- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ পল সাত্রে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, যিনি অস্তিত্ববাদকে একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের জীবনের কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ বা উদ্দেশ্য থাকে না। মানুষ পৃথিবীতে আসার পর নিজের কর্ম, চিন্তা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করে। সাত্রের এই বৈপ্লবিক দর্শন মানবজীবনকে এক পরম স্বাধীনতা ও গভীর দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
১। অস্তিত্ব পূর্ববর্তী সারসত্তা: সাত্রের অস্তিত্ববাদের মূল কথাই হলো মানুষের অস্তিত্ব তার সারসত্তার পূর্বে আসে। কোনো জড় বস্তু যেমন তৈরির আগেই তার উদ্দেশ্য ঠিক থাকে, মানুষের ক্ষেত্রে তেমনটি ঘটে না। মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে জন্ম নেয় বা আবির্ভূত হয় এবং তারপর নিজের কর্মের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, মানুষ আগে থেকে নির্ধারিত কোনো ছাঁচে বা উদ্দেশ্যে জন্মায় না। মানুষ নিজেই নিজের জীবনের একমাত্র স্থপতি এবং রূপকার।
২। স্বাধীনতার পরম রূপ: সাত্রে বিশ্বাস করতেন যে মানুষ জন্মগতভাবেই সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং এই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া অসম্ভব। তাঁর মতে, মানুষকে স্বাধীন হতে বাধ্য করা হয়েছে কারণ সে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেনি, অথচ সে মুক্ত। এই স্বাধীনতা কোনো সহজ বা আনন্দের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বিশাল বোঝা। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদেরই নিতে হয় এবং এর কোনো বিকল্প নেই। এই চরম স্বাধীনতাই মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৩। পরাধীনতার অস্বীকৃতি: সাত্রের দর্শনে ভাগ্যবাদ বা নিয়তিবাদের কোনো স্থান নেই এবং তিনি একে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। মানুষ প্রায়শই নিজের ব্যর্থতার জন্য ভাগ্য, সমাজ বা পরিস্থিতিকে দায়ী করে সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সাত্রে মনে করেন, এগুলো কেবলই অজুহাত এবং মানুষ কোনোভাবেই পরাধীন বা নিয়তির দাস নয়। পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, তার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখানোর স্বাধীনতা মানুষের সব সময়ই থাকে। তাই নিজের জীবনের গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা একমাত্র মানুষের নিজের হাতেই ন্যস্ত।
৪। উদ্বেগ এবং যন্ত্রণা: পরম স্বাধীনতা মানুষের মনে এক গভীর উদ্বেগ এবং মানসিক যন্ত্রণার জন্ম দেয়। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার জীবনের সমস্ত সিদ্ধান্তের জন্য সে একাই দায়ী, তখন সে একাকীত্ব ও ভয় অনুভব করে। কোনো ঈশ্বর বা সমাজ এসে মানুষের হয়ে সিদ্ধান্ত বা দায়ভার নিয়ে নেবে না। এই চরম নিঃসঙ্গতা এবং সিদ্ধান্তের গুরুভার মানুষকে প্রতিনিয়ত এক অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। সাত্রের মতে, এই উদ্বেগ হলো মানুষের স্বাধীনতারই এক অনিবার্য প্রকাশ।
৫। সদুপায় বা সততা: সাত্রের মতে, একজন মানুষের জীবন তখনই সার্থক ও সৎ হয় যখন সে নিজের স্বাধীনতার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। একে তিনি ‘অথেনটিসিটি’ বা সদুপায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় সৎভাবে জীবনযাপন করে। সমাজের চাপ বা অন্ধ বিশ্বাসের কাছে মাথা নত না করে নিজের সত্যকে চেনা মানুষের প্রধান কর্তব্য। যে মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিজে নেয়, সেই কেবল প্রকৃত এবং সৎ জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়।
৬। অসদুপায় বা ভন্ডামি: যখন কোনো মানুষ নিজের স্বাধীনতার দায় এড়াতে সমাজ বা নিয়তির দোহাই দেয়, তখন সাত্রে তাকে ‘ব্যাড ফেইথ’ বা অসদুপায় বলেন। এটি আসলে এক ধরণের আত্মপ্রবঞ্চনা বা ভন্ডামি, যেখানে মানুষ নিজের স্বাধীনতার ভয় থেকে পালিয়ে বেড়ায়। মানুষ যখন অভিনয় করে বা অন্যের দেওয়া ভূমিকায় নিজেকে বন্দী করে ফেলে, তখন সে নিজের সত্যতা হারায়। সাত্রে এই মানসিকতাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন এবং একে কাপুরুষতা বলে অভিহিত করেছেন।
৭। ঈশ্বরের অনুপস্থিতি: সাত্রে একজন কট্টর নাস্তিকতাবাদী দার্শনিক ছিলেন এবং তাঁর অস্তিত্ববাদ ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। তিনি মনে করতেন, যদি ঈশ্বর থাকতেন, তবে মানুষের স্বাধীনতা বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকত না। ঈশ্বরের অনুপস্থিতির অর্থ হলো মানুষের জন্য কোনো মহাজাগতিক নৈতিক নিয়ম বা পূর্বনির্ধারিত গাইডলাইন নেই। এই শূন্যতার কারণে মানুষকে নিজের নৈতিকতার নিয়ম নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। ঈশ্বরের অনুপস্থিতি মানুষকে আরও বেশি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল করে তোলে।
৮। দায়িত্বের গুরুভার: স্বাধীনতা এবং দায়িত্ব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, যা সাত্রের দর্শনে অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। সাত্রে বলেছেন, মানুষ যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে কেবল নিজের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। আমার প্রতিটি কাজ বিশ্বের দরবারে একটি আদর্শ বা উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিশাল বৈশ্বিক দায়িত্বের কারণে মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্ববহ এবং চিন্তাশীল হওয়া উচিত। এই দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ মানুষের নেই।
৯। নিজের জন্য সত্তা: সাত্রে সত্তাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন, যার একটি হলো ‘নিজের জন্য সত্তা’ বা সচেতন মানুষের সত্তা। মানুষের এই সত্তাটি গতিশীল, পরিবর্তনশীল এবং এটি প্রতিনিয়ত নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে ব্যস্ত থাকে। মানুষের কোনো স্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় রূপ নেই, সে সবসময় একটি সম্ভাবনার মধ্যে বাস করে। এই সত্তার মূল বৈশিষ্ট্য হলো চেতনা, যা মানুষকে তার চারপাশের জগৎ সম্পর্কে অবগত করে। মানুষের এই সচেতনতাই তাকে অন্যান্য জড় বস্তু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তোলে।
১০। নিজের মধ্যে সত্তা: সত্তার দ্বিতীয় ধরণটি হলো ‘নিজের মধ্যে সত্তা’, যা মূলত জড় বস্তু বা অচেতন বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি পাথর বা টেবিল যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকে এবং এদের নিজেদের পরিবর্তন করার কোনো ক্ষমতা নেই। এদের সারসত্তা আগে থেকেই নির্ধারিত এবং এরা কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মানুষ যখন নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে জড় বস্তুর মতো আচরণ করে, তখন সে এই স্তরে নেমে যায়। সাত্রে মানুষকে এই জড়তা ভেঙে সর্বদা সচেতন ও গতিশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
১১। শূন্যতার ধারণা: সাত্রের দর্শনে শূন্যতা বা না-বাচকতা মানুষের চেতনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ যখন কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করে, তখন সে আসলে নিজের ভেতরের একটি অভাব বা শূন্যতাকে অনুভব করে। এই শূন্যতাই মানুষকে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে এবং কর্মে প্রবৃত্ত হতে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। যদি মানুষের জীবনে কোনো অভাব না থাকত, তবে মানুষের চেতনার কোনো বিকাশ ঘটত না। তাই শূন্যতা ধ্বংসাত্মক নয়, বরং এটি মানুষের নতুন সম্ভাবনার পথ উন্মোচন করে।
১২। অন্যের দৃষ্টির প্রভাব: সাত্রে মনে করতেন, সমাজে অন্যের উপস্থিতি মানুষের নিজস্ব স্বাধীনতা ও সত্তার ওপর এক ধরণের বড় আঘাত হানে। অন্যের দৃষ্টি আমাদের একটি জড় বস্তু বা নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দী করার চেষ্টা করে, যা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। সাত্রের বিখ্যাত উক্তি ‘নরক হলো অন্যেরা’ আসলে এই মানসিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক জটিলতাকেই নির্দেশ করে। অন্যের মূল্যায়নের কারণে মানুষ প্রায়ই নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং অন্যের ইচ্ছার দাস হয়ে ওঠে।
১৩। কর্মের গুরুত্ব: সাত্রের অস্তিত্ববাদে কেবল ঘরে বসে চিন্তা করার কোনো মূল্য নেই, বরং কর্মই হলো মানুষের আসল পরিচয়। একজন মানুষ কী ভাবছে তার চেয়ে বড় কথা হলো সে বাস্তবে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কর্মের মাধ্যমেই মানুষের ভেতরের সম্ভাবনা বাস্তব রূপ লাভ করে এবং তার চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। অলস বসে থেকে নিজেকে মহান ভাবার কোনো সুযোগ সাত্রের দর্শনে নেই। মানুষ যা করে, প্রকৃতপক্ষে সে ঠিক সেই সত্তাটিই লাভ করে।
১৪। নৈতিকতার নিজস্ব নির্মাণ: কোনো সমাজ, ধর্ম বা রাষ্ট্র মানুষের জন্য চিরন্তন নৈতিকতার নিয়ম তৈরি করে দিতে পারে না বলে সাত্রে বিশ্বাস করতেন। যেহেতু কোনো পরম সত্য বা ঈশ্বর নেই, তাই নৈতিকতার মানদণ্ড মানুষকে নিজেই নিজের বিবেকের আলোchoices তৈরি করতে হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তির নিজস্ব বিবেচনাবোধের ওপর নির্ভর করে। এই নিজস্ব নৈতিকতাই মানুষকে সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারী করে তোলে।
১৫। মর্যাদা এবং গৌরব: সাত্রের দর্শন মানুষকে কোনো অসহায় জীব হিসেবে দেখে না, বরং তাকে এক চরম গৌরব ও মর্যাদার আসনে বসায়। মানুষ তার নিজের ভাগ্যের বিধাতা এবং সে নিজেই তার জীবনের অর্থ তৈরি করার ক্ষমতা রাখে। এই দর্শন মানুষকে শেখায় যে কোনো বিপর্যয়ই মানুষকে চিরতরে ধ্বংস করতে পারে না যদি না মানুষ নিজে হার মানে। নিজের জীবনের অর্থ নিজে তৈরি করার এই ক্ষমতাই মানুষের প্রকৃত গৌরব। সাত্রের এই চিন্তা মানুষকে চরম আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।
১৬। রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতা: সাত্রে কেবল একজন তাত্ত্বিক দার্শনিক ছিলেন না, তিনি বাস্তব জীবনের রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন অস্তিত্ববাদীকে অবশ্যই সমাজের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে। মার্ক্সবাদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তাঁর কণ্ঠস্বর এই রাজনৈতিক সচেতনতারই প্রমাণ। তাঁর মতে, নিজের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করাও মানুষের অন্যতম বড় দায়িত্ব।
১৭। আশার নতুন দিগন্ত: সাত্রের দর্শনকে অনেকে হতাশাবাদী মনে করলেও মূলত এটি একটি অত্যন্ত আশাবাদী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক দর্শন। এটি মানুষকে শেখায় যে অতীত যেমনই হোক না কেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে নিজের মতো করে গড়ার সুযোগ সবসময় থাকে। মানুষ কোনো অন্ধ শক্তির হাতের পুতুল নয়, বরং সে নিজের জীবনের স্বাধীন চালক। এই দর্শন মানুষকে সমস্ত গণ্ডি ভেঙে নতুন করে বাঁচার এবং আশার আলো দেখার সাহস জোগায়। জীবনের অর্থহীনতার মাঝেও নিজের অর্থ খুঁজে নেওয়াই এই দর্শনের মূল শিক্ষা।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, জ্যাঁ পল সাত্রের অস্তিত্ববাদ মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত করে তার ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। তিনি মানুষকে অন্ধ অনুকরণ ও অজুহাত ত্যাগ করে নিজের জীবনের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিটি মানুষই অনন্য এবং নিজের ভাগ্য গড়ার কারিগর। বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে আজও সাত্রের এই স্বাধীনচেতা ও দায়িত্বশীল চিন্তাধারা বিশ্বজুড়ে মানব সমাজকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।