- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলেও শুরু থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ক্ষমতার তীব্র ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রাখা হয়। এই পদ্ধতিগত বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতাই মূলত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
মূল আলোচনা
১। রাজনৈতিক বৈষম্য: পাকিস্তানের শাসনক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর হাতে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা ক্যাবিনেটে বাঙালিদের কোনো কার্যকর ভূমিকা বা প্রতিনিধিত্ব ছিল না, যা বাঙালিদের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
২। ভাষাগত নিপীড়ন: ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত ছিল বাঙালির সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার চক্রান্ত। বাঙালিদের মতামত উপেক্ষা করে এই চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে বাঙালির আবেগের কোনো মূল্য ছিল না, যা প্রথম বড় ফাটল তৈরি করে।
৩। অর্থনৈতিক শোষণ: পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। বাজেট প্রণয়ন এবং সম্পদ বণ্টনের যাবতীয় সিদ্ধান্ত পশ্চিম পাকিস্তানি আমলারা এককভাবে নিতেন, যার ফলে পূর্ব পাকিস্তান ক্রমান্বয়ে একটি অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত হয়।
৪। প্রশাসনিক আধিপত্য: সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা, সচিব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের সিংহভাগই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাঙালিদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হতো না। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নেওয়া সব সিদ্ধান্তই ছিল একপেশে এবং বৈষম্যমূলক।
৫। সামরিক বৈষম্য: পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। নীতি নির্ধারণী সামরিক কমান্ডের প্রায় সব কর্মকর্তা ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি। এই সামরিক একনায়কত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাঙালিদের অনুপস্থিতি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে চরম অরক্ষিত এবং বঞ্চিত করে রেখেছিল।
৬। উন্নয়ন বৈষম্য: দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সিংহভাগ বরাদ্দ পেত পশ্চিম পাকিস্তান। রাস্তাঘাট, কলকারখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ যাবতীয় মেগা প্রকল্প সেখানেই বাস্তবায়িত হতো। পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে কোনো দীর্ঘমেয়াদী বা আন্তরিক পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত তালিকায় কখনোই স্থান পায়নি।
৭। ছয় দফার অবমাননা: ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের স্বাধিকারের দাবিতে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। এটি ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাঙালিদের অংশীদারিত্বের আইনি দাবি। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এটিকে গ্রহণ না করে উল্টো ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে দমনপীড়ন শুরু করে।
৮। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: স্বাধিকারের দাবি দমনের লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাঙালি নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেওয়া হয়। বাঙালিদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে তাদের চিরতরে দূরে রাখতেই এই বিচারিক প্রহসনের আয়োজন করা হয়েছিল।
৯। গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে, যা পাকিস্তানের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয় এবং আইয়ুব সরকারের পতন ঘটায়।
১০। বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়: ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ মারা গেলেও কেন্দ্রীয় সরকার ত্রাণ কার্যে চরম উদাসীনতা দেখায়। এই জাতীয় দুর্যোগের সময়ও সাহায্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্র যে অবহেলা দেখিয়েছিল, তাতে বাঙালিরা বোঝে তারা এ রাষ্ট্রে কতটা পরবাসী।
১১। নির্বাচনী ফলের অবমাননা: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দেশের শাসনভার পাওয়ার ম্যান্ডেট লাভ করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
১২। অধিবেশন স্থগিতকরণ: ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা থাকলেও ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান তা আকস্মিকভাবে স্থগিত করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের মতামত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নেওয়া এই একতরফা সিদ্ধান্ত বাঙালিদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়।
১৩। অসহযোগ আন্দোলন: জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত সিদ্ধান্ত অকার্যকর করে পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার তখন কার্যত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে পরিচালিত হতে থাকে, যা ছিল চূড়ান্ত প্রতিরোধ।
১৪। সাতই মার্চের ভাষণ: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে মুক্তির ডাক দেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব পথ যখন পাকিস্তানিরা বন্ধ করে দেয়, তখন এই ভাষণ বাঙালিদের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে এবং নিজেদের ভাগ্য নিজে নির্ধারণের দিকনির্দেশনা দেয়।
১৫। আলোচনার ভণ্ডামি: ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টো ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার নাটক করেন। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সময় খ্যাপন করা এবং পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য আনা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনো আন্তরিক ইচ্ছা পাকিস্তানিদের ছিল না, যা বাঙালিদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
১৬। অপারেশন সার্চলাইট: ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে। আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তই মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির আনুষ্ঠানিক মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয়।
১৭। স্বাধীনতার ঘোষণা: ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল বাঙালিদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তানি শৃঙ্খল ভেঙে নিজেদের সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের এই অদম্য সিদ্ধান্তই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও মুক্ত বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার যে পরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত আত্মঘাতী ছিল। একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ক্ষমতার বাইরে রেখে রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এই কাঠামোগত বৈষম্য ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের অভাবই শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ভাঙন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে তুলেছিল।