- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে একসময় সামরিক অভ্যুত্থান ছিল নিয়মিত ঘটনা। পরবর্তীকালে গণতন্ত্রের বিস্তার, সাংবিধানিক শাসন, আন্তর্জাতিক চাপ ও জনগণের সচেতনতার কারণে এর প্রবণতা সামগ্রিকভাবে কমেছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখায় যে এই হ্রাস সর্বত্র সমান নয়।
১। গণতন্ত্রের বিস্তার: তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে বহুদলীয় নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থা বিস্তৃত হয়েছে। জনগণ এখন ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ বেশি পায়। ফলে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের বৈধ ও শান্তিপূর্ণ পথ তৈরি হওয়ায় সামরিক বাহিনীর সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কমেছে।
২। সাংবিধানিক শাসন: সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি অনেক দেশে শক্তিশালী হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরিবর্তে সাংবিধানিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে সামরিক অভ্যুত্থানকে বৈধ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে।
৩। বেসামরিক কর্তৃত্ব: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীকে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীন রাখার নীতি শক্তিশালী হয়েছে। প্রতিরক্ষা নীতি, বাজেট ও সামরিক প্রশাসনের ওপর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সামরিক বাহিনীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভূমিকা সীমিত হয়েছে এবং ক্ষমতা দখলের সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে।
৪। সামরিক পেশাদারিত্ব: আধুনিক সামরিক বাহিনীতে পেশাগত দক্ষতা, প্রতিরক্ষা দায়িত্ব ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। সামরিক কর্মকর্তাদের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা—এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমে এবং বেসামরিক শাসনের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি পায়।
৫। জনসচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষা, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিস্তারের ফলে জনগণ নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সচেতন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ও নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখন বেশি। ফলে সামরিক বাহিনীর পক্ষে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
৬। আন্তর্জাতিক চাপ: সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরূপ অবস্থান সামরিক হস্তক্ষেপ নিরুৎসাহিত করেছে। সামরিক শাসনের পর কূটনৈতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা বা সহায়তা স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ক্ষমতা দখলের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেড়েছে।
৭। আঞ্চলিক সংগঠন: আফ্রিকান ইউনিয়ন, ইকোওয়াসসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। কোনো দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হলে সদস্যপদ স্থগিত, কূটনৈতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। ফলে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক প্রতিরোধের কাঠামো শক্তিশালী হয়েছে।
৮। অর্থনৈতিক নির্ভরতা: বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সামরিক শাসন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করলে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখে।
৯। গণমাধ্যমের ভূমিকা: স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা দ্রুত দেশ-বিদেশে প্রচার করে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বা রাজনৈতিক দমন গোপন রাখা এখন অনেক কঠিন। ফলে সামরিক শাসকরা দ্রুত জনমত ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে, যা হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ায়।
১০। নাগরিক সমাজ: মানবাধিকার সংগঠন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান, ছাত্রসমাজ ও অন্যান্য নাগরিক সংগঠন গণতান্ত্রিক শাসন রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এসব সংগঠন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে। শক্তিশালী নাগরিক সমাজ তাই অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক।
১১। বিচার বিভাগের ভূমিকা: অনেক দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক পর্যালোচনার গুরুত্ব বেড়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আদালতের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে সামরিক শক্তি ব্যবহার না করেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা সম্ভব হচ্ছে এবং সাংবিধানিক শাসনের ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে।
১২। তিক্ত অভিজ্ঞতা: বহু তৃতীয় বিশ্বের দেশে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা ছিল রাজনৈতিক দমন, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিপূর্ণ। ফলে জনগণ ও রাজনৈতিক সমাজের একটি বড় অংশ সামরিক শাসনকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখতে আগ্রহী নয়। অতীতের ব্যর্থ অভিজ্ঞতাও হস্তক্ষেপ নিরুৎসাহিত করেছে।
১৩। বৈধতার সংকট: সামরিক সরকার সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলে শুরু থেকেই বৈধতার সমস্যায় পড়ে। ক্ষমতা ধরে রাখতে তাকে নির্বাচন, গণসমর্থন বা অন্য কোনো বৈধতার ভিত্তি খুঁজতে হয়। আধুনিক যুগে নির্বাচনী বৈধতার গুরুত্ব বৃদ্ধির ফলে সরাসরি সামরিক শাসন পরিচালনা আরও কঠিন হয়েছে।
১৪। ক্ষমতা হস্তান্তর: অনেক উন্নয়নশীল দেশে নিয়মিত নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের নজির বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে বদলানো সম্ভব হলে সামরিক হস্তক্ষেপের যুক্তি দুর্বল হয়। নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের অভ্যাস যত শক্তিশালী হয়, সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকার ক্ষেত্র তত সংকুচিত হয়।
১৫। বিশ্বায়নের প্রভাব: বিশ্বায়ন বিভিন্ন রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সামরিক শাসন দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিদেশি সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকতে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো সাংবিধানিক ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার বজায় রাখতে অধিক আগ্রহী হয়েছে।
১৬। সাম্প্রতিক ব্যতিক্রম: সামগ্রিক দীর্ঘমেয়াদি হ্রাস সত্ত্বেও সামরিক হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ২০২০ সালের পর আফ্রিকার একাধিক দেশে সামরিক ক্ষমতা দখল সাম্প্রতিক পুনরুত্থানের উদাহরণ। ২০২৬ সালেও আফ্রিকায় সামরিক শাসনের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা।
১৭। সামগ্রিক মূল্যায়ন: অতীতের তুলনায় বহু উন্নয়নশীল দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন কম গ্রহণযোগ্য হলেও “উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস” কথাটি সব অঞ্চল ও সব সময়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। সাম্প্রতিক আফ্রিকান অভ্যুত্থানগুলো দেখায়, দুর্বল গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা সংকট থাকলে সামরিক হস্তক্ষেপ আবারও মাথাচাড়া দিতে পারে।
উপসংহার: তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা কমার পেছনে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন, আন্তর্জাতিক চাপ, বেসামরিক কর্তৃত্ব ও জনসচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানগুলো প্রমাণ করে এ প্রবণতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। তাই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করাই সামরিক হস্তক্ষেপ স্থায়ীভাবে রোধের প্রধান উপায়।