- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে সাধারণত যুক্তি ও স্বাধীনতার প্রবক্তা মনে করা হলেও, অনেকেই তাঁকে “স্বৈরতন্ত্রের আধ্যাত্মিক জনক” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাঁর দর্শনের কিছু কঠোর ও আপসহীন দিক পরবর্তীতে স্বৈরতান্ত্রিক আদর্শকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই নিবন্ধে কান্টের চিন্তাধারার সেই বিতর্কিত দিকগুলো সহজ ভাষায় বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
১। কর্তব্যের কঠোরতা: কান্টের নৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো কর্তব্যের জন্য কর্তব্য করা। তিনি মনে করতেন, মানুষের আবেগ বা অনুভূতির কোনো মূল্য নেই, বরং নিয়ম মেনে চলাই প্রধান। এই চরম নিয়ম অনুবর্তিতা পরবর্তীতে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের জন্য একটি হাতিয়ার হয়ে ওঠে। শাসকরা জনগণকে অন্ধভাবে কর্তব্য পালনে বাধ্য করতে এই দর্শন ব্যবহার করে। এর ফলে ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বাধীনতার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়।
২। আইনের অন্ধ আনুগত্য: কান্ট রাষ্ট্রীয় আইনকে সর্বোচ্চ পবিত্র এবং অপরিবর্তনীয় বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, আইন যতই অন্যায় হোক না কেন, নাগরিকরা তা অমান্য করতে পারে না। এই চরম আনুগত্যের দাবি স্বৈরাচারী শাসকদের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী ও নিষ্কণ্টক করে তোলে। জনগণ যখন আইনকে অন্ধভাবে মেনে নেয়, তখন শাসকের পক্ষে অত্যাচারী হওয়া সহজ হয়। এটি মূলত স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তিকে সামাজিকভাবে বৈধতা দেয়।
৩। বিদ্রোহের অধিকার অস্বীকার: কান্ট পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন যে, শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ করার কোনো অধিকার নেই। শাসক যদি চরম অত্যাচারীও হন, তবুও তাঁর বিরুদ্ধে যাওয়া বা বিপ্লব করা পাপ। এই চিন্তাধারা স্বৈরতন্ত্রকে এক ধরনের চিরস্থায়ী সুরক্ষা কবচ বা ঢাল প্রদান করে। এর ফলে শাসকরা কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই যুগের পর যুগ শাসন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। ফলে সমাজে একনায়কতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হয়।
৪। ব্যক্তিস্বার্থের বিসর্জন: কান্টের দর্শনে সামষ্টিক নিয়ম ও কর্তব্যের খাতিরে ব্যক্তিস্বার্থকে বিসর্জন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়মকে ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড় করে দেখিয়েছেন। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ঠিক এই ধারণাকে পুঁজি করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। তারা প্রচার করে যে, রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তির নিজের বলতে কিছু থাকতে নেই। এই মানসিকতা স্বৈরতন্ত্রকে আধ্যাত্মিকভাবে টিকিয়ে রাখে।
৫। চরম যৌক্তিকতা: কান্ট আবেগ, সহানুভূতি বা মানবিক অনুভূতিকে নৈতিকতার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বর্জন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি সবকিছুকে একটি কঠোর গাণিতিক ও যৌক্তিক ফ্রেমে বাঁধতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানবিক আবেগহীন এই চরম যৌক্তিকতা অনেক সময় নিষ্ঠুরতায় রূপ নিতে পারে। স্বৈরাচারী শাসকরাও মানবিক দিক বিবেচনা না করে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা কান্টের এই আবেগহীন যৌক্তিকতার আড়ালে নিজেদের নৃশংসতাকে আড়াল করে।
৬। রাষ্ট্রের পরম ক্ষমতা: কান্টের রাষ্ট্রদর্শনে রাষ্ট্রকে এক ধরনের সর্বোচ্চ ও অলঙ্ঘনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের আদেশ অমান্য করা মানেই হলো সামাজিক শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করা। এই ধারণাটি পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকে একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী করে তোলে, যা স্বৈরতন্ত্রের মূল লক্ষণ। রাষ্ট্র যখন অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন ব্যক্তির অধিকার সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। কান্টের দর্শন এই পরম ক্ষমতাকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দেয়।
৭। শৃঙ্খলার অতিমূল্যায়ন: কান্ট তাঁর ব্যক্তিগত ও দার্শনিক জীবনে শৃঙ্খলাকে সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, কঠোর শৃঙ্খলা ছাড়া মানব সমাজের প্রগতি বা কল্যাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। স্বৈরতান্ত্রিক শাসকরাও এই শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে জনগণের কণ্ঠ রোধ এবং মৌলিক অধিকার হরণ করে। কান্টের এই অতি-শৃঙ্খলার ধারণাটি শেষ পর্যন্ত মুক্ত সমাজকে একটি অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত করতে সহায়তা করে।
৮। নেতার আদেশের পবিত্রতা: কান্টের দর্শনে যে ‘ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ’ বা পরম আদেশের কথা বলা হয়েছে, তা চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের মতো। স্বৈরতন্ত্রে এই পরম আদেশের স্থান নেন স্বয়ং একনায়ক বা দেশের শাসক। শাসকের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটি বাণীকে তখন পবিত্র আদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। জনগণ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই সেই আদেশ পালন করতে বাধ্য থাকে, যা কান্টের দর্শনেরই এক বিকৃত রূপ। এর ফলে সমাজে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
৯। স্বাধীনতার সীমিত সংজ্ঞা: কান্ট স্বাধীনতার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা সাধারণ মানুষের মুক্ত চিন্তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নিজের ইচ্ছামতো চলা নয়, বরং নৈতিক নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা। এই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার ধারণা স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে চমৎকারভাবে মিলে যায়। শাসকরা জনগণকে বোঝায় যে, সরকারের নিয়ম মেনে চলাই হলো আসল স্বাধীনতা। এভাবে স্বাধীনতার মূল অর্থকে বিকৃত করে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১০। ব্যক্তির যান্ত্রিক রূপান্তর: কান্টের কঠোর নিয়মতান্ত্রিক দর্শন মানুষকে এক ধরনের যন্ত্রে পরিণত করার পক্ষে কাজ করে। যেখানে মানুষের নিজস্ব আবেগ, স্বকীয়তা বা ভিন্নমতের কোনো স্থান বা স্বীকৃতি থাকে না। স্বৈরতন্ত্রও ঠিক এমন এক সমাজ চায় যেখানে প্রতিটি নাগরিক যন্ত্রের মতো আদেশ পালন করবে। কান্টের চিন্তাধারা মানুষকে রাষ্ট্রের একটি জড় পুতুলে রূপান্তর করতে তাত্ত্বিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এর ফলে মানুষের সৃজনশীলতা ও মুক্তবুদ্ধি চিরতরে লোপ পায়।
১১। ভিন্নমতের অবদমন: কান্টের দর্শনে সার্বিক নিয়মের বাইরে গিয়ে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে। তিনি মনে করতেন, সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে একই নিয়মের অধীনে চলতে হবে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই তত্ত্বটিকে ভিন্নমত দমনের প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যারা সরকারের সমালোচনা করে, তাদের সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা সহজ হয়। কান্টের এই একমুখী চিন্তা পরোক্ষভাবে একনায়কতন্ত্রকে উৎসাহিত করে।
১২। নৈতিকতার একনায়কত্ব: কান্ট নৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি চরম ও আপসহীন রূপরেখা তৈরি করেছিলেন, যেখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। তাঁর এই নৈতিক একনায়কত্ব রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিতে ভূমিকা রাখে। শাসকরা নিজেদের নীতি ও আদর্শকে একমাত্র সত্য বলে মনে করে এবং তা সবার ওপর চাপিয়ে দেয়। কান্টের এই অনমনীয় মানসিকতা সমাজকে বহুত্ববাদের পরিবর্তে একমুখী ও স্বৈরাচারী ধারার দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে।
১৩। ঐতিহাসিক প্রভাব: পরবর্তীতে হেগেল এবং ফিকটের মতো জার্মান দার্শনিকরা কান্টের রাষ্ট্রীয় ধারণাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে যান। কান্টের দর্শন থেকেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়ে রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের সমকক্ষ এবং পরম শক্তিশালী হিসেবে প্রচার করেন। এই দার্শনিক ধারাটিই বিংশ শতাব্দীতে জার্মানিতে চরম স্বৈরতন্ত্র ও নাৎসিবাদ উত্থানের পটভূমি তৈরি করেছিল। তাই পরোক্ষভাবে কান্টকে এই ভয়ানক রাজনৈতিক পরিণতির আধ্যাত্মিক বা তাত্ত্বিক জনক বলা যুক্তিযুক্ত।
১৪। সমালোচনার পথ বন্ধ: কান্ট যদিও শিক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তির কথা বলেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের ক্ষেত্রে প্রশ্নাতীত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, শাসকের কোনো কাজের সমালোচনা করে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা চরম অন্যায়। স্বৈরাচারী শাসকরা এই তত্ত্বকে পুঁজি করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়। তারা দাবি করে যে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থেই সব ধরনের সমালোচনা বন্ধ রাখা জরুরি।
১৫। আইনসভার অন্ধ সমর্থন: কান্টের রাজনৈতিক দর্শনে আইন প্রণয়নকারী সংস্থাকে এক ধরনের অভ্রান্ত সত্তা হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা রয়েছে। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র যে আইন পাস করে, তা নাগরিকদের মঙ্গলের জন্যই করা হয়। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রে আইনসভাকে রবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক কালো আইন পাস করা হয়। কান্টের এই অন্ধ বিশ্বাস শাসকদের আইনি মোড়কে অত্যাচার করার এক অপূর্ব সুযোগ করে দেয়।
১৬। ব্যক্তির অবমূল্যায়ন: কান্ট তাত্ত্বিকভাবে মানুষকে ‘উদ্দেশ্য’ হিসেবে দেখার কথা বললেও, তাঁর রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তি রাষ্ট্রের অধীনে চাপা পড়ে গেছে। সেখানে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। স্বৈরতন্ত্রে ব্যক্তির জীবনের কোনো মূল্য থাকে না, রাষ্ট্রই সেখানে শেষ কথা। কান্টের দর্শনের এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য স্বৈরাচারী শাসকদের নিজেদের স্বার্থে নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করতে সাহায্য করেছে।
১৭। ভয়ের সংস্কৃতি: কান্টের দর্শনে নিয়ম ভাঙার শাস্তি বা পরিণতির যে কঠোর রূপরেখা রয়েছে, তা মানুষের মনে এক ধরনের ভীতি তৈরি করে। স্বৈরতন্ত্রও মূলত ভয়ের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে এবং শাসনকার্য পরিচালনা করে। নাগরিকরা যখন শাস্তির ভয়ে তটস্থ থাকে, তখন তারা শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। কান্টের অনমনীয় তাত্ত্বিক কাঠামো এই ভয়ের পরিবেশকে পরোক্ষভাবে এক ধরনের দার্শনিক স্বীকৃতি দান করে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ইমানুয়েল কান্ট সরাসরি কোনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমর্থন না করলেও তাঁর দর্শনের কঠোরতা, অবাধ্যতার অস্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রের প্রতি চরম আনুগত্যের দাবি স্বৈরতন্ত্রের জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছিল। তাঁর চিন্তার এই অনমনীয় দিকগুলোই তাঁকে “স্বৈরতন্ত্রের আধ্যাত্মিক জনক” হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তবে সামগ্রিক মূল্যায়নে তাঁর মহৎ দার্শনিক অবদানকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। মূলত স্বৈরাচারী শাসকরা নিজেদের স্বার্থে কান্টের দর্শনের তাত্ত্বিক অপব্যবহার করেছে।