- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাজনৈতিক দল জনগণের রাজনৈতিক মতামত, দাবি ও স্বার্থকে সংগঠিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রে একটি দল বিশেষ শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করলেও আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অধিকাংশ দল বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থন লাভের চেষ্টা করে।
১। শ্রেণিভিত্তিক সমাজ: সমাজে ধনী, মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। প্রত্যেক শ্রেণির অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ এক নয়। রাজনৈতিক দল এসব স্বার্থকে সংগঠিত করে রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেয়। তাই দলীয় রাজনীতিতে শ্রেণিস্বার্থের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে দেখা যায়।
২। মার্কসীয় ধারণা: মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী সমাজের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত অর্থনৈতিক শ্রেণিসম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত। এ মতে রাজনৈতিক দলও কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ প্রকাশ করে। পুঁজিবাদী সমাজে অনেক দল ধনী ও মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় অধিক সক্রিয় হতে পারে।
৩। শ্রমিকের স্বার্থ: শ্রমিকভিত্তিক রাজনৈতিক দল সাধারণত ন্যায্য মজুরি, শ্রমিক অধিকার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার দাবি তুলে ধরে। তাদের নীতি শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই এ ধরনের দলকে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
৪। কৃষকের স্বার্থ: কৃষিপ্রধান সমাজে কৃষকদের স্বার্থকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল বা আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষিঋণ, ভূমি সংস্কার ও ভর্তুকির মতো দাবিকে তারা গুরুত্ব দেয়। এর মাধ্যমে কৃষক শ্রেণির স্বার্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৫। পুঁজিপতির স্বার্থ: ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি শ্রেণি কম কর, বিনিয়োগের স্বাধীনতা, বাজার সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রতি আগ্রহী থাকে। যেসব রাজনৈতিক দল এসব নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়, তারা অনেক ক্ষেত্রে পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে বলে বিবেচিত হয়।
৬। মধ্যবিত্ত স্বার্থ: মধ্যবিত্ত শ্রেণি শিক্ষা, চাকরি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। অনেক রাজনৈতিক দল এই শ্রেণির সমর্থন লাভের জন্য তাদের দাবি ও উদ্বেগকে দলীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে মধ্যবিত্ত স্বার্থও দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৭। অর্থনৈতিক নীতি: রাজনৈতিক দলের করনীতি, বাজেট, ভর্তুকি, শ্রমনীতি ও সম্পদ বণ্টনের পরিকল্পনায় শ্রেণিস্বার্থ প্রকাশ পেতে পারে। কোনো দল ধনী শ্রেণির কর কমাতে পারে, আবার অন্য দল দরিদ্রদের সামাজিক সুবিধা বাড়াতে পারে। এসব নীতি দলের শ্রেণিগত অবস্থান বুঝতে সহায়তা করে।
৮। দলীয় অর্থায়ন: রাজনৈতিক দলের অর্থের উৎসও শ্রেণিস্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে। বড় ব্যবসায়ী বা বিশেষ অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থায়নের ওপর দল বেশি নির্ভরশীল হলে তাদের নীতিতে সেই গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে পারে। ফলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অর্থশালী শ্রেণির স্বার্থ অগ্রাধিকার পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৯। নেতৃত্বের চরিত্র: একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কোন সামাজিক বা অর্থনৈতিক শ্রেণি থেকে এসেছে, তা দলটির নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চবিত্ত নেতৃত্বের দল এবং শ্রমজীবী নেতৃত্বের দলের অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে। তাই নেতৃত্বের সামাজিক ভিত্তিও শ্রেণিস্বার্থ বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
১০। ভোটের রাজনীতি: আধুনিক নির্বাচনে কোনো দল শুধু একটি শ্রেণির ভোটের ওপর নির্ভর করে সফল হতে পারে না। সরকার গঠনের জন্য শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমর্থন প্রয়োজন। ফলে দলগুলো অনেক সময় একাধিক শ্রেণির স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করে।
১১। সর্বজনীন দল: আধুনিক গণতন্ত্রে অনেক রাজনৈতিক দল ‘সর্বজনীন’ বা বহুশ্রেণিভিত্তিক চরিত্র গ্রহণ করেছে। তারা নির্দিষ্ট শ্রেণির পরিবর্তে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে চায়। এজন্য দলীয় কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণির দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং শ্রেণিভিত্তিক সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমে যায়।
১২। জাতীয় স্বার্থ: রাজনৈতিক দল কেবল শ্রেণিস্বার্থ নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের মতো সামগ্রিক জাতীয় বিষয় নিয়েও কাজ করে। ক্ষমতায় গেলে একটি দলকে সব নাগরিকের সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই শ্রেণিস্বার্থ দলীয় রাজনীতির একমাত্র ভিত্তি নয়।
১৩। আদর্শের প্রভাব: রাজনৈতিক দলের চরিত্র কেবল শ্রেণি দ্বারা নির্ধারিত হয় না; উদারনীতি, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় আদর্শ বা পরিবেশবাদও দল গঠনে ভূমিকা রাখে। অনেক সময় একই অর্থনৈতিক শ্রেণির মানুষ ভিন্ন আদর্শের কারণে ভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে পারে।
১৪। স্বার্থের সমন্বয়: রাজনৈতিক দলের একটি প্রধান কাজ হলো বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবি ও স্বার্থকে একত্র করে গ্রহণযোগ্য নীতিতে রূপ দেওয়া। শ্রমিক ও মালিক, কৃষক ও ভোক্তা কিংবা শহর ও গ্রামের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে দল বৃহত্তর জনসমর্থন গড়ে তুলতে চেষ্টা করে।
১৫। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা: নির্বাচনী প্রতিযোগিতা দলগুলোকে সংকীর্ণ শ্রেণিস্বার্থের বাইরে যেতে বাধ্য করে। বেশি ভোট পাওয়ার জন্য দলকে বিভিন্ন পেশা, অঞ্চল ও সামাজিক গোষ্ঠীর দাবি বিবেচনা করতে হয়। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের শ্রেণিগত চরিত্র অনেক সময় তুলনামূলক নমনীয় হয়ে ওঠে।
১৬। রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব: রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে নির্দিষ্ট সমর্থক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রশাসন পরিচালনা করতে হয়। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জনকল্যাণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা বিভিন্ন শ্রেণিকে প্রভাবিত করে। তাই ক্ষমতাসীন দলের চরিত্র শুধু শ্রেণিভিত্তিক থাকে না।
১৭। সামগ্রিক মূল্যায়ন: “রাজনৈতিক দল শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে”—উক্তিটি আংশিকভাবে সত্য। ঐতিহাসিকভাবে বহু দল নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেণির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তবে আধুনিক গণতন্ত্রে দলগুলো বহুশ্রেণির সমর্থন, জাতীয় স্বার্থ ও বিভিন্ন সামাজিক দাবির প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করে।
উপসংহার: রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শ্রেণিস্বার্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, বিশেষত সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিবিভক্তির কারণে। তবে আধুনিক রাজনৈতিক দল শুধু একটি শ্রেণির প্রতিনিধি নয়; তারা বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের সমন্বয় করে বৃহত্তর জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা করে। তাই উক্তিটি শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য।