- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ভি. আই. লেনিন রাজনৈতিক দলকে শুধু নির্বাচনী সংগঠন হিসেবে দেখেননি; তিনি একে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী নেতৃত্বের প্রধান হাতিয়ার মনে করতেন। তাঁর মতে সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আদর্শনিষ্ঠ দল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেবে।
রাজনৈতিক দল সম্পর্কে V.I. Lenin-এর ধারণা:
১। অগ্রগামী দল: লেনিন মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণি নিজে নিজেই বিপ্লবী চেতনা অর্জন করতে পারে না। তাই তাদের সামনে পথ দেখানোর জন্য একটি অগ্রগামী দল প্রয়োজন। এই দল হবে শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে সচেতন, সাহসী ও প্রগতিশীল সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত। দলটি শ্রমিকদের চেতনায় সমাজতন্ত্রের চিন্তা বাইরে থেকে পৌঁছে দেবে এবং বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে।
২। পেশাদার বিপ্লবী: লেনিনের মতে, দলে শুধু সাধারণ কর্মী থাকলেই হবে না, থাকতে হবে পেশাদার বিপ্লবী। তারা সারাক্ষণ দলের কাজে নিয়োজিত থাকবেন, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকবে না। জারের মতো স্বৈরাচারী শাসনামলে গোপন ও কেন্দ্রীভূত সংগঠন ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়। এই পেশাদার বিপ্লবীরাই দলের মূল চালিকাশক্তি হবে।
৩। শ্রমিক শ্রেণির চেতনা: লেনিন বলেছেন, শ্রমিক শ্রেণি যদি নিজেরাই চলতে থাকে, তাহলে তারা কখনো বুর্জোয়া চেতনার বাইরে বেরোতে পারবে না।শ্রমিক শ্রেণি শুধু অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে লড়াই করলে সংস্কারবাদী হয়ে পড়বে। তাই তাদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা জাগাতে হবে, যা আসবে দলের মাধ্যমে। দলই শ্রমিকদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেবে এবং সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করবে।
৪। সংস্কারবাদের বিরোধিতা: লেনিন পশ্চিমা ইউরোপের সংস্কারবাদী শ্রমিক দলগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই দলগুলো পুঁজিবাদের কাঠামোর ভেতরেই সংস্কার চেয়ে সন্তুষ্ট থাকে।সংস্কারবাদ কখনো পুঁজিবাদ overthrow করার কথা ভাবে না। লেনিনের মতে, এই ধরনের দল শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। তাই তিনি এক নতুন ধরনের দল গড়ার ডাক দিয়েছেন।
৫। নতুন ধরনের দল: লেনিন ১৯০২ সালে ‘What Is to Be Done?’ গ্রন্থে ‘নতুন ধরনের দল’-এর ধারণা দেন। এই দল হবে পুরোনো সংস্কারবাদী দলের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি হবে একটি বিপ্লবী দল, যার লক্ষ্য পুঁজিবাদ উৎখাত করা। দলটি হবে সুসংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত। এই নতুন ধরনের দলই পরবর্তীতে বলশেভিক পার্টির ভিত্তি তৈরি করে।
৬। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রবাদ: লেনিন দলের সাংগঠনিক কাঠামোর জন্য ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রবাদ’ নীতি প্রণয়ন করেন। এই ব্যবস্থায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচিত হবেন নিচ থেকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সবাইকে তা মেনে চলতে হবে। সংখ্যালঘুকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে। উপরের কমিটির নির্দেশ নিচের সবাইকে মানতে হবে। এটি দলের ঐক্য ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করে।
৭। লৌহ শৃঙ্খলা: লেনিন দলে কঠোর শৃঙ্খলার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, শৃঙ্খলা ছাড়া দল কোনো কঠিন সংগ্রামে টিকতে পারবে না। দলের প্রতিটি সদস্যকে দলের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে, ব্যক্তিগত মত উপেক্ষা করতে হবে। এই শৃঙ্খলা হবে স্বেচ্ছামূলক, ভয়ের কারণে নয়। এই লৌহ শৃঙ্খলাই দলকে একটি সৈনিক দলের মতো সংগঠিত করে।
৮। দল ও শ্রেণির সম্পর্ক: লেনিন স্পষ্ট করেছেন, দল আর শ্রমিক শ্রেণি এক জিনিস নয়। দল হলো শ্রমিক শ্রেণির সবচেয়ে সচেতন অংশ, যারা শ্রেণির নেতৃত্ব দেয়। শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি ইত্যাদি সংগঠন থাকতে পারে, কিন্তু দলই তাদের সবাইকে পথ দেখাবে। দল হল শ্রমিক শ্রেণির সংগঠনের সর্বোচ্চ রূপ।
৯। শ্রেণি সংগ্রামের নেতৃত্ব: লেনিনের মতে, proletarian party-এর মূল রাজনৈতিক কাজ হলো শ্রমিক শ্রেণিকে শ্রেণি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া। এই সংগ্রাম শুধু অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে। দলকে মিত্রশক্তি খুঁজে বের করতে হবে এবং শত্রুকে পরাজিত করার কৌশল ঠিক করতে হবে। এই নেতৃত্ব ছাড়া শ্রমিক শ্রেণি সফল হতে পারবে না।
১০। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিরোধিতা: লেনিন দলকে কোনো একজন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে দেননি।他 বলেছেন, দল হবে একটি সম্মিলিত নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান, কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও শৃঙ্খলাকে নষ্ট করে। তাই দলের স্বার্থ সবসময় ব্যক্তিগত স্বার্থের ওপরে থাকবে। এই নীতিই দলকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
১১। দলীয় ঐক্য: লেনিন দলীয় ঐক্যের ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দলে কোনো উপদল বা গ্রুপ থাকা যাবে না। সবাইকে এক আদর্শ, এক কর্মসূচি ও এক নেতৃত্বের অধীনে থাকতে হবে। উপদলীয় কোন্দল দলকে দুর্বল করে এবং শত্রুর হাতে সুযোগ এনে দেয়। তাই তিনি দলীয় ঐক্য রক্ষার জন্য কঠোর নিয়ম আরোপ করেছেন।
১২। আত্মসমালোচনা: লেনিন মনে করতেন, দলের ভেতরে আত্মসমালোচনার সুযোগ থাকতে হবে। সদস্যরা যদি ভুল দেখেন, তবে তা নির্ভয়ে দলের সামনে তুলে ধরবেন।但 আত্মসমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক, দল ভাঙার জন্য নয়। সঠিক আত্মসমালোচনা দলের ভুল সংশোধনে সাহায্য করে এবং দলকে আরও শক্তিশালী করে। এই প্রক্রিয়াই দলের গতিশীলতা বজায় রাখে।
১৩। গোপন সংগঠন: জারের স্বৈরাচারী শাসনামলে লেনিন গোপন সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। প্রকাশ্য আন্দোলন চালানো সম্ভব না হলে গোপন কাঠামো তৈরি করতে হবে।但 এই গোপন সংগঠন জনগণের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না, বরং জনগণের মধ্যেই কাজ করবে। এই কৌশলই বিপ্লবী দলকে টিকিয়ে রাখে এবং সংগ্রাম চালু রাখে।
১৪। জনগণের সাথে সম্পর্ক: লেনিন বলেছেন, দল জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে আর বিপ্লবী দল থাকে না। দলকে সবসময় শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। তাদের সমস্যা বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কর্মসূচি ঠিক করতে হবে। জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো দলই ক্ষমতা দখল করতে পারে না বা ধরে রাখতে পারে না।
১৫। নীতির গুরুত্ব: লেনিনের মতে, দলের সিদ্ধান্ত নিতে হবে নীতির ভিত্তিতে, সুবিধাবাদের ওপর ভিত্তি করে নয়। দল যদি নীতি বিসর্জন দেয়, তবে সে আর বিপ্লবী থাকে না। কিন্তু নীতির প্রয়োগ হতে হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয়ভাবে। শুধু নীতির নামে একগুঁয়ে থাকলে আন্দোলন এগোবে না। তাই নীতি ও কৌশলের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে।
১৬। দলের সর্বোচ্চ রূপ: লেনিনের মতে, শ্রমিক শ্রেণির সব সংগঠনের মধ্যে দলই সর্বোচ্চ। ট্রেড ইউনিয়ন শুধু অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে কাজ করে, কিন্তু দল রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে কাজ করে। তাই দলকে অন্য সব সংগঠনের ওপরে থাকতে হবে এবং তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। এই শ্রেষ্ঠত্ব দলকে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৭। অভিজ্ঞতার শিক্ষা: লেনিনের দল ধারণা কোনো বই থেকে জন্ম নেয়নি, তা রাশিয়ার বাস্তব সংগ্রাম থেকে এসেছে। জারের বিরুদ্ধে লড়াই, শ্রমিক আন্দোলন এবং সংস্কারবাদের সাথে সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাই তাঁর ধারণা কেবল তত্ত্ব নয়, এটি প্রমাণিত ও পরীক্ষিত একটি বিপ্লবী কর্মপন্থা। এই অভিজ্ঞতাই বিশ্বের বহু বিপ্লবী দলকে অনুপ্রাণিত করেছে।
উপসংহার: লেনিনের রাজনৈতিক দল ধারণা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির জন্য এক শক্তিশালী হাতিয়ার। অগ্রগামী দল, পেশাদার বিপ্লবী ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রবাদ তাঁর তত্ত্বের মূল ভিত্তি। সংস্কারবাদের বিরোধিতা ও লৌহ শৃঙ্খলা দলকে বিপ্লবী চরিত্র দিয়েছে। আজও বিশ্বের বহু শ্রমিক দল লেনিনের এই মডেল অনুসরণ করে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর ধারণা শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য ও সংগ্রামের জন্য চিরকাল প্রাসঙ্গিক।