- readaim.com
- 0
উত্তর::উপক্রমণিকা: নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলী (Niccolò Machiavelli) ছিলেন ইতালীয় রেনেসাঁর একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দার্শনিক ও কূটনীতিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং মানব প্রকৃতি সম্পর্কিত ধারণাগুলি অত্যন্ত বাস্তববাদী ও কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ছিল। ম্যাকিয়াভেলীর মতে, মানব প্রকৃতি মূলত স্বার্থপর, অবিশ্বস্ত এবং ক্ষমতা-লোভী। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’ (The Prince)-এ তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানব প্রকৃতির এই দিকগুলিকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শাসককে অবশ্যই এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে, কারণ আদর্শবাদ দিয়ে মানব সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
১. মানুষের মৌলিক স্বার্থপরতা: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন যে মানব প্রকৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার মৌলিক স্বার্থপরতা। প্রতিটি মানুষই নিজের ব্যক্তিগত লাভ ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করে। তারা অন্যের ভালো-মন্দ নিয়ে খুব বেশি ভাবে না, যদি না তাতে তাদের নিজেদের কোনো সুবিধা থাকে। এই স্বার্থপরতাই মানুষের সব কাজের মূল চালিকাশক্তি। তিনি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে শাসককে উপদেশ দেন যে জনগণের ভালোবাসার চেয়ে ভয় বেশি কার্যকর, কারণ ভালোবাসা পরিবর্তনশীল হলেও ভয় স্থায়ী। শাসকের দুর্বলতা দেখালে জনগণ তাকে সহজেই পরিত্যাগ করতে পারে।
২. অবিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসঘাতকতা: ম্যাকিয়াভেলীর মতে, মানুষ স্বভাবতই অবিশ্বস্ত এবং বিশ্বাসঘাতক। যখনই সুযোগ আসে, মানুষ সহজেই তার আনুগত্য ও প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলে। তারা কেবল তখনই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে যখন তাদের তাতে নিজস্ব স্বার্থ থাকে। এই কারণেই ম্যাকিয়াভেলী একজন শাসককে পরামর্শ দেন যে তাকে সব সময় জনগণের অবিশ্বস্ততার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। শাসককে প্রয়োজনে কৌশল অবলম্বন করতে হবে এবং প্রতিশ্রুতি ভাঙতেও দ্বিধা করা যাবে না, কারণ তার নিজের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এর উপর নির্ভর করে।
৩. ক্ষমতা ও লোভের আকাঙ্ক্ষা: মানব প্রকৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতা ও সম্পদ লাভের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। মানুষ সব সময় আরও বেশি ক্ষমতা, মর্যাদা ও সম্পদ চায়। এই লোভই সমাজে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। ম্যাকিয়াভেলী বলেন যে এই লোভকে নিয়ন্ত্রণ করা একজন শাসকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শাসককে এই লোভকে ব্যবহার করে বা কঠোর হাতে দমন করে রাষ্ট্রকে সুশৃঙ্খল রাখতে হয়। একজন দক্ষ শাসককে তাই জনগণের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে হয়।
৪. ভয় ও ভালবাসার মধ্যে পার্থক্য: ম্যাকিয়াভেলীর দর্শন অনুযায়ী, শাসককে জনগণের ভালোবাসা এবং ভয় এই দুটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হলে ভয়কে বেছে নেওয়া উচিত। ভালোবাসা পরিবর্তনশীল এবং এটি সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু ভয় মানুষের মনে স্থায়ী হয়। মানুষ ভালোবাসার কারণে আনুগত্য হারাতে পারে, কিন্তু শাস্তির ভয়ে তারা সহজে অবাধ্য হয় না। একজন শাসককে এমনভাবে শাসন করতে হবে যাতে মানুষ তাকে ভয় পায় কিন্তু ঘৃণা না করে। কারণ ঘৃণা থেকে বিদ্রোহের জন্ম হতে পারে, যা শাসকের জন্য বিপজ্জনক।
৫. ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারের প্রয়োজনীয়তা: ম্যাকিয়াভেলীর মতে, একজন শাসককে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিতে হতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নীতি ও সততার কঠোর অনুসরণ সব সময় রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারে না। যখন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তখন শাসককে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়েও কাজ করতে হয়। তিনি একজন শাসককে শিয়ালের মতো ধূর্ত ও সিংহের মতো শক্তিশালী হতে বলেছিলেন, যেখানে ধূর্ততা প্রয়োজন হয় ছলনা ও কৌশল প্রয়োগের জন্য।
৬. মানুষের কৃতজ্ঞতার অভাব: ম্যাকিয়াভেলীর মতে, মানুষ সাধারণত কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অনাগ্রহী। যখন তাদের বিপদ কেটে যায়, তখন তারা সহজেই উপকারকারীর কথা ভুলে যায়। একজন শাসক যদি তার প্রজাদের জন্য ভালো কিছু করেন, তবে তারা যখন আবার নিরাপদে থাকে, তখন সেই উপকারের কথা ভুলে যায় এবং আরও বেশি কিছু পাওয়ার আশা করে। এই কারণে শাসককে সব সময় জনগণের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজের ক্ষমতা ও শক্তিকে সুদৃঢ় করতে হয়।
৭. পরিবর্তনশীল এবং অস্থির মানব মন: ম্যাকিয়াভেলী মনে করতেন যে মানব মন অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং অস্থির। আজ যারা একজন শাসককে সমর্থন করছে, কাল তারাই আবার অন্য কাউকে সমর্থন করতে পারে। জনগণের মতামত ও আনুগত্য আবহাওয়ার মতো পরিবর্তন হয়। এই কারণে একজন শাসককে জনগণের উপর পুরোপুরি বিশ্বাস না করে নিজের সামরিক শক্তি এবং কৌশলগত ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হয়। জনগণের অস্থিরতা সামাল দিতে শাসকের কঠোরতা ও কৌশলী হওয়া প্রয়োজন।
৮. জনগণের বিচারহীনতা ও দুর্বলতা: ম্যাকিয়াভেলীর মতে, সাধারণ মানুষ সাধারণত বিচারহীন এবং দুর্বল মনের হয়। তারা বেশিরভাগ সময়ই বাহ্যিক চাকচিক্য ও ক্ষমতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা সহজে প্রতারিত হয় এবং সঠিক-ভুল বিচার করার ক্ষমতা তাদের কম থাকে। এই দুর্বলতা একজন দক্ষ শাসককে তার ক্ষমতা সুসংহত করতে সাহায্য করে। শাসককে তাই এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয় যাতে জনগণ তাকে একজন শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে দেখে।
৯. মানুষের অসীম আকাঙ্ক্ষা ও অসন্তোষ: ম্যাকিয়াভেলী বলেছেন যে মানুষের আকাঙ্ক্ষা অসীম, কিন্তু তাদের প্রাপ্তি সীমিত। এই অসীম আকাঙ্ক্ষাই মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্থায়ী অসন্তোষ সৃষ্টি করে। যখন মানুষ কিছু পায়, তখন তারা আরও বেশি কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে। এই অসন্তোষ সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। একজন শাসককে এই অসন্তোষকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে হয়, যাতে তা বিদ্রোহে পরিণত না হয়। শাসককে জনগণের এই চাহিদাগুলিকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
১০. মানব প্রকৃতির নৈতিক নিরপেক্ষতা: ম্যাকিয়াভেলী মানব প্রকৃতিকে কোনো নৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করেননি। তিনি মানব প্রকৃতিকে যেমনটা আছে, সেভাবেই দেখেছেন, ভালো বা খারাপ হিসেবে নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই নৈতিক নিরপেক্ষতাই একজন শাসককে তার দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে। একজন শাসককে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হয়। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার মূল ভিত্তি ছিল।
উপসংহার: ম্যাকিয়াভেলীর মানব প্রকৃতি সম্পর্কিত ধারণাগুলি অত্যন্ত বাস্তববাদী, কিন্তু একই সাথে কঠোর ও নির্মম। তিনি মানব জাতিকে স্বার্থপর, লোভী, অকৃতজ্ঞ এবং পরিবর্তনশীল হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, একজন শাসককে জনগণের এই দুর্বলতাগুলিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। ম্যাকিয়াভেলীর এই ধারণাগুলি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনে আজও আলোচনার বিষয়। তাঁর দর্শন একদিকে যেমন ক্ষমতা ও বাস্তবতার গুরুত্ব তুলে ধরে, তেমনি অন্যদিকে নৈতিকতার প্রশ্নও উত্থাপন করে। তাঁর চিন্তাভাবনা আধুনিক রাজনীতিতে ক্ষমতা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্বে একটি চিরন্তন প্রশ্ন হিসেবে আজও বিদ্যমান।
◆ মানুষের মৌলিক স্বার্থপরতা ◆ অবিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসঘাতকতা ◆ ক্ষমতা ও লোভের আকাঙ্ক্ষা ◆ ভয় ও ভালবাসার মধ্যে পার্থক্য ◆ ভণ্ডামি ও মিথ্যাচারের প্রয়োজনীয়তা ◆ মানুষের কৃতজ্ঞতার অভাব ◆ পরিবর্তনশীল এবং অস্থির মানব মন ◆ জনগণের বিচারহীনতা ও দুর্বলতা ◆ মানুষের অসীম আকাঙ্ক্ষা ও অসন্তোষ ◆ মানব প্রকৃতির নৈতিক নিরপেক্ষতা
ম্যাকিয়াভেলীর রাজনৈতিক ভাবনা ১৫১৩ সালে রচিত ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে ১৫৩২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। সেই সময় ইতালিতে রাজনৈতিক বিভাজন ও যুদ্ধ চলছিল। ম্যাকিয়াভেলী রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে শক্তিশালী শাসকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, শাসককে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে, যা তৎকালীন রেনেসাঁ যুগের মানবতাবাদী দর্শনের পরিপন্থী ছিল।

