- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মাও সে তুংয়ের নয়া গণতন্ত্র তত্ত্বটি ১৯৪০ সালে তাঁর “অন নিউ ডেমোক্রেসি” প্রবন্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয় এবং এটি অর্ধ-ঔপনিবেশিক ও অর্ধ-সামন্ততান্ত্রিক দেশে কীভাবে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব, তার একটি ব্যবহারিক রূপরেখা প্রদান করে। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো বিশ্ব বিপ্লবের অপেক্ষা না করেই একটি দেশে, বিশেষ করে চীনের মতো পশ্চাৎপদ দেশে, বিভিন্ন বিপ্লবী শ্রেণীর জোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা এবং ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্রে যাওয়া। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক নয়া গণতন্ত্রের অর্থ ও মূল বিষয়বস্তু কী কী।
মাও সে তুংয়ের ভাষায় নয়া গণতন্ত্র হলো “শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সংঘটিত সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী বিপ্লব, যা পুরনো গণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে আলাদা এবং সরাসরি সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়”। ১৯৪০ সালে তিনি লিখেছিলেন যে নয়া গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি নতুন রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন সংস্কৃতির সমন্বয়, যা চীনকে সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্ত করে সমাজতন্ত্রের পথে নিয়ে যাবে। মাও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে চীনের মতো দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার পর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না, বরং সব বিপ্লবী শ্রেণীর যৌথ শাসনে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরি হবে, যা পরবর্তীতে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে।
রাজনৈতিক অর্থে: নয়া গণতন্ত্র বলতে বোঝায় সব বিপ্লবী শ্রেণীর যৌথ একনায়কত্ব, যেখানে শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র বুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া একসাথে ক্ষমতায় থাকে এবং সাম্রাজ্যবাদী, দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। মাওয়ের মতে এই ব্যবস্থা পুঁজিবাদী একনায়কত্বের বিরোধী এবং এটি চীনকে পুঁজিবাদী সমাজে রূপান্তরিত হতে দেবে না। রাজনৈতিকভাবে এটি গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব বা “পিপলস ডেমোক্রেটিক ডিক্টেটরশিপ” নামে পরিচিত, যেখানে জনগণের জন্য গণতন্ত্র এবং শত্রুদের জন্য একনায়কত্ব—এই দুটি নীতির সমন্বয়ে ব্যবস্থাটি গড়ে ওঠে।
অর্থনৈতিক অর্থে: নয়া গণতন্ত্র হলো মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে সাম্রাজ্যবাদী, দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সব বড় শিল্প ও পুঁজি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়, জমিদারদের জমি কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা হয়, তবে সাধারণ ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী ব্যবসা ও ধনী কৃষকদের অর্থনীতি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। মাওয়ের মতে এই মিশ্র ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হবে। এটি পুরোপুরি পুঁজিবাদও নয়, আবার পুরোপুরি সমাজতন্ত্রও নয়—বরং এটি দুটির মধ্যবর্তী একটি রূপান্তরকালীন ব্যবস্থা।
সাংস্কৃতিক অর্থে: নয়া গণতন্ত্র বলতে বোঝায় একটি নতুন জাতীয়, বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যা সামন্ততান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে। মাওয়ের মতে পুরনো সংস্কৃতি, যা শোষণ ও কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে তৈরি, তাকে বদলে ফেলে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে যা বিজ্ঞানমনস্ক, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত। এই নতুন সংস্কৃতি হবে জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা এবং জনগণের হাতে গড়া, যা চীনা জনগণের মুক্তি ও উন্নয়নে সহায়ক হবে।
নয়া গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি বিপ্লবকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করে—প্রথমটি গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং দ্বিতীয়টি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। মাওয়ের মতে চীনের মতো দেশে সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব নয়, তাই প্রথমে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন ও সামন্ততন্ত্রমুক্ত করতে হবে, তারপর ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্রে যেতে হবে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী নয়া গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, বরং এটি সমাজতন্ত্রে যাওয়ার একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়, যা শেষ হলে দেশ সরাসরি সমাজতন্ত্রে প্রবেশ করবে।
১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সফল হওয়ার পর নয়া গণতন্ত্র বাস্তবে রূপ নেয় এবং ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চীন এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এই সময়ে জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল করে কৃষকদের জমি দেওয়া হয়, বড় শিল্প ও ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া হয়, তবে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা ব্যক্তি মালিকানায় থাকে। ১৯৫৩ সালের পর মাও সরাসরি সমাজতন্ত্রে উত্তরণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৫৬ সাল নাগাদ চীন আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
উপসংহার: সব মিলিয়ে মাও সে তুংয়ের নয়া গণতন্ত্র তত্ত্বটি ছিল একটি অভিনব ও ব্যবহারিক বিপ্লবী কৌশল, যা চীনের মতো পশ্চাৎপদ দেশে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখায়। এই তত্ত্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো একসাথে কাজ করে চীনকে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্ত করে সমাজতন্ত্রের পথে নিয়ে যায়। ১৯৪০ সালে এই তত্ত্ব প্রবর্তনের পর ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সফল হয় এবং ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নয়া গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে চীন সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ অতিক্রম করে, যা বিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে থেকে যায়।