- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরাসরি সামরিক শাসনের অবসান ঘটলেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো দমে যায়নি। তারা দুর্বল ও সদ্য স্বাধীন দেশগুলোকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মায়াজালে বন্দি করার নতুন কৌশল বেছে নিয়েছে। এই পরোক্ষ ও ছদ্মবেশী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাই হলো নব্য উপনিবেশবাদ, যা মূলত পুরনো সাম্রাজ্যবাদেরই একটি আধুনিক ও মারাত্মক রূপ।
১। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: নব্য উপনিবেশবাদের মূল ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক পরাধীনতা। উন্নত দেশগুলো সরাসরি শাসন না করলেও অনুন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য, সম্পদ ও বাজার নিজেদের কব্জায় রাখে। তারা এমনভাবে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে যেন দরিদ্র দেশগুলো সবসময় তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। এর ফলে স্বাধীনতার পরও এসব দেশ অর্থনৈতিক মুক্তি পায় না। মূলত, পুঁজির খেলায় মেতে উঠে তারা তৃতীয় বিশ্বের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়।
২। ঋণের ফাঁদ: সাম্রাজ্যবাদের নতুন রূপের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ঋণের জাল বিস্তার করা। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে বড় বড় ঋণের লোভ দেখায়। পরবর্তীতে এই ঋণের শর্ত হিসেবে এমন সব নীতি চাপিয়ে দেওয়া হয় যা ওই দেশের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে। উচ্চ সুদের হার এবং কঠিন শর্তের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো আজীবন ঋণের জালে আটকে থাকে। এভাবে সুকৌশলে তারা একটি দেশের নীতি নির্ধারণের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়।
৩। বহুজাতিক সংস্থা: বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নব্য উপনিবেশবাদ বিস্তারে সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে। এই বিশাল প্রতিষ্ঠানগুলো অনুন্নত দেশগুলোর সস্তা শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা লুটে নেয়। স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংস করে তারা নিজেদের একচেটিয়া বাজার গড়ে তোলে। দেশের আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করে তারা নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। ফলে দেশের টাকা বাইরে চলে যায় এবং স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৪। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: প্রত্যক্ষ শাসন না থাকলেও নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো অনুন্নত দেশের রাজনীতিকে আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের স্বার্থের অনুকূল সরকার গঠনে তারা পর্দার আড়ালে বড় ভূমিকা পালন করে। কোনো দেশের সরকার তাদের কথামতো না চললে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা হয়। এমনকি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করতেও তারা দ্বিধা করে না। এভাবে সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে।
৫। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: সংস্কৃতির মাধ্যমে মগজ ধোলাই করা নব্য উপনিবেশবাদের একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মারাত্মক কৌশল। পশ্চিমা পোশাক, ভাষা, খাবার এবং জীবনধারাকে উন্নত ও আধুনিক হিসেবে প্রচার করা হয়। এর ফলে অনুন্নত দেশের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি অন্ধভাবে আকৃষ্ট হয়। গণমাধ্যম, সিনেমা ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই সাংস্কৃতিক গোলামি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিজস্ব জাতীয়তাবোধ ধ্বংস করে দাসত্ব মানসিকতা তৈরি করাই এর মূল লক্ষ্য।
৬। প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা: আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি যার, ক্ষমতা তার—এই নীতিতে বিশ্বাস করে নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা। অনুন্নত দেশগুলোকে তারা সবসময় উন্নত প্রযুক্তির জন্য নিজেদের মুখাপেক্ষী করে রাখে। উচ্চ মূল্যে প্রযুক্তি আমদানি করতে গিয়ে দরিদ্র দেশগুলোর বিপুল অর্থ বিদেশে চলে যায়। কোনো দেশ যেন স্বাবলম্বী প্রযুক্তি গড়ে তুলতে না পারে, সেজন্য তারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে প্রযুক্তির এই দাসত্ব নব্য উপনিবেশবাদকে আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করে তোলে।
৭। প্রাকৃতিক সম্পদ লুট: অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর তেল, গ্যাস, খনিজ ও বনজ সম্পদের ওপর উন্নত দেশগুলোর লোভ চিরন্তন। নব্য উপনিবেশবাদী কৌশলে তারা বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে এসব মূল্যবান সম্পদ নামমাত্র মূল্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। স্থানীয় জনগণকে বঞ্চিত করে তারা এই প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের শিল্পায়নে ব্যবহার করে। সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্র দেশগুলো চরম অভাব ও দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হয়। এটি পুরনো শোষণেরই একটি আধুনিক সংস্করণ।
৮। সামরিক সাহায্য: সামরিক সহায়তার আড়ালে নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম করে। তারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণের আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে। অনেক সময় নিরাপত্তার অজুহাতে দুর্বল দেশগুলোতে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। এই সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে তারা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলস্বরূপ, সাহায্য গ্রহণকারী দেশটি সবসময় এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপে থাকে।
৯। পুঁজি বিনিয়োগ: উন্নত দেশগুলো অনুন্নত দেশে পুঁজি বিনিয়োগের নামে মূলত শোষণের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে। তারা এমন সব খাতে বিনিয়োগ করে যেখান থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে নেওয়া সম্ভব। এই বিনিয়োগের সিংহভাগ লাভই চলে যায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পকেটে। স্থানীয় জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে এই পুঁজি খুব সামান্যই ভূমিকা পালন করে। বরং এই পুঁজির জোরে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়ে যায়।
১০। কৃত্রিম সংকট: নব্য উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে অনুন্নত দেশগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে ওস্তাদ। তারা খাদ্য, জ্বালানি বা মুদ্রাস্ফীতির মতো সমস্যাগুলোmanipulate বা নিয়ন্ত্রণ করে ফায়দা লোটে। বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া তাদের একটি সাধারণ কৌশল। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয় এবং সরকার বিদেশী সাহায্যের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। এই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের নতুন নতুন শর্ত ও দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে।
১১। মেধা পাচার: নব্য উপনিবেশবাদের কারণে অনুন্নত দেশগুলো থেকে প্রতিনিয়ত মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেন’ হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, ডাক্তার ও প্রকৌশলীদের উন্নত জীবনযাত্রার লোভ দেখিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। এর ফলে দরিদ্র দেশগুলো তাদের যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষ জনশক্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষার পেছনে দরিদ্র দেশের অর্থ ব্যয় হলেও এর চূড়ান্ত সুবিধা ভোগ করছে উন্নত বিশ্ব। এই মেধা পাচার অনুন্নত দেশগুলোকে চিরকাল পিছিয়ে রাখার একটি নীরব অস্ত্র।
১২। বাণিজ্যিক বৈষম্য: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রায় সব নিয়মকানুন উন্নত দেশগুলোর সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে। তারা অনুন্নত দেশ থেকে কাঁচামাল খুব কম দামে কেনে এবং নিজেদের উৎপাদিত পণ্য চড়া দামে বিক্রি করে। বিভিন্ন শুল্ক ও কোটার বেড়াজাল তৈরি করে তারা দরিদ্র দেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেয়। এই অসম ও বৈষম্যমূলক বাণিজ্য নীতির কারণে ধনী দেশগুলো আরও ধনী হচ্ছে। আর দরিদ্র দেশগুলো রক্তক্ষরণের মতো নিজেদের সম্পদ হারিয়ে আরও কঙ্গাল হয়ে পড়ছে।
১৩। puppet সরকার: নব্য সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অনুন্নত দেশগুলোতে পুতুল বা মেরুদণ্ডহীন সরকার বসানো। এই সরকারগুলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নয়, বরং বিদেশী প্রভুদের আশীর্বাদে ক্ষমতায় টিকে থাকে। ফলে তারা দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা না করে বিদেশী শক্তির স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত থাকে। জাতীয় সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে এই পুতুল শাসকরা বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। এর ফলে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কাগজের দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
১৪। আন্তর্জাতিক চাপ: জাতিসংঘ বা মানবাধিকার সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। দুর্বল দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা বা চাপ প্রয়োগ করতে এই সংস্থাগুলোকে হাতিয়ার বানানো হয়। কোনো দেশ তাদের কথামতো না চললে গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের দোহাই দিয়ে একঘরে করে দেওয়া হয়। এই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে অনেক স্বাধীন দেশও নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এটি বিশ্বরাজনীতিতে এক ধরণের আধুনিক মোড়লগিরি ছাড়া আর কিছুই নয়।
১৫। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: নব্য উপনিবেশবাদের একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও কার্যকর অস্ত্র হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা। কোনো দেশ তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরোধিতা করলে তার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ওই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং লেনদেন এবং আমদানি-রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ চরম খাদ্য ও ওষুধ সংকটে পড়ে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করে। এই অমানবিক কৌশলের মাধ্যমে তারা যেকোনো স্বাধীন দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।
১৬। এনজিওর ভূমিকা: আপাতদৃষ্টিতে সমাজসেবামূলক মনে হলেও অনেক আন্তর্জাতিক এনজিও নব্য উপনিবেশবাদের গোপন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। তারা অনুন্নত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঢুকে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটায়। সরকারের সমান্তরাল একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলে তারা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করার চেষ্টা করে। অনেক সময় বিদেশী ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে তারা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পেছনে ইন্ধন জোগায়। সমাজসেবার মোড়কে এটি মূলত একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা।
১৭। আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব: নব্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের অস্ত্র ব্যবসা ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে কৃত্রিম সীমানা বিরোধ বা জাতিগত দাঙ্গা তৈরিতে উসকানি দেয়। এক পক্ষকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া তাদের পুরনো অভ্যাস। এই দ্বন্দ্বের কারণে দেশগুলো নিজেদের বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের উন্নয়ন থমকে যায় এবং তারা চিরকাল বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, নব্য উপনিবেশবাদ হলো আধুনিক মোড়কে পুরনো শোষণেরই একটি বিষাক্ত রূপ। বন্দুক বা কামানের ব্যবহার না করে কেবল অর্থনৈতিক ও নীতিগত ফাঁদে ফেলে আজ পুরো বিশ্বকে শাসন করা হচ্ছে। ভৌগোলিক মানচিত্র স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তৃতীয় বিশ্ব আজ নব্য সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খলে বন্দি। তাই এই অদৃশ্য দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে হলে অনুন্নত দেশগুলোকে আত্মনির্ভরশীলতা ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের পথ বেছে নিতে হবে।