- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ফরাসি দার্শনিক সিমন দ্য বেভোয়ার মূলত তাঁর অস্তিত্ববাদী নারীবাদের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত হলেও, তাঁর চিন্তাভাবনার একটি বিশাল অংশ জুড়ে ছিল রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার সমালোচনা। তিনি রাষ্ট্রকে কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছেন লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও শোষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসেবে।
১। ব্যক্তি স্বাধীনতা: বেভোয়ারের রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি হলো মানুষের চরম ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাষ্ট্র বা সমাজের কোনো অধিকার নেই একজন মানুষের সহজাত স্বাধীনতাকে খর্ব করার। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের চিন্তার ও কর্মের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে, তবে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নৈতিক যোগ্যতা হারায়। প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার থাকতে হবে।
২। অস্তিত্ববাদ ও রাষ্ট্র: তিনি মানব অস্তিত্বকে রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষ প্রথমে জন্মগ্রহণ করে এবং তারপর নিজের কর্মের মাধ্যমে নিজের পরিচয় তৈরি করে। রাষ্ট্র কোনো তৈরি নিয়ম মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের এই আত্ম-বিকাশের পথকে সহজ ও মসৃণ করা।
৩। নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি: বেভোয়ার রাষ্ট্রকে একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অত্যন্ত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে রাষ্ট্র তার আইন ও কাঠামোর মাধ্যমে নারীদের সবসময় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’-এ তিনি রাষ্ট্রের এই বৈষম্যমূলক চরিত্রকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া রাষ্ট্রের মুক্তি অসম্ভব।
৪। লিঙ্গ বৈষম্য: রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনগুলো যে পুরুষদের স্বার্থে তৈরি, তা তিনি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে রাজনীতি—সবখানেই নারীদের পিছিয়ে রাখার একটি রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা থাকে। বেভোয়ার এই কৃত্রিম লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের দাবি জানান। রাষ্ট্রকে অবশ্যই লিঙ্গ নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে।
৫। শোষণমুক্ত সমাজ: তিনি এমন এক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক শোষণ থাকবে না। পুঁজিবাদের চরম সমালোচনা করে তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা মানুষকে আরও বেশি পরাধীন করে তোলে। রাষ্ট্র যদি কেবল ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করে, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য একটি কারাগার সমতুল্য। শোষণহীন সমাজই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য।
৬। অধিকারের সমতা: নারী ও পুরুষের মধ্যে আইনি এবং সামাজিক অধিকারের পূর্ণ সমতা প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বেভোয়ার মনে করতেন, কাগজে-কলমে সমতা দেখালেই রাষ্ট্র তার দায়িত্ব থেকে পার পেয়ে যায় না। বাস্তব জীবনে নারীরা যেন সেই অধিকার ভোগ করতে পারে, রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সমতাই হলো একটি আদর্শ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
৭। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো: প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পূর্ণ কাঠামোটিই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলে তিনি মনে করতেন। ক্ষমতার শীর্ষস্থান থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ—সবখানেই পুরুষদের আধিপত্য বজায় থাকে। এই কাঠামো ভেঙে না ফেললে রাষ্ট্রের পক্ষে প্রকৃত কল্যাণকামী হওয়া কখনই সম্ভব নয়। তিনি এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন।
৮। সামাজিক সংস্কার: কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ভেতরে ব্যাপক সামাজিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। সমাজ থেকে কুসংস্কার ও প্রাচীনপন্থী চিন্তাধারা দূর করতে রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন আনা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। সংস্কারহীন রাষ্ট্র সমাজকে পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
৯। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে বেভোয়ার রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকে বলেই তাদের পরাধীনতা বাড়ে। রাষ্ট্রকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যাতে নারীরা স্বাধীনভাবে উপার্জন করতে পারে। অর্থনৈতিক মুক্তিই নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির মূল চাবি।
১০। শ্রেণী সংগ্রাম: তিনি মার্ক্সবাদের দ্বারা আংশিক প্রভাবিত হয়ে রাষ্ট্রের শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তা রাষ্ট্রকে আরও বেশি অত্যাচারী করে তোলে। শোষিত শ্রেণীর অধিকার আদায়ের লড়াইকে তিনি রাষ্ট্রের ভেতরের একটি বড় চালিকাশক্তি মনে করতেন। রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই শ্রেণী বৈষম্য দূর করতে হবে।
১১। ক্ষমতার অপব্যবহার: রাষ্ট্র যখন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নাগরিকদের ওপর অত্যাচার শুরু করে, বেভোয়ার তার তীব্র বিরোধিতা করেন। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচনা করেছেন। রাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য নাগরিকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই এর একমাত্র সমাধান।
১২। নাগরিক সচেতনতা: একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনে নাগরিকদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। মানুষ যদি রাষ্ট্রের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে, তবে রাষ্ট্র স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। বেভোয়ার মনে করতেন, প্রতিটি নাগরিকের উচিত নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং রাষ্ট্রের ভুল নীতির বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করা।
১৩। স্বাধীন ইচ্ছা: মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে বা ‘ফ্রি উইল’-কে রাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই বন্দি না করে। রাষ্ট্র অনেক সময় আইন বা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে মানুষের স্বাধীন চিন্তার পথ বন্ধ করে দেয়। বেভোয়ার এই ধরনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। মানুষের চিন্তার জগৎ যত স্বাধীন হবে, রাষ্ট্র ততই উন্নত ও প্রগতিশীল হবে।
১৪। বিপ্লবী পরিবর্তন: সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনে তিনি প্রগতিশীল আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। যদি কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শান্তিতে সব সময় পরিবর্তন আসে না, মাঝে মাঝে লড়াই করতে হয়। অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন অত্যন্ত যৌক্তিক।
১৫। মানবতাবাদী রাষ্ট্র: বেভোয়ারের রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো একটি পূর্ণাঙ্গ মানবতাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে মানুষের পরিচয় ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ দিয়ে হবে না, বরং মানুষ হিসেবে হবে। রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা যেন প্রতিটি মানুষ সমানভাবে পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। মানবতাই হবে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি ও প্রধান নীতি।
১৬। বিয়ে ও পরিবার: প্রচলিত বিবাহ ব্যবস্থা এবং পারিবারিক কাঠামোকে রাষ্ট্র যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, তিনি তার সমালোচনা করেছেন। রাষ্ট্র পরিবারকে একটি রাজনৈতিক একক হিসেবে ব্যবহার করে পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখে বলে তিনি মনে করতেন। নারীদের ঘরের বাইরে এনে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পারিবারিক দাসত্ব থেকে নারীর মুক্তি প্রয়োজন।
১৭। শিক্ষা ব্যবস্থা: রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে কুসংস্কারমুক্ত, আধুনিক এবং সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে রাষ্ট্রের অনুগত দাস বানাতে চায় বলে তিনি মনে করতেন। শিক্ষা এমন হতে হবে যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করবে এবং প্রশ্ন করতে শেখাবে। নারী-পুরুষের সমান শিক্ষার সুযোগ রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
শেষকথা: সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, সিমন দ্য বেভোয়ারের রাষ্ট্রদর্শন প্রচলিত ধারার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং প্রগতিশীল। তিনি রাষ্ট্রকে পুরুষতান্ত্রিক শোষণের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করে এর আমূল পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। তাঁর দর্শন আমাদের শেখায় কিভাবে একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নারীর অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই চিন্তাধারা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ী।