- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত ও ভয়াবহ অধ্যায় হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী এই যুদ্ধ পুরো পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী লালসা, অর্থনৈতিক সংকট এবং পূর্ববর্তী চুক্তির অসমতা এই যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করে, যা কোটি কোটি মানুষের প্রাণহানি ও বিশ্ব রাজনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল:-
১। ভার্সাই চুক্তি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে জার্মানির ওপর অন্যায়ভাবে ভার্সাই চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানিকে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয় এবং তাদের সামরিক শক্তি খর্ব করা হয়। চরম অপমান ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জার্মান জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম হয়। এই ক্ষোভই পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
২। হিটলারের উত্থান: ভার্সাই চুক্তির অপমানকে পুঁজি করে জার্মানিতে এডলফ হিটলার ও তার নাৎসি পার্টির উত্থান ঘটে। হিটলার জার্মানদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই আগ্রাসী মনোভাব ও বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা পৃথিবীকে আরেকটি মহাযুদ্ধের দিকে দ্রুত ঠেলে দিয়েছিল।
৩। ফ্যাসীবাদের বিকাশ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছিল। মুসোলিনিও হিটলারের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক শক্তির জোরে সাম্রাজ্য বিস্তারে বিশ্বাসী ছিলেন। ইতালি ও জার্মানির এই একনায়কতান্ত্রিক জোট বিশ্বশান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এই যৌথ আগ্রাসী নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথকে সম্পূর্ণ সুগম করে তুলেছিল।
৪। লিগ অব নেশনের ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিগ অব নেশনস বা জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়েছিল। কিন্তু শক্তিশালী দেশগুলোর আগ্রাসন থামাতে এই সংস্থাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ইতালি যখন আবিসিনিয়া এবং জাপান যখন মাঞ্চুরিয়া দখল করে, তখন জাতিপুঞ্জ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এই দুর্বলতা দেখে একনায়কেরা আরও বেশি যুদ্ধমুখী ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।
৫। অক্ষশক্তি গঠন: বিশ্বজুড়ে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করার লক্ষ্যে জার্মানি, ইতালি ও জাপান একটি জোট গঠন করে। ইতিহাসে এই জোটটি ‘রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সামরিক চুক্তিটি বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য একটি বিশাল বড় সংকেত ছিল। এই অক্ষশক্তি গঠনের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মেরুকরণ ঘটে এবং যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
৬। তুষ্টি নীতি: ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো পরাশক্তিগুলো হিটলারের প্রাথমিক আগ্রাসনকে উপেক্ষা করে ‘তুষ্টি নীতি’ গ্রহণ করেছিল। তারা ভেবেছিল হিটলারকে কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিলে হয়তো আরেকটি বড় যুদ্ধ এড়ানো যাবে। কিন্তু এই নীতি হিটলারের আকাঙ্ক্ষাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পশ্চিমা শক্তির এই দুর্বল ও আপোসমুখী নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে সাহায্য করেছিল।
৭। জাপানের সাম্রাজ্যবাদ: এশিয়া মহাদেশে নিজেদের একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য জাপান চরম সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেছিল। তারা ১৯৩১ সালে চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে এবং পরবর্তীতে পুরো চীনে আক্রমণ চালায়। জাপানের এই উগ্র সামরিকবাদ ও এশীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা বিশ্ব পরিস্থিতিকে চরম উত্তপ্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তাদের এই নীতি অক্ষশক্তিকে আরও শক্তিশালী ও হিংস্র করে তোলে।
৮। পোল্যান্ড আক্রমণ: ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের জার্মানি আকস্মিকভাবে পোল্যান্ড আক্রমণ করে বসে। এই ঘটনার পরপরই ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পোল্যান্ডের ওপর এই বর্বর আক্রমণের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটেছিল। এটিই ছিল এই রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও সবচেয়ে প্রধান কারণ।
৯। ধনতান্ত্রিক দ্বন্দ্ব: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বাজার দখল নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। জার্মানি, ইতালি এবং জাপান তাদের উৎপাদিত পণ্যের জন্য নতুন উপনিবেশ ও বাজার খুঁজছিল। কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্সের দখলে ইতিমধ্যেই বিশ্বের সিংহভাগ বাজার ছিল। এই অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব ও উপনিবেশিক প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
১০। ব্যাপক প্রাণহানি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ ফলাফল ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রাণহানি। এই যুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে প্রায় সাত থেকে আট কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় এবং বহু পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। মানব ইতিহাসের আর কোনো যুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটেনি।
১১। অর্থনৈতিক বিপর্যয়: যুদ্ধের কারণে সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। ইউরোপ ও এশিয়ার হাজার হাজার শহর, কলকারখানা, রাস্তাঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে তীব্র খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং দারিদ্র্য এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে দেশগুলোকে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়েছিল।
১২। হিটলারের পতন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয়ের সাথে সাথে নাৎসি জার্মানির একনায়ক এডলফ হিটলারের পতন ঘটে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিন দখল করলে হিটলার আত্মহত্যা করেন। এর ফলে জার্মানিতে নাৎসিবাদের অবসান ঘটে এবং ফ্যাসিবাদের কালো অধ্যায় সমাপ্ত হয়। হিটলারের এই পতন বিশ্বের স্বৈরশাসকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা ছিল।
১৩। পারমাণবিক যুগ: এই যুদ্ধের শেষের দিকে বিশ্ববাসী এক নতুন ও ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের সাথে পরিচিত হয়। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এই হামলায় মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষ মারা যায় এবং শহর দুটি মাটির সাথে মিশে যায়। এর মাধ্যমেই পৃথিবীতে এক বিপজ্জনক পারমাণবিক যুগের সূচনা ঘটে।
১৪। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা: লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ বা ‘ইউনাইটেড নেশনস’ গঠিত হয়। বিশ্বকে তৃতীয় আরেকটি মহাযুদ্ধ থেকে রক্ষা করা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। এটি যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়। আজ পর্যন্ত এই সংস্থাটি বিশ্বশান্তি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
১৫। শীতল যুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, যা ‘শীতল যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। যুদ্ধ জয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দুই দেশের আদর্শগত ভিন্নতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই বিশ্বকে দীর্ঘকাল উত্তপ্ত করে রেখেছিল। ফলে পৃথিবী পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক—এই দুই ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
১৬। উপনিবেশবাদের অবসান: যুদ্ধের পর ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে তাদের দীর্ঘদিনের উপনিবেশগুলো ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ বহু দেশ একে একে স্বাধীনতা লাভ করতে শুরু করে। এই যুদ্ধ পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে উপনিবেশবাদের অবসান ঘটিয়েছিল।
১৭। জার্মানি বিভাজন: যুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো জার্মানিকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। দেশটির রাজধানী বার্লিনসহ সমগ্র জার্মানিকে চার ভাগে বিভক্ত করে শাসন করা শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানি—এই দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ নেয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে এই বিভাজন ইউরোপের রাজনীতিতে এক বিরাট ক্ষত হিসেবে বিদ্যমান ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক গভীর ও বেদনাদায়ক ক্ষত। উগ্র জাতীয়তাবাদ, একনায়কতন্ত্র এবং পরমতসহিষ্ণুতার অভাব কীভাবে পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারে, এই যুদ্ধ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে এই যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম নিয়েছে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক নতুন মানসিকতা। বর্তমান প্রজন্মের উচিত এই যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি যুদ্ধমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলা।