- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পুঁজিবাদী বিশ্ব যখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন ভি. আই. লেনিন মার্ক্সবাদী তত্ত্বের আলোকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাখ্যা করেন। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সামাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’-এ তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মুক্ত প্রতিযোগিতা একচেটিয়া কারবারে রূপ নেয় এবং বিশ্বব্যাপী শোষণ চালায়।
১। একচেটিয়া কারবার: মুক্ত প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশাল বিশাল একচেটিয়া কারবার বা মনোপলির সৃষ্টি হয়। ছোট ছোট উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ে। ফলে গুটিকয়েক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী পুরো দেশের উৎপাদন ও বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এই একচেটিয়া কারবারই হলো সাম্রাজ্যবাদের প্রধান এবং প্রথম অর্থনৈতিক ভিত্তি।
২। ব্যাংক পুঁজি: শিল্প বিপ্লবের পর ব্যাংকগুলোর চরিত্রে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ব্যাংকগুলো এখন আর সাধারণ অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়ে ওঠে এবং শিল্পের প্রধান অর্থদাতায় পরিণত হয়। লেনিনের মতে, ব্যাংকের এই অঢেল পুঁজিই পরবর্তীতে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৩। আর্থিক পুঁজি: শিল্প পুঁজি এবং ব্যাংক পুঁজির মেলবন্ধনের ফলে এক নতুন ধরনের পুঁজির জন্ম হয়, যাকে লেনিন ‘আর্থিক পুঁজি’ বা ফিন্যান্স ক্যাপিটাল বলেছেন। ব্যাংকের মালিকরা শিল্পের মালিক বনে যায় এবং শিল্পের মালিকরা ব্যাংকের অংশীদার হয়। এই আর্থিক পুঁজি দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এর ফলে সমাজে এক নতুন পরজীবী শাসক শ্রেণীর জন্ম হয়।
৪। পুঁজি রপ্তানি: অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সস্তা শ্রম এবং কাঁচামাল পাওয়ার সুবিধার্থে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো সেখানে পুঁজি বিনিয়োগ করতে শুরু করে। আগে পুঁজিবাদী দেশগুলো কেবল পণ্য রপ্তানি করত, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী স্তরে এসে পণ্য রপ্তানির চেয়ে পুঁজি রপ্তানি প্রধান হয়ে ওঠে। এই পুঁজি রপ্তানির মাধ্যমে তারা অনুন্নত দেশগুলোর ওপর স্থায়ী অর্থনৈতিক দাসত্ব চাপিয়ে দেয়।
৫। আন্তর্জাতিক জোট: বিশ্ববাজার দখল এবং নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা আন্তর্জাতিক জোট বা কার্টেল গঠন করে। এই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোটগুলো সমগ্র বিশ্বের বাজারকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। তারা পণ্যের দাম নির্ধারণ এবং উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করে। এই জোটগুলোই বিশ্ব অর্থনীতি পরিচালনা করে।
৬। বিশ্ব ব্যবচ্ছেদ: আর্থিক পুঁজির মালিক ও তাদের আন্তর্জাতিক জোটগুলো অর্থনৈতিকভাবে সমগ্র বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। বিশ্বের দুর্বল ও অনুন্নত দেশগুলো এই বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হয়। লেনিন দেখিয়েছেন যে, বিশ্বের এই অর্থনৈতিক ব্যবচ্ছেদ বা বিভাজন মূলত পুঁজিপতিদের মুনাফা শিকারের তীব্র আকাঙ্ক্ষারই একটি অনিবার্য ও প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ।
৭। রাজনৈতিক বিভাজন: অর্থনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো রাজনৈতিকভাবেও পৃথিবীকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তারা অনুন্নত অঞ্চলগুলোকে সরাসরি দখল করে উপনিবেশ স্থাপন করে। ১৯ শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর সমস্ত মুক্ত অঞ্চল পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে নতুন কোনো অঞ্চল দখল করতে হলে অন্যের এলাকা কেড়ে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
৮। যুদ্ধে অনিবার্যতা: যখন সমগ্র পৃথিবী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ভাগ হয়ে যায়, তখন নতুন করে বাজার পাওয়ার একমাত্র পথ হয় পুনর্বণ্টন। এই পুনর্বণ্টনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়। লেনিনের মতে, এই দ্বন্দ্বের শেষ পরিণতি হলো যুদ্ধ। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাজার দখলের যুদ্ধ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।
৯। পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর: লেনিনের তত্ত্ব অনুযায়ী সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের একটি বিশেষ এবং সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক স্তর। এটি পুঁজিবাদের কোনো বিচ্ছিন্ন নীতি বা সাময়িক বিকৃতি নয়, বরং পুঁজিবাদের স্বাভাবিক বিকাশেরই চূড়ান্ত রূপ। এই স্তরে এসে পুঁজিবাদের ভেতরের সমস্ত বৈপরীত্য চরম আকার ধারণ করে। এই স্তরের পর পুঁজিবাদের আর কোনো প্রগতিশীল রূপ বা নতুন রূপ ধারণের ক্ষমতা থাকে না।
১০। পরজীবী অর্থনীতি: সাম্রাজ্যবাদী স্তরে এসে পুঁজিবাদ এক চরম পরজীবী ও ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থায় পরিণত হয়। এই ব্যবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে কেবল কাগজের শেয়ার, বন্ড এবং সুদের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন প্রধান হয়ে ওঠে। একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী সমগ্র বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের রক্ত চোষা মুনাফার ওপর ভিত্তি করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে এদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক থাকে না।
১১। অসম বিকাশ: লেনিন তাঁর এই তত্ত্বে পুঁজিবাদের ‘অসম বিকাশের নিয়ম’ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সমস্ত পুঁজিবাদী দেশ কখনোই সমান গতিতে বা সমান্তরালভাবে বিকশিত হতে পারে না। কোনো দেশ দ্রুত এগিয়ে যায়, আবার কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। এই অসম বিকাশের ফলেই বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তির ভারসাম্য বারবার পরিবর্তিত হয় এবং নতুন যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়।
১২। বিপ্লবের পটভূমি: সাম্রাজ্যবাদ কেবল যুদ্ধের জন্ম দেয় না, এটি একই সাথে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবের বস্তুগত পরিস্থিতিও তৈরি করে। শোষণের মাত্রা তীব্র হওয়ার কারণে শ্রমিক শ্রেণী এবং উপনিবেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলতে থাকে। লেনিন তাই সাম্রাজ্যবাদকে ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রাক্কাল’ বা প্রবেশদ্বার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি মানবসমাজকে সমাজতন্ত্রের দিকে ধাবিত করে।
১৩। দুর্বলতম লিঙ্ক: অসম বিকাশের তত্ত্ব থেকে লেনিন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সব দেশে একসাথে নাও হতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বশৃঙ্খলের যেখানে সবচেয়ে দুর্বল শিকল বা ‘দুর্বলতম লিঙ্ক’ থাকবে, সেখানেই প্রথম বিপ্লব সফল হবে। রাশিয়ার অনগ্রসরতা এবং তীব্র অন্তদ্বন্দ্বের কারণে রাশিয়াকেই তিনি সেই দুর্বলতম লিঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং সেখানে ১৯১৭ সালের বিপ্লব সফল হয়।
১৪। উপনিবেশের শোষণ: সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের দেশের সংকট কাটানোর জন্য উপনিবেশগুলোর ওপর নির্মম শোষণ ও নির্যাতন চালায়। তারা উপনিবেশগুলো থেকে সস্তায় কাঁচামাল লুটে নেয় এবং সেখানে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য চড়া দামে বিক্রি করে। এর ফলে উপনিবেশের স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে যায় এবং জনগণ চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়। এই শোষণই সাম্রাজ্যবাদের টিকে থাকার প্রধান রসদ।
১৫। শ্রমিক অভিজাত: সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা উপনিবেশগুলো থেকে অর্জিত বিপুল ও অতিরিক্ত মুনাফার একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের দেশের শ্রমিক নেতাদের একাংশকে ঘুষ হিসেবে প্রদান করে। এর মাধ্যমে তারা শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং বিপ্লবী চেতনাকে স্তিমিত করার চেষ্টা করে। লেনিন এদের ‘শ্রমিক অভিজাত’ বা বুর্জোয়াদের দালাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা বিপ্লবের পথে বড় অন্তরায়।
১৬। একচেটিয়ার পচন: একচেটিয়া পুঁজি বা কার্টেলগুলো অনেক সময় নিজেদের অতিরিক্ত মুনাফা ধরে রাখার জন্য নতুন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে চেপে রাখে। বাজারে নতুন প্রতিযোগী যেন আসতে না পারে, সেজন্য তারা কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে। লেনিনের মতে, এই প্রবণতা পুঁজিবাদের পচনশীলতাকে প্রমাণ করে। উৎপাদন শক্তির বিকাশ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া পুঁজিবাদের ধ্বংসের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
১৭। নব্য রূপ: লেনিন সতর্ক করেছিলেন যে, প্রত্যক্ষ উপনিবেশ হাতছাড়া হলেও সাম্রাজ্যবাদ তার চরিত্র বদলায় না, বরং নতুন রূপ নেয়। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, ঋণের ফাঁদ এবং বহুজাতিক সংস্থার মাধ্যমে তারা অনুন্নত দেশগুলোর স্বাধীনতাকে খর্ব করে রাখে। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন রাখার এই কৌশলটিই আধুনিক বিশ্বে নব্য-সাম্রাজ্যবাদ বা নব্য-উপনিবেশবাদ নামে পরিচিত, যা লেনিনের তত্ত্বেরই সত্যতা প্রমাণ করে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ তত্ত্ব কেবল তাঁর সমসাময়িক যুগের বিশ্লেষণ ছিল না, বরং তা বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কর্পোরেশনের আধিপত্য লেনিনের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসেরই বাস্তব রূপ। বিশ্বজুড়ে সম্পদ কুক্ষিগত করার যে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ আমরা আজও দেখছি, তা মূলত লেনিন বর্ণিত একচেটিয়া পুঁজিবাদেরই অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ।