- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসে গণচীনকে একটি শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার নেপথ্য নায়ক ছিলেন মাও সেতুং। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং অনন্য রাজনৈতিক দর্শন শোষিত চীনা জনগণকে মুক্ত করেছিল। প্রচলিত মার্ক্সবাদকে চীনের নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতির উপযোগী করে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
১। কৃষকভিত্তিক বিপ্লব: প্রচলিত মার্ক্সীয় তত্ত্বে শিল্প কারখানার শ্রমিকদের বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু মাও সেতুং চীনের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করে শ্রমিকদের পরিবর্তে শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকদের বিপ্লবের প্রধান শক্তি হিসেবে সংগঠিত করেন। তিনি গ্রামীণ জনপদকে কেন্দ্র করে বিশাল কৃষক বাহিনীকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল ধারায় নিয়ে আসেন, যা চীনা বিপ্লবকে সফল করে তোলে।
২। দীর্ঘ অভিযান পরিচালনা: ১৯৩৪ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ‘লং মার্চ’ বা দীর্ঘ অভিযান শুরু হয়। প্রায় ছয় হাজার মাইলের এই দুঃসাহসিক যাত্রার মাধ্যমে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করেন। এই অভিযানের ফলে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাথে কমিউনিস্টদের গভীর সংযোগ তৈরি হয়। এটি দলের ভেতরে তাঁর একক নেতৃত্ব এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শকে চূড়ান্তভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল।
৩। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা: দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং জাপানি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের পর ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর মাও সেতুং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে চীনের বুকে দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে চীনের আত্মপ্রকাশ বিশ্ব রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন যুগের সূচনা করে।
৪। নতুন গণতন্ত্রের ধারণা: সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ধাপে মাও সেতুং ‘নয়া গণতন্ত্র’ বা নতুন গণতন্ত্রের রাজনৈতিক তত্ত্ব পেশ করেন। এই তত্ত্বে তিনি কেবল শ্রমিক-কৃষক নয়, বরং পেটি-বুর্জোয়া এবং জাতীয় পুঁজিবাদের সমর্থকদেরও সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনে শামিল করেন। এটি ছিল চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা দ্রুত সমাজতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে সাহায্য করেছিল।
৫। ভূমি সংস্কার কর্মসূচি: মাও সেতুং ক্ষমতায় এসেই চীনের হাজার বছরের পুরনো বৈষম্যমূলক সামন্ততান্ত্রিক ভূমি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেন। তিনি জমিদারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত জমি বাজেয়াপ্ত করে তা কোটি কোটি ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সমাজতান্ত্রিক সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও আনুগত্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
৬। মহালাফ নীতি গ্রহণ: ১৯৫৮ সালে চীনের অর্থনৈতিক ও শিল্প খাতকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মাও সেতুং ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ বা মহালাফ নীতি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে চীনকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। এর অধীনে যৌথ খামার বা কমিউন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং গ্রামীণ পর্যায়ে কুটির ও ভারী শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয়।
৭। সাংস্কৃতিক বিপ্লব সূচনা: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে যেন নতুন কোনো বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদের জন্ম না হয়, সেজন্য মাও ১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দেন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি পুরনো চিন্তাধারা, সংস্কৃতি এবং অভ্যাসকে বদলে সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। যুবসমাজ ও রেড গার্ডদের অংশগ্রহণে এই বিপ্লব চীনের সমাজ ও রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
৮। মাওবাদের তাত্ত্বিক বিকাশ: কার্ল মার্ক্স এবং ভ্লাদিমির লেলিনের সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শকে মাও সেতুং চীনের নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার আলোড়নে রূপান্তর করেন। তাঁর এই রূপান্তরিত রাজনৈতিক দর্শনই বিশ্বজুড়ে ‘মাওবাদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। অনুন্নত ও কৃষিপ্রধান এশীয় দেশগুলোতে কীভাবে সমাজতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব, মাওবাদ তার একটি সফল ও কার্যকর তাত্ত্বিক রূপরেখা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছিল।
৯। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা: মাও সেতুং বিশ্বাস করতেন যে নারীরা হলো অর্ধেক আকাশ, তাই তাদের বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্রের বিকাশ অসম্ভব। তিনি চীনের সমাজ থেকে বহুবিবাহ, বাল্যবিয়ে এবং নারীদের জোরপূর্বক বাঁদীতে পরিণত করার কুপ্রথা আইন করে বন্ধ করেন। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমানাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি চীনের সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলেন।
১০। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম: পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের আগ্রাসন থেকে চীনকে রক্ষা করতে মাও সেতুং আজীবন আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। তিনি বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর এই বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী আন্তর্জাতিক নীতি এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য পরাধীন দেশের মুক্তিকামী মানুষকে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করেছিল।
১১। গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি: সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে মাও সেতুং এক অনন্য ও নতুন ধারার গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। শক্তিশালী শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে কীভাবে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়, তিনি তা দেখিয়েছেন। তাঁর এই সামরিক কৌশল ও রণনীতি বিশ্বজুড়ে শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের বিপ্লবী সশস্ত্র সংগ্রামের একটি প্রধান মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১২। গণলাইন নীতি প্রয়োগ: মাও সেতুংয়ের অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক কৌশল ছিল ‘ম্যাস লাইন’ বা জনগণের লাইন নীতি বাস্তবায়ন করা। এই নীতির মূল কথা ছিল জনগণের কাছ থেকে ধারণা নেওয়া এবং তা পুনরায় জনগণের কল্যাণে প্রয়োগ করা। এর ফলে কমিউনিস্ট পার্টির নীতি নির্ধারণের সাথে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়, যা সমাজতান্ত্রিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
১৩। যৌথ খামার প্রতিষ্ঠা: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ বৈষম্য দূর করতে মাও সেতুং সমগ্র চীনে সমবায় ও যৌথ খামার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ও সমবায় মালিকানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটানো হয়। এই ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের মধ্যে যৌথভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে ওঠে এবং কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ হয়।
১৪। শিল্পের জাতীয়করণ নীতি: চীনের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে মাও সেতুং দেশের সমস্ত ব্যাংক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বৃহৎ শিল্পকারখানা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। বিদেশী পুঁজির আধিপত্য খর্ব করে তিনি দেশীয় সম্পদের ওপর জনগণের যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই জাতীয়করণের ফলে চীন অত্যন্ত দ্রুত একটি স্বনির্ভর ও শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
১৫। গণশিক্ষা ও স্বাস্থ্য: সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে টেকসই করতে মাও সেতুং দেশজুড়ে ব্যাপক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি হাতে নেন। তিনি ‘খালি পায়ের ডাক্তার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছিলেন। একই সাথে গণসাক্ষরতা অভিযানের মাধ্যমে কোটি কোটি নিরক্ষর মানুষকে শিক্ষিত করে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে উপযোগী করে তোলেন।
১৬। জাতীয় সংহতি রক্ষা: মাও সেতুংয়ের অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত বিশাল চীনকে একটি একক রাজনৈতিক আদর্শের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে তিনি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনেন। তাঁর শক্তিশালী নেতৃত্ব ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ফলেই চীনের মূল ভূখণ্ডে একটি অখণ্ড, শক্তিশালী এবং সুসংহত রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
১৭। স্বনির্ভর অর্থনীতি গঠন: বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার জন্য মাও সেতুং স্বনির্ভর অর্থনীতির ওপর জোর দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। তাঁর এই নীতির কারণে চীন কঠিন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজস্ব সম্পদ ও জনশক্তি ব্যবহার করে পারমাণবিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মাও সেতুং কেবল চীনের একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আধুনিক চীনের রূপকার। নানাবিধ সমালোচনা ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও, চীনের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাঁর নীতি ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই আজকের চীন বিশ্বমঞ্চে একটি পরাশক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তাই সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে মাও সেতুংয়ের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।