- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মার্কসবাদ সমাজ পরিবর্তনের এক বৈপ্লবিক দর্শন, যার বাস্তব ও প্রায়োগিক রূপ দিয়েছেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। কার্ল মার্কসের তত্ত্বকে শুধু কিতাবি কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে, লেনিন তাকে তৎকালীন যুগেরোপযোগী করে রাশিয়ার মাটিতে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তাই আধুনিক বিশ্বে মার্কসীয় দর্শনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে লেনিনের অবদান অনস্বীকার্য ও চিরস্মরণীয়।
১। সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব: লেনিন মার্কসীয় অর্থনৈতিক তত্ত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী উপনিবেশিক শোষণ ও যুদ্ধের জন্ম দেয়। তার এই বিশ্লেষণ অনুন্নত ও উপনিবেশিক দেশগুলোর মুক্তির সংগ্রামকে এক নতুন তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেছিল। এর মাধ্যমে পুঁজিবাদী শোষণের বৈশ্বিক রূপটি সবার সামনে উন্মোচিত হয়।
২। দলীয় ক্যাডার গঠন: বিপ্লবকে সফল করতে লেনিন একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার বিপ্লবীদের পার্টি বা দল গঠনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে একা বিপ্লব করা সম্ভব নয়, তার জন্য সুসংগঠিত অগ্রগামী দল প্রয়োজন। এই দলই শ্রমিক শ্রেণীকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেবে এবং বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব প্রদান করবে। তার এই ক্যাডার ভিত্তিক দলীয় ধারণা বলশেভিক বিপ্লবের মূল চাবিকাঠি ছিল।
৩। শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী: কার্ল মার্কস মূলত শিল্প কারখানার শ্রমিকদের ওপর বেশি জোর দিলেও, লেনিন রাশিয়ার বাস্তবতায় কৃষকদের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। তিনি অনুন্নত বা কৃষিপ্রধান দেশে বিপ্লব সফল করতে শ্রমিক ও কৃষকের ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তোলার ডাক দেন। লেনিনের এই কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে রাশিয়ার বিশাল কৃষক সমাজ জারের শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবে শামিল হয়েছিল। এটি মার্কসবাদের একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও যুগান্তকারী সংযোজন ছিল।
৪। সর্বহারা একনায়কত্ব: বিপ্লব-পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় লেনিন সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেন। তিনি মনে করতেন, বুর্জোয়া বা পুঁজিপতিদের পাল্টা বিপ্লব নস্যাৎ করতে রাষ্ট্রের ওপর শ্রমিক শ্রেণীর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। এই একনায়কত্ব আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার একটি সাময়িক কিন্তু অত্যন্ত জরুরি রাজনৈতিক হাতিয়ার। এর মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের ভিত্তি সুরক্ষিত ও মজবুত করা সম্ভব হয়।
৫। বিপ্লবী পরিস্থিতি: লেনিন কেবল তত্ত্ব কথায় বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং কখন বিপ্লব ঘটাতে হবে তার সঠিক সময় নির্ধারণের সূত্র দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, যখন শাসক শ্রেণী আর আগের মতো শাসন করতে পারে না এবং শোষিত শ্রেণী আর আগের মতো শোষিত হতে চায় না, তখনই বিপ্লবী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই তাত্ত্বিক সূত্রটি ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। এর ফলে বিপ্লবের বস্তুগত ও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি স্পষ্ট হয়।
৬। রাষ্ট্রের বিলুপ্তি: লেনিন তার বিখ্যাত ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে রাষ্ট্র ব্যবস্থার শ্রেণী চরিত্র এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি মার্কসের সুরেই বলেন যে, সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় একসময় শোষণের হাতিয়ার রাষ্ট্র আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে তার আগে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা মেহনতি মানুষের প্রধান কর্তব্য। এই তত্ত্ব রাষ্ট্র সম্পর্কে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
৭। নয়া অর্থনৈতিক নীতি: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে লেনিন ১৯২১ সালে ‘নিউ ইকোনমিক পলিসি’ বা নয়া অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তন করেন। এটি ছিল সমাজতন্ত্রের পথে সাময়িক পিছু হটে কৌশলগতভাবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের কিছু উপাদানকে অনুমতি দেওয়া। এর ফলে রাশিয়ার ভেঙে পড়া অর্থনীতি দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হয় এবং দুর্ভিক্ষ থেকে দেশ রক্ষা পায়। তত্ত্বের চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার এটি এক অনন্য উদাহরণ।
৮। জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ: লেনিন শোষিত ও পরাধীন জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং তাদের স্বাধীনতার দাবিকে মার্কসীয় দর্শনে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কোনো জাতি অন্য কোনো জাতিকে পরাধীন রেখে নিজে মুক্ত হতে পারে না। জার শাসিত রাশিয়ার ভেতরকার শোষিত জাতিগুলোকে তিনি বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসহ পূর্ণ স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। এর ফলে বহু ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।
৯। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা: কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরের শৃঙ্খলা ও কার্যপদ্ধতি পরিচালনার জন্য লেনিন ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ নীতি প্রণয়ন করেন। এই নীতি অনুযায়ী, দলের ভেতরে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মুক্ত আলোচনা ও সমালোচনা করা যাবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে একবার সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে সবাইকে তা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এই সাংগঠনিক পদ্ধতি পার্টিকে যেমন শক্তিশালী করে, তেমনি যেকোনো উপদলীয় কোন্দল থেকে রক্ষা করে।
১০। চেতনার বিকাশ: লেনিন মনে করতেন যে শ্রমিকদের মধ্যে অর্থনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে আপনাআপনি বিপ্লবী চেতনার বিকাশ ঘটে না। ট্রেড ইউনিয়নগুলো কেবল মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক মুক্তির পথ দেখাতে পারে না। তাই বাইরে থেকে সমাজতান্ত্রিক বিজ্ঞানসম্মত চেতনা শ্রমিকদের মাঝে নিয়ে যেতে হবে। এই কাজের মূল দায়িত্ব পালন করবে সচেতন ও সুশিক্ষিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যবৃন্দ।
১১। যুদ্ধবিরোধী অবস্থান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিন এক সাহসী ও আপসহীন আন্তর্জাতিকতাবাদী যুদ্ধবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই যুদ্ধকে পুঁজিপতিদের নিজেদের মধ্যকার সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেন এবং এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন যে, এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে নিজেদের দেশের ভেতরের গৃহযুদ্ধে রূপান্তর করে বুর্জোয়া সরকারকে উৎখাত করতে হবে। তার এই দূরদর্শী চিন্তা রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১২। পুঁজিবাদের অসম বিকাশ: লেনিন মার্কসবাদের বিকাশ ঘটিয়ে প্রমাণ করেন যে, বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিকাশ সব দেশে সমানভাবে ঘটে না। অসম বিকাশের এই নিয়মের কারণে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার যেকোনো একটি দুর্বল লিঙ্কে বা শৃঙ্খলে আঘাত করে বিপ্লব করা সম্ভব। মার্কস মনে করতেন বিপ্লব প্রথমে উন্নত দেশে হবে, কিন্তু লেনিন দেখান যে রাশিয়া নামক অনুন্নত দেশেই প্রথম বিপ্লব সম্ভব। তার এই তত্ত্ব বিশ্ব বিপ্লবের ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
১৩। সহাবস্থান নীতি: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে লেনিন ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি ঘোষণা করেন। তিনি জানতেন যে নবজাত সোভিয়েত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাথে সাময়িক চুক্তি ও বাণিজ্য করা প্রয়োজন। তবে এই সহাবস্থান মানে আদর্শিক আপস নয়, বরং সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি কৌশল মাত্র। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজের স্থান সুসংহত করতে পেরেছিল।
১৪। সংসদীয় রাজনীতি: বুর্জোয়া বা পুঁজিবাদী দেশের সংসদ ও নির্বাচনে কমিউনিস্টদের অংশগ্রহণের বিষয়ে লেনিন এক বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি কেবল সংসদের বাইরে আন্দোলনের কথা বলেননি, বরং সংসদের ভেতরের মঞ্চকে বিপ্লবের প্রচারে ব্যবহারের কথা বলেন। বুর্জোয়া সংসদকে জনগণের সামনে মুখোশহীন করার জন্য সেখানে অংশ নেওয়াকে তিনি একটি বিপ্লবী কৌশল হিসেবে দেখতেন। তার এই নীতি বিশ্বজুড়ে বামপন্থী দলগুলোকে নতুন পথ দেখায়।
১৫। শোধনবাদের বিরোধিতা: মার্কসবাদের মূল বিপ্লবী চেতনাকে বিকৃত করার চেষ্টাকারী শোধনবাদীদের বিরুদ্ধে লেনিন আজীবন তাত্ত্বিক সংগ্রাম চালিয়েছেন। তিনি কাউটস্কি, বার্নস্টাইন প্রমুখ তাত্ত্বিকদের আপসকামী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং মার্কসবাদের বিপ্লবী ধারাকে রক্ষা করেন। লেনিন স্পষ্ট করে বলেন যে, সশস্ত্র বিপ্লব ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র ধ্বংস করা ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তার এই আপসহীন মনোভাব মার্কসবাদকে একটি জীবন্ত ও লড়াকু দর্শন হিসেবে টিকিয়ে রাখে।
১৬। সাংস্কৃতিক বিপ্লব: অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি লেনিন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি রাশিয়ার গণমানুষের মধ্য থেকে নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বুর্জোয়া সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত হয়ে একটি নতুন সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের জীবনযাত্রার মান ও চিন্তা-চেতনায় এক বিশাল পরিবর্তন আসে।
১৭। দর্শন রক্ষা: লেনিন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের দার্শনিক। তার ‘মেটেরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিও-ক্রিটিসিজম’ গ্রন্থে তিনি তৎকালীন বিজ্ঞান ও দর্শনের ভাববাদী আক্রমণ থেকে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ভিত্তি রক্ষা করেন। তিনি দেখান যে বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলো মার্কসবাদকে ভুল প্রমাণ করে না, বরং আরও শক্তিশালী করে। দর্শনের ক্ষেত্রে তার এই অবদান মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষাকে এক অভেদ্য যৌক্তিক ভিত্তি দান করেছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, লেনিন কেবল কার্ল মার্কসের দর্শনের ব্যাখ্যা করেননি, বরং তাকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘মার্কসবাদ-লেনিনবাদ’ নামক এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, কৌশলগত নমনীয়তা এবং আপসহীন বিপ্লবী চেতনা মার্কসবাদকে বিশ্বের শোষিত মানুষের মুক্তির একমাত্র হাতিয়ারে পরিণত করেছে। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ক্ষেত্রেই লেনিনের অবদান মানব ইতিহাসের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।