- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সমাজকে শোষণমুক্ত ও সাম্যবাদী করার আকাঙ্ক্ষা থেকে সমাজতন্ত্রের জন্ম। তবে এই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে চিন্তাবিদদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য ছিল। এই পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করেই সমাজতন্ত্র মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে—কাল্পনিক সমাজতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। নিচে এই দুই ধারার একটি সহজ ও আকর্ষণীয় তুলনামূলক আলোচনা করা হলো।
১। পটভূমি ও উৎস: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ, নৈতিকতা এবং সমাজের ধনীক শ্রেণীর শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ার এক কাল্পনিক আশা। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি হলো মানব ইতিহাসের বাস্তব অর্থনৈতিক বিবর্তন এবং বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণ। প্রথমটি গড়ে উঠেছিল নিছক ভাববাদের ওপর ভিত্তি করে, আর দ্বিতীয়টি গড়ে ওঠে সমাজের কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে।
২। প্রধান প্রবক্তা: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের প্রধান চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক ছিলেন সেন্ট সাইমন, রবার্ট ওয়েন এবং চার্লস ফুরিয়ারের মতো মহানুভব ব্যক্তিবর্গ। অপরদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মূল রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা হলেন কার্ল মার্ক্স এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস। প্রথমোক্ত চিন্তাবিদগণ ছিলেন মূলত স্বপ্নদ্রষ্টা, কিন্তু শেষোক্ত দুডন ছিলেন বাস্তববাদী সমাজবিজ্ঞানী ও বিপ্লবের দার্শনিক।
৩। শ্রেণি সংগ্রাম: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা সমাজে বিদ্যমান শ্রেণি সংগ্রামের তীব্রতা ও এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে শ্রেণি সংগ্রামকে ইতিহাসের চালিকাশক্তি এবং সমাজ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্ক্সের মতে, আদিম সাম্যবাদ ছাড়া আজ পর্যন্ত মানবসমাজের ইতিহাস হলো মূলত শ্রেণির লড়াইয়ের ইতিহাস।
৪। পরিবর্তনের উপায়: কাল্পনিক সমাজতন্ত্র সমাজ পরিবর্তনের জন্য ধনী ও শাসক শ্রেণির হৃদয় পরিবর্তন, আবেদন এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ের ওপর ভরসা করত। বিপরীতপক্ষে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে যে, বিপ্লব ও সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান ছাড়া পুঁজিপতিদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া অসম্ভব। শোষকদের দয়া বা করুণার মাধ্যমে কখনো সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
৫। শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা: কাল্পনিক ধারার চিন্তাবিদগণ শ্রমিক শ্রেণীকে কেবল একটি মজলুম বা অত্যাচারিত গোষ্ঠী হিসেবে দেখতেন, যাদের প্রতি কেবল সহানুভূতি দেখানো যায়। তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র শ্রমিক শ্রেণিকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রগতিশীল এবং বিপ্লবী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। মার্ক্সীয় দর্শনে শ্রমিকদেরই নতুন সমাজ গড়ার প্রধান চালিকাশক্তি ও মূল কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৬। বাস্তবায়ন যোগ্যতা: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বগুলো ছিল মূলত অবাস্তব, আকাশকুসুম কল্পনা এবং এক ধরনের অসম্ভব রূপকথার মতো যা বাস্তবে রূপ দেওয়া অসম্ভব ছিল। এর বিপরীতে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বগুলো সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত, বৈজ্ঞানিক যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রয়োগযোগ্য। এই তত্ত্ব কেবল স্বপ্ন দেখায় না, বরং স্বপ্ন পূরণের নিখুঁত পথ দেখায়।
৭। পুঁজিবাদের বিশ্লেষণ: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা পুঁজিবাদের অন্যায়-অত্যাচার এবং কুফলগুলোর তীব্র সমালোচনা করলেও এর অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি বা চরিত্র বিশ্লেষণ করতে পারেননি। তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব এবং শোষণের বৈজ্ঞানিক অর্থনৈতিক মেকানিজম চমৎকারভাবে উন্মোচন করেছে। পুঁজিবাদ কেন এবং কীভাবে শ্রমিককে শোষণ করে, তা এখানে গাণিতিকভাবে দেখানো হয়েছে।
৮। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকার এবং এই বিষয়ে তাঁদের কোনো স্পষ্ট ধারণা বা তত্ত্ব ছিল না। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো ইতিহাসের এই বস্তুবাদী ব্যাখ্যা যা সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে প্রাধান্য দেয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলেই রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটে।
৯। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ: রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপ কেমন হবে সে সম্পর্কে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীদের চিন্তাভাবনা ছিল অত্যন্ত অস্পষ্ট, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাহীন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর একপর্যায়ে রাষ্ট্র নামক শোষণের যন্ত্রটি নিজে থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তখন সমাজে কোনো শাসক বা শাসিত শ্রেণি থাকবে না।
১০। সমাজ কাঠামো: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা ছোট ছোট আদর্শ সম্প্রদায় বা সমবায় গড়ার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের এক খণ্ডিত ও ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কিন্তু কোনো আংশিক সংস্কার নয়, বরং গোটা সমাজ ব্যবস্থার আমূল ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা দৃঢ়ভাবে প্রচার করে। এটি পুরো পৃথিবীর পুঁজিবাদী কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে এক নতুন সমাজ গড়তে চায়।
১১। অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: কাল্পনিক ধারার অর্থনীতি ছিল মূলত নৈতিকতা, দয়া, পরোপকার এবং মানুষের শুভবুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল এক দুর্বল অর্থনৈতিক চিন্তা। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে উৎপাদন শক্তির বিকাশ এবং উৎপাদন সম্পর্কের বাস্তব দ্বন্দ্বের ওপর ভিত্তি করে। এখানে অর্থনীতির চালিকাশক্তি কোনো আবেগ নয়, বরং বস্তুগত উৎপাদন ও শ্রমের সঠিক বণ্টন ব্যবস্থা।
১২। দর্শনের ভিত্তি: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের দর্শনে ভাববাদ, পরার্থপরতা এবং কাল্পনিক ইউটোপিয়ার এক প্রবল ও স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এর বিপরীতে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র হেগেলের দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব এবং ফয়ারবাখের বস্তুবাদকে সমন্বয় করে ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ নামক শক্তিশালী দর্শন সৃষ্টি করেছে। এই দর্শন জগতকে কেবল ব্যাখ্যা করে না, বরং জগতকে পরিবর্তন করার পথ দেখায়।
১৩। বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রে সামাজিক রূপান্তরের জন্য কোনো ধরনের রক্তাক্ত ক্রান্তি বা রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করা হয়নি। তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র মনে করে, পুরাতন সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে হলে সর্বহারা শ্রেণির বৈপ্লবিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় তাদের ক্ষমতা এবং সম্পদ ছেড়ে দেয় না।
১৪। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীরা মূলত স্থানীয় বা আঞ্চলিক স্তরে কিছু ছোটখাটো সংস্কারমূলক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। অপরদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক ও বিশ্বজনীন, যা সারা বিশ্বের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয়। “দুনিয়ার মজদুর, এক হও”—এই স্লোগানই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিশ্বজনীন রূপকে প্রকাশ করে।
১৫। শোষণ মুক্তি: কাল্পনিক ধারায় শোষণ মুক্তির উপায় হিসেবে মানুষের বিবেক জাগ্রত করা এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান এবং উৎপাদনের উপায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠাকেই শোষণ মুক্তির একমাত্র পথ বলা হয়েছে। উৎপাদন যন্ত্রের ওপর সমাজের অধিকার থাকলেই কেবল শোষণ বন্ধ হবে।
১৬। ব্যর্থতার কারণ: কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীদের আন্দোলনগুলো বাস্তব ভিত্তি না থাকায় এবং বৈজ্ঞানিক কর্মপদ্ধতির অভাবে খুব দ্রুতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কালজয়ী তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল এবং বিশ্বের বড় বড় বিপ্লবকে সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিল। এর ফলেই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সফল বলশেভিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়া সম্ভব হয়েছিল।
১৭। ঐতিহাসিক গুরুত্ব: মানব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের গুরুত্ব ছিল সাময়িক এবং এটি কেবল সমাজতান্ত্রিক ভাবনার প্রাথমিক সূচনা ঘটিয়েছিল। তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানব সভ্যতার ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছে এবং আজও তা সমান প্রাসঙ্গিক। এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির মূল ইশতেহার হিসেবে গণ্য হয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, কাল্পনিক সমাজতন্ত্র যদি হয় একটি সুন্দর ও সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন, তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র হলো সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অমোঘ হাতিয়ার। প্রথমটি মানবজাতিকে শোষণের বিরুদ্ধে কেবল আবেগী করে তুলেছিল, কিন্তু দ্বিতীয়টি শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার বাস্তব জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক কৌশল শিখিয়েছে। তাই সমাজ প্রগতির ইতিহাসে কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের অবদানকে শ্রদ্ধা জানিয়েও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকেই মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে গণ্য করা হয়।