- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার ঘাটতি থেকে বৈধতার সংকট সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা সমস্যার কারণে এসব দেশে জনগণ অনেক সময় শাসনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈধতার সংকটের কারণসমূহ:
১। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বৈধতার সংকট সৃষ্টি করে। যখন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে না, তখন জনগণের মধ্যে সরকারের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হয়।
২। দুর্বল প্রতিষ্ঠান: শক্তিশালী ও কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান না থাকলে রাষ্ট্রের বৈধতা দুর্বল হয়ে পড়ে। আইনসভা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও নির্বাচন ব্যবস্থার কার্যকর ভূমিকা না থাকলে জনগণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে।
৩। দুর্নীতি বৃদ্ধি: দুর্নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈধতার সংকটের অন্যতম বড় কারণ। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের কারণে জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হয় এবং শাসনব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪। অর্থনৈতিক বৈষম্য: ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অতিরিক্ত বৈষম্য রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। যখন সাধারণ মানুষ মনে করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান নয় এবং কিছু মানুষ বেশি সুবিধা পাচ্ছে, তখন সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৫। দারিদ্র্য সমস্যা: ব্যাপক দারিদ্র্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকার ব্যর্থ হলে তারা রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশ হয়। এর ফলে সরকারের প্রতি সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়।
৬। বেকারত্ব সংকট: উচ্চ বেকারত্ব বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে না পারলে জনগণের একটি অংশ মনে করে সরকার তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হ্রাস পায়।
৭। দুর্বল নির্বাচন ব্যবস্থা: অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভোটাররা যদি মনে করেন তাদের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন হচ্ছে না, তাহলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাস কমে যায়।
৮। রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাব: জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা ধরে রাখতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনেক সময় সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকে, ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
৯। মানবাধিকার লঙ্ঘন: নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত হলে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। জনগণ যখন মনে করে রাষ্ট্র তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করছে না, তখন বৈধতার সংকট গভীর হয়।
১০। প্রশাসনিক দুর্বলতা: দক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের অভাব রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়। সরকারি সেবা প্রদানে ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণ জনগণের অসন্তোষ বাড়ায়।
১১। সামাজিক বিভক্তি: জাতিগত, ধর্মীয়, ভাষাগত বা আঞ্চলিক বিভক্তি অনেক উন্নয়নশীল দেশে বৈধতার সংকট সৃষ্টি করে। রাষ্ট্র যদি সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে একটি অংশ রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে পারে।
১২। সামরিক হস্তক্ষেপ: কিছু উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ গণতান্ত্রিক ধারাকে দুর্বল করে। নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে অগণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণের রাজনৈতিক আস্থা কমে যায়।
১৩। দুর্বল নেতৃত্ব: যোগ্য ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাব বৈধতার সংকট বাড়ায়। নেতারা যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়।
১৪। আইনশৃঙ্খলার অবনতি: অপরাধ, সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেলে জনগণ সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব পালনে ঘাটতি দেখা দেয়।
১৫। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: স্বাধীন গণমাধ্যমের অভাব জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার সীমিত করে। সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছতা না থাকলে গুজব, অবিশ্বাস ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়, যা বৈধতার সংকট তৈরি করে।
১৬। বৈশ্বিক নির্ভরতা: উন্নয়নশীল অনেক দেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে। বিদেশি চাপ বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনেক সময় জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি করে যে সরকার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
১৭। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার পার্থক্য: জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকলে বৈধতার সংকট সৃষ্টি হয়। উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যায়।
উপসংহার: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বৈধতার সংকট মূলত রাজনৈতিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল। একটি শক্তিশালী বৈধ রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, দুর্নীতি কমানো, জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলেই রাষ্ট্রের বৈধতা স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।