- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি হলেও, এখানে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকে তরান্বিত করতে হলে এই সুশাসনের প্রধান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং তা সমাধান করা আবশ্যক।
১। দুর্নীতির বিস্তার: বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। সমাজের উচ্চস্তর থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ও সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করছে। ৪-৫ লাইনের এই সমস্যায় জনগণের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
২। রাজনৈতিক অস্থিরতা: রাজনৈতিক অঙ্গনে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং অস্থিরতা সুশাসনের পথকে সংকীর্ণ করে তোলে। ঘন ঘন হরতাল, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে দেশের স্বাভাবিক গতি থমকে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতির ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে চরমভাবে নিরুৎসাহিত বোধ করেন।
৩। আইনের শাসনের অভাব: আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি দেশে প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই আইনের শাসনের দুর্বলতা বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। প্রভাবশালী ও অর্থবান ব্যক্তিরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যান, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি সমাজে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি করে এবং সুশাসনের ভিত্তি দুর্বল করে।
৪। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: সরকারি দপ্তরগুলোতে অতিরিক্ত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নাগরিক সেবা প্রাপ্তিকে কঠিন করে তোলে। একটি সাধারণ কাজের জন্য জনগণকে মাসের পর মাস বিভিন্ন টেবিলে ঘুরতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারি কাজের গতিশীলতা হ্রাস পায় এবং মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আমলাতন্ত্রের এই জবাবদিহিহীনতা সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
৫। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতার ওপর একটি দেশের সুশাসন বহুলাংশে নির্ভর করে। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন বা নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জনগণের আস্থা কমে যায়। শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব সুশাসনকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে।
৬। তথ্যের অপর্যাপ্ততা: যদিও তথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে, তবুও সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া এখনো বেশ কঠিন। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও তথ্য জনগণের আড়ালে থেকে যায়। তথ্যের এই গোপনীয়তা বা অপ্রাপ্যতা দুর্নীতি ও অনিয়মকে আরও বেশি উৎসাহিত করে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত না হলে কোনো সমাজেই স্বচ্ছতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
৭। স্বচ্ছতার অভাব: সরকারি ও বেসরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজের স্বচ্ছতার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়। বাজেট প্রণয়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের জানার সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। এই ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিবেশের কারণে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।
৮। জবাবদিহিতার ঘাটতি: প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মানসিকতা খুব একটা দেখা যায় না। ক্ষমতার অপব্যবহার বা দায়িত্বহীনতার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন কেউ তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে না, তখন সেখানে সুশাসন ভেঙে পড়ে। জবাবদিহিতাহীন এই সংস্কৃতি উন্নয়নশীল দেশের অন্যতম প্রধান একটি প্রশাসনিক সংকট।
৯। দারিদ্র্যের প্রভাব: সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী বাধা হিসেবে কাজ করে। দরিদ্র মানুষেরা প্রায়শই তাদের মৌলিক ও আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন বা সোচ্চার হতে পারেন না। জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই তারা ব্যস্ত থাকেন, ফলে সুশাসনের দাবিতে আন্দোলন বা সচেতনতা তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই সুযোগে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের অধিকার হরণ করে।
১০। অশিক্ষার হার: দেশের একটি বড় অংশ এখনো মানসম্মত শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত অথবা অসচেতন। অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত নাগরিকরা তাদের নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। এর ফলে তারা সুশাসনের দাবিতে সোচ্চার হতে পারেন না এবং অন্যায়কে সহজে মেনে নেন। শিক্ষা ও সচেতনতার এই অভাব দেশে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথকে দীর্ঘায়িত করছে।
১১। বিচার বিভাগের ধীরগতি: বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মামলাজটের কারণে সাধারণ মানুষ সময়মতো এবং ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। একটি মামলার রায় হতে বছরের পর বছর লেগে যাওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের পার পেয়ে যেতে এবং নতুন অপরাধ করতে উৎসাহিত করে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার না পেলে সমাজে সুশাসনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
১২। মানবাধিকার লঙ্ঘন: সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক ও মানবাধিকারের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নিখোঁজ হওয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি সুশাসনের ধারণাকে ক্ষুণ্ণ করে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলে। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সুশাসনের কোনো মূল্য থাকে না।
১৩। স্বাধীন গণমাধ্যমের বাধা: গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যা সুশাসন রক্ষায় পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নানা ধরনের আইনি ও পরোক্ষ চাপের কারণে গণমাধ্যম অনেক সময় স্বাধীনভাবে সত্য প্রকাশ করতে পারে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ বিঘ্নিত হলে দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকা পড়ে যায়। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।
১৪। স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা: ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা পরিষদগুলো প্রয়োজনীয় তহবিল এবং স্বায়ত্তশাসনের অভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন এবং জনগণের সমস্যা সমাধান করতে কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন পৌঁছানো সম্ভব নয়।
১৫। অর্থনৈতিক বৈষম্য: দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দিন দিন প্রকট হচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ায় সামাজিক ন্যায়বিচার ব্যাহত হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক অসমতা সমাজে এক ধরনের অসন্তোষ ও অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে, যা সুশাসনের পরিপন্থী। সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সম্পদের সুষম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক সমতা আনা অত্যন্ত জরুরি।
১৬। সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি: বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাইবার অপরাধ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার সুশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর্থিক খাতের জালিয়াতি, গুজব ছড়ানো এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা হরণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই আধুনিক অপরাধগুলো দমন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে ডিজিটাল সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হবে।
১৭। স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ: চাকুরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়। এই দলীয়করণের ফলে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিরা উপযুক্ত স্থান থেকে বঞ্চিত হন, যা প্রশাসনের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি সুশাসনের ধারণাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার জন্য সুশাসনের অভাব একটি বড় অন্তরায়। দুর্নীতি দূরীকরণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা বজায় রাখার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয় সচেতনতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাধাগুলো দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলেই বাংলাদেশ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।