- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই অগ্রগতির মূল ভিত্তি হলো সরকারের বৈধতা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশেই এই বৈধতার সংকট একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঔপনিবেশিক অতীত, ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার কারণে এই দেশগুলো প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশসমূহ কেন বৈধতার সংকটের সম্মুখীন হয়? আলোচনা:
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব একটি সাধারণ চিত্র। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের অভাব জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করে। যখন সাধারণ মানুষ দেখে যে বুলেট বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা নির্ধারিত হচ্ছে, তখন তারা প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে দেশের শাসনব্যবস্থা গভীর বৈধতার সংকটে পতিত হয়।
২। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: বিশ্বের অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশই অতীতে কোনো না কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনে দীর্ঘ সময় শাসিত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর তারা যে প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের অনুকূলে ছিল না। এই ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও আইনি কাঠামো জনগণের সাথে দূরত্বের সৃষ্টি করে। ফলে আধুনিক স্বাধীন রাষ্ট্রেও সরকার জনগণের কাছে পূর্ণ বৈধতা পেতে ব্যর্থ হয়।
৩। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য সুশাসন, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দুর্বল ও অকার্যকর অবস্থায় থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে না পারায় সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয় না। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত গোটা ব্যবস্থার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
৪। তীব্র দুর্নীতি: দুর্নীতি হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক অন্তরায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, ঘুষবাণিজ্য এবং স্বজনপ্রীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত অবনতির দিকে ধাবিত হয়। যখন নাগরিকরা দেখে যে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ এবং দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তারা সরকারের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই ব্যাপক দুর্নীতিই জনগণের মনে চরম ক্ষোভ ও বৈধতার সংকট জন্ম দেয়।
৫। অর্থনৈতিক বৈষম্য: উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও তা সমাজের উচ্চবিত্তের হাতে পুঞ্জীভূত থাকে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার এই আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক ব্যবধান সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেয়। সাধারণ মানুষ যখন মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়, তখন তারা সরকারের অর্থনৈতিক নীতিকে বর্জন করে। এই ধনাঢ্য ও প্রান্তিক শ্রেণির ভেদাভেদ রাষ্ট্রের বৈধতার ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।
৬। সুশাসনের অভাব: সুশাসন বলতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি পরিচ্ছন্ন প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জবাবদিহিতার প্রচণ্ড অভাব থাকায় সরকারি সিদ্ধান্তসমূহ সাধারণ মানুষের কল্যাণে খুব একটা কাজে আসে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণে নাগরিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সহজে পৌঁছায় না। এই সুশাসনের অভাবই জনগণের মনে চরম অসন্তোষ এবং সরকারের প্রতি তীব্র অনাস্থা তৈরি করে।
৭। সামরিক হস্তক্ষেপ: অনেক উন্নয়নশীল দেশেই বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের এক দীর্ঘ ও কলঙ্কিত ইতিহাস রয়েছে। সামরিক জান্তারা যখন বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখল করে, তখন তা জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে সরাসরি অপমান করে। যদিও তারা সাময়িকভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে তারা জনগণের স্বাভাবিক নৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারে না। এই বারবার সামরিক অভ্যুত্থান এবং হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতার সংকটকে আরও বেশি বাড়িয়ে তোলে।
৮। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকার জনগণের কাছ থেকে শাসন করার আইনগত বৈধতা লাভ করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়শই নির্বাচনে কারচুপি, ভোট জালিয়াতি এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। যখন একটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয় না, তখন গঠিত সরকারের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। এই ত্রুটিপূর্ণ ও বিতর্কিত নির্বাচন ব্যবস্থার কারণেই মূলত সবচেয়ে বড় বৈধতার সংকট তৈরি হয়।
৯। মৌলিক অধিকার হরণ: রাষ্ট্রে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার থাকা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই মৌলিক অধিকারগুলো কঠোরভাবে খর্ব করে। ভিন্নমত দমন করার জন্য যখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয়, তখন জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও বিদ্রোহের দানা বাঁধে। অধিকারহীন নাগরিক সমাজ স্বাভাবিকভাবেই সেই স্বৈরাচারী শাসনকে মন থেকে বৈধ বলে মেনে নিতে পারে না।
১০। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তবায়ন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ছোটখাটো বিষয়েও হেনস্থার শিকার হয়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ করে দেয়। যখন দেশের মানুষ আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পায় না, তখন তারা সমগ্র রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
১১। জাতিগত সংঘাত: অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও উপজাতির মানুষ একসঙ্গে বসবাস করলেও তাদের মধ্যে সমতা থাকে না। বহু সংস্কৃতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অবহেলিত হলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। সরকার যখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, তখন অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবের জন্ম হয়। এই অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও জাতিগত বিভেদ এবং সংঘাত রাষ্ট্রের সার্বিক বৈধতাকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে ফেলে।
১২। বহিঃশক্তির প্রভাব: দুর্বল অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামোর কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রায়শই উন্নত রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই সুযোগে বিদেশি শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে। যখন দেশের জনগণ বুঝতে পারে যে তাদের সরকার নিজস্ব স্বার্থে নয় বরং বিদেশি প্রভুদের ইশারায় চলছে, তখন সরকারের প্রতি দেশপ্রেমিক মানুষের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য কমে যায়। এই বাহ্যিক প্রভাব ও পরনির্ভরশীলতা রাষ্ট্রের সার্বভৌম বৈধতাকে চরম সংকটে ফেলে।
১৩। বেকারত্ব বৃদ্ধি: তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম বড় ব্যর্থতা। উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজ যখন যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পায় না, তখন তাদের মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বেকারত্বের এই অভিশাপ তরুণ সমাজকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত করতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা তরুণ প্রজন্মের চোখে তার বৈধতাকে সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট করে।
১৪। ঋণের বোঝা: উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের উন্নয়ন বাজেট ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বিভিন্ন ধনী দেশের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়। এই ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সরকারকে জনগণের ওপর অতিরিক্ত কর ও রাজস্বের বোঝা চাপিয়ে দিতে হয়। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেয়। এই চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং ঋণের ফাঁদ সরকারের নীতিগত বৈধতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি করে।
১৫। গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ: তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরকার প্রায়শই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করে এবং নিজেদের গুণকীর্তন প্রচারে বাধ্য করে। সত্য তথ্য গোপন করার এই প্রবণতা জনগণের মধ্যে এক ধরনের বিকল্প ও নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেয়। যখন মূল ধারার গণমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন সরকারের প্রচারণাও জনগণের কাছে তার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
১৬। নাগরিক সচেতনতা: আধুনিক যুগে শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকরা এখন তাদের অধিকার সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তারা এখন আর সরকারের ভুল নীতি বা দুর্নীতিকে নিয়তি বলে সহজে মেনে নিতে রাজি নয়। যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিক সমাজ এখন দ্রুত সোচ্চার এবং ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। জনগণের এই রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকারবোধের কারণেই সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড সহজেই বৈধতার সংকটে পড়ে।
১৭। প্রতিশ্রুতির খেলা: নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে আকাশচুম্বী ও অবাস্তব নানা ধরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই সমস্ত প্রতিশ্রুতির সিংহভাগই আর বাস্তবায়িত হতে দেখা যায় না। ক্ষমতার লোভ দেখানোর এই খেলা জনগণের সাথে এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতারণা হিসেবে গণ্য হয়। বারবার এই ধরণের আশ্বাসের খেলা দেখতে দেখতে জনগণ একসময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সমগ্র ব্যবস্থার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।
পরিশেষে বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশসমূহে বৈধতার সংকট কোনো একক কারণে নয়, বরং বহুমুখী রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতার পুঞ্জীভূত ফল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এই সংকট থেকে উত্তরণ অত্যন্ত জরুরি। একটি দেশকে প্রকৃত অর্থে বৈধতার সংকট থেকে মুক্ত করতে হলে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র জনমুখী ও জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই গভীর সংকট দূর করা সম্ভব।