- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় শাসন বিভাগ আইনসভার মধ্য থেকে গঠিত হলেও তা আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে। প্রশ্নোত্তর, অনাস্থা প্রস্তাব, বাজেট নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় কমিটি ও বিতর্কের মাধ্যমে আইনসভা শাসন বিভাগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করে।
সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় আইনসভা যেভাবে শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে:
১। প্রশ্নোত্তর পর্ব: সংসদ সদস্যরা মন্ত্রীদের কাছে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম, নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন। মন্ত্রীদের এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এর মাধ্যমে সরকারের কাজ জনসমক্ষে আসে এবং শাসন বিভাগ আইনসভার কাছে নিয়মিত ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়।
২। অনাস্থা প্রস্তাব: সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভা অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে পারে। সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারায়, তবে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। এই ক্ষমতা শাসন বিভাগকে আইনসভার প্রতি সর্বদা দায়িত্বশীল থাকতে বাধ্য করে।
৩। আস্থা প্রস্তাব: কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে সরকার সংসদের আস্থা প্রমাণের জন্য আস্থা ভোট চাইতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন না পেলে সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এর ফলে সরকার জানে যে সংসদের সমর্থন ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়।
৪। বাজেট নিয়ন্ত্রণ: সরকারের আয় ও ব্যয়ের বার্ষিক পরিকল্পনা আইনসভার অনুমোদন ছাড়া কার্যকর করা যায় না। সংসদ বাজেট নিয়ে আলোচনা করে এবং প্রয়োজনে বরাদ্দের সমালোচনা বা পরিবর্তনের দাবি জানায়। এতে শাসন বিভাগের আর্থিক কর্মকাণ্ডের ওপর আইনসভার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
৫। কর অনুমোদন: নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান করের পরিবর্তনের জন্য আইনসভার অনুমোদন প্রয়োজন। নির্বাহী বিভাগ এককভাবে জনগণের ওপর আর্থিক বোঝা চাপাতে পারে না। ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব সংগ্রহে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সরকারের আর্থিক ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়।
৬। ব্যয় অনুমোদন: সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ ব্যয় সাধারণত আইনসভার অনুমোদনের ভিত্তিতে হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যয়ের হিসাব সংসদে উপস্থাপন করা হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অপচয় ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে এবং নির্বাহী বিভাগকে সতর্ক থাকতে হয়।
৭। বিল পর্যালোচনা: শাসন বিভাগ কোনো বিল সংসদে উত্থাপন করলে আইনসভা তা আলোচনা ও পরীক্ষা করে। প্রয়োজন হলে সংশোধনী প্রস্তাব আনা বা বিল প্রত্যাখ্যান করা যায়। এর মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ নিজের ইচ্ছামতো আইন প্রণয়ন করতে পারে না এবং সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
৮। সংসদীয় বিতর্ক: সরকারি নীতি, জাতীয় সমস্যা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে আলোচনা ও বিতর্ক হয়। বিরোধী দল ও সাধারণ সদস্যরা সরকারের ভুল ও দুর্বলতা তুলে ধরেন। এসব বিতর্ক সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং সিদ্ধান্ত সংশোধনে বাধ্য করতে পারে।
৯। মুলতবি প্রস্তাব: জরুরি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে সংসদের স্বাভাবিক কাজ স্থগিত রেখে আলোচনা করার জন্য মুলতবি প্রস্তাব আনা যায়। এর মাধ্যমে সরকারের কোনো গুরুতর ব্যর্থতা বা প্রশাসনিক সংকট দ্রুত সংসদের নজরে আসে এবং শাসন বিভাগকে ব্যাখ্যা দিতে হয়।
১০। নিন্দা প্রস্তাব: কোনো মন্ত্রী বা সরকারের নির্দিষ্ট নীতি ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনসভা নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে। এটি রাজনৈতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। নিন্দা প্রস্তাবের আশঙ্কা মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে এবং সংসদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য করে।
১১। সংসদীয় কমিটি: বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তারা নথি পরীক্ষা, কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ এবং অনিয়ম অনুসন্ধান করতে পারে। ফলে সংসদের বাইরে থেকেও নিয়মিতভাবে শাসন বিভাগের ওপর বিস্তারিত ও কার্যকর তদারকি বজায় থাকে।
১২। হিসাব পরীক্ষা: সরকারি ব্যয়ের হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। কোনো অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় বা অপচয় ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এতে আর্থিক জবাবদিহি বাড়ে এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে সতর্কতা সৃষ্টি হয়।
১৩। মন্ত্রীদের দায়: সংসদীয় শাসনে প্রত্যেক মন্ত্রী নিজ বিভাগের কার্যক্রমের জন্য সংসদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকেন। প্রশাসনিক ভুল বা গুরুতর ব্যর্থতার জন্য তাকে ব্যাখ্যা দিতে হয় এবং প্রয়োজনে পদত্যাগও করতে হতে পারে। এতে মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতা ও শাসন বিভাগের জবাবদিহি বৃদ্ধি পায়।
১৪। সম্মিলিত দায়: মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নীতির দায় পুরো মন্ত্রিসভাকে বহন করতে হয়। সংসদের আস্থা হারালে শুধু একজন মন্ত্রী নয়, পুরো মন্ত্রিসভাকেই পদত্যাগ করতে হতে পারে। এটি সংসদীয় নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
১৫। বিরোধী দলের চাপ: বিরোধী দল সরকারের নীতি, দুর্নীতি, ব্যর্থতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা করে। সংসদীয় প্রশ্ন, বিতর্ক ও প্রস্তাবের মাধ্যমে তারা শাসন বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে সরকার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক থাকে।
১৬। তথ্য প্রকাশ: আইনসভা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কাছ থেকে প্রতিবেদন, হিসাব ও তথ্য চাইতে পারে। এসব তথ্যের মাধ্যমে সরকারি কাজের প্রকৃত অবস্থা জানা যায়। তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা শাসন বিভাগের গোপনীয়তা কমায় এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করে।
১৭। জনমতের চাপ: সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের অভিযোগ, দাবি ও অসন্তোষ সংসদে তুলে ধরেন। এসব বিষয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং নীতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলে। তাই আইনসভার মাধ্যমে জনমতও পরোক্ষভাবে শাসন বিভাগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
উপসংহার: সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় আইনসভা প্রশ্নোত্তর, অনাস্থা প্রস্তাব, বাজেট, সংসদীয় কমিটি, বিতর্ক ও জনমতের মাধ্যমে শাসন বিভাগকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ন্ত্রণ সরকারকে জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল রাখে। শক্তিশালী ও সক্রিয় আইনসভাই সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর ও সুশাসনমুখী করতে পারে।