যে, বিভেদ থাকলে স্বৈরাচারী সরকারকে হঠানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভূমিকার কারণে আন্দোলন একমুখী রূপ নেয়।
১২। কারাগার থেকে মুক্তি: শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মওলানা ভাসানী আলটিমেটাম দেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, স্বৈরাচারী সরকার যদি অবিলম্বে তাঁদের মুক্তি না দেয়, তবে ঢাকাকে অবরুদ্ধ করা হবে। তাঁর এই তীব্র হুমকির মুখে আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। এটি ছিল আন্দোলনের এক বিশাল বিজয়।
১৩। রাজপথের সংগ্রাম: বয়সের ভার নুয়ে দিলেও মওলানা ভাসানীকে রাজপথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়নি। তিনি লাঠি হাতে মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তরুণদের মাঝে বিপুল উদ্দীপনার সৃষ্টি করতেন। তাঁর এই শারীরিক উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মনে সাহসের সঞ্চার করত। শোষকের বুলেট বা টিয়ার গ্যাস কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি।
১৪। স্বাধিকারের চেতনা: মওলানা ভাসানী কেবল আইয়ুব খানের পতনই চাননি, তিনি বাঙালির পূর্ণ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনাকে জাগ্রত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যগুলোতে সবসময় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা জোরালোভাবে ফুটে উঠত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের সম্পদ লুটে নিচ্ছে। এই চেতনা পরবর্তীকালে স্বাধীনতার মূল ভিত্তি হয়।
১৫। গোলটেবিল বৈঠক বর্জন: আইয়ুব খান যখন আন্দোলন দমাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকের ডাক দেন, তখন মওলানা ভাসানী তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো আপস বা বৈঠক হবে না। তাঁর এই কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে স্বৈরশাসকের চক্রান্ত ভেস্তে যায়।
১৬। আইয়ুবের পতন: মওলানা ভাসানীর অবিরাম সংগ্রাম ও দিকনির্দেশনার ফলেই শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ এক দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছিল ভাসানীর আপসহীন আন্দোলনের সুবাদে। এটি ছিল বাংলার আপামর জনতার এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী বিজয়।
১৭। স্বাধীনতার ভিত্তি: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে মওলানা ভাসানীর দেওয়া রূপরেখাই মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতি বুঝতে পেরেছিল যে, পাকিস্তানি শোষকদের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে চূড়ান্ত সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। তাই বলা যায়, মওলানা ভাসানীই ছিলেন স্বাধীনতার মূল ভিত্তি রচয়িতা।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অবদান ছিল অনন্য ও অবিস্মরণীয়। তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব, কৃষাণ-কিষাণীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং রাজপথের অকুতোভয় সংগ্রাম স্বৈরাচারী আইয়ুব শাহীর পতন ত্বরান্বিত করেছিল। মজলুম জননেতা হিসেবে তিনি যেভাবে সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরেই বাঙালি জাতি পরবর্তীতে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল।