- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হলো তার সংবিধান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই নীতিগুলো কেবল আইনি দলিল নয়, বরং একটি শোষণমুক্ত, সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি এবং বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল ও স্বপ্নের প্রতিফলন।
রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহ:
১। জাতীয়তাবাদ: বাঙালি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সংগ্রামের ঐক্যবদ্ধ চেতনাকে ভিত্তি করে এই নীতিটি গঠিত হয়েছে। এটি মূলত আমাদের জাতীয় সংহতির মূল উৎস হিসেবে কাজ করে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের নাগরিকদের মধ্যে একতা এবং দেশপ্রেমের গভীর অনুভূতি জাগ্রত রাখা। ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে একাত্মতার চেতনা টিকিয়ে রাখাই এর লক্ষ্য।
২। সমাজতন্ত্র: দেশের সকল নাগরিকের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রকে মূলনীতি করা হয়েছে। এর মূল কথা হলো মানুষের ওপর মানুষের সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করা। একটি ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র এই নীতি বাস্তবায়নে কাজ করে। এর মাধ্যমে সম্পদ বণ্টন এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে।
৩। গণতন্ত্র: রাষ্ট্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার হলো কার্যকর গণতন্ত্র। এই নীতির মাধ্যমে প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার এবং মানবমর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়ার মূল ভিত্তি হলো এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটি নাগরিকের ভোটের অধিকার এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের সুযোগকে সুরক্ষিত রাখে।
৪। ধর্মনিরপেক্ষতা: ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মের নামে রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য। প্রতিটি নাগরিক যেন নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে পালন করতে পারেন, রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সুযোগ এখানে নেই। এটি সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
৫। মৌলিক প্রয়োজনীয়তা: নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। প্রতিটি নাগরিক যেন সমাজে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে পারে, তার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে এই সুযোগ-সুবিধাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার সংবিধানে রয়েছে। এটি জনগণের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত উন্নত করার একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি।
৬। কৃষক ও শ্রমিক: সমাজের সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং উৎপাদনশীল শ্রেণী হলো দেশের সাধারণ কৃষক ও মেহনতি শ্রমিক সমাজ। সংবিধানে এই অনগ্রসর ও শ্রমজীবী মানুষকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাদের অধিকার রক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে রাষ্ট্র সর্বদা বিশেষ দৃষ্টি ও সহায়তা প্রদান করবে। মেহনতি মানুষের শ্রমের সঠিক মূল্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
৭। বাধ্যতামূলক শিক্ষা: দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। নিরক্ষরতা দূর করে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও দক্ষ সমাজ গঠন করার লক্ষ্যে এই নীতিটি প্রণীত হয়েছে। সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে শিক্ষার আলো সমভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র কাজ করে। শিক্ষার এই প্রসার দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
৮। জনস্বাস্থ্য: নাগরিকদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি সাধন এবং পুষ্টির স্তর উন্নত করাকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য মনে করে। মদ্যপান ও ক্ষতিকর মাদকের ব্যবহার বন্ধে রাষ্ট্র আইনগতভাবে কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। গ্রামীণ ও শহরের সকল মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা এই নীতির মূল লক্ষ্য। জনস্বাস্থ্যের এই উন্নয়ন দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ গঠনে সরাসরি ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
৯। সুযোগের সমতা: দেশের সকল নাগরিকের জন্য আইনের দৃষ্টিতে সমান সুযোগ এবং অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক আচরণ করবে না। সরকারি নিয়োগ বা অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে সমতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা দূর করার প্রচেষ্টা চালানো হয়।
১০। কর্মের অধিকার: প্রত্যেক নাগরিকের যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজ পাওয়ার এবং পারিশ্রমিক লাভের অধিকার রয়েছে। কর্মকে নাগরিকের অধিকার এবং মর্যাদার প্রতীক হিসেবে সংবিধানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। বেকারত্ব দূরীকরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের অন্যতম একটি প্রধান অর্থনৈতিক লক্ষ্য। কাজ করার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখার সুযোগ লাভ করে।
১১। অবকাশের অধিকার: নাগরিকদের কর্মের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশ যাপনের অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করে মানুষের উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে এই নীতি সহায়তা করে। রাষ্ট্র শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ছুটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়। এটি নাগরিকের সুস্বাস্থ্য এবং মানসিক বিকাশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নীতি।
১২। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য: বাঙালি জাতির হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র সমানভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। জাতীয় জীবনে সাংস্কৃতিক চেতনার প্রসার ঘটিয়ে সুস্থ ধারার বিনোদন চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
১৩। পরিবেশ সংরক্ষণ: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে বাঁচানো এই নীতির লক্ষ্য। নদী, নালা, বনভূমি ও জলাশয় রক্ষায় রাষ্ট্র কঠোর ও কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করে। একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলাই এই পরিবেশ নীতির মূল উদ্দেশ্য।
১৪। আন্তর্জাতিক শান্তি: বিশ্ব শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সর্বদা একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। সংবিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সকল দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা আমাদের নীতি। এই নীতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৫। জাতীয় সংহতি: দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করার জন্য জাতীয় সংহতি রক্ষা করা অপরিহার্য। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখতে রাষ্ট্র সর্বদা সচেষ্ট থাকে। কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিভেদ যেন দেশের শান্তি ও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখা হয়। এই সুদৃঢ় ঐক্যই একটি শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনের মূল চালিকাশক্তি।
১৬। উপজাতীয় সংস্কৃতি: বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠীর অনন্য ঐতিহ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও রীতিনীতির বিকাশ ও সংরক্ষণে রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীকে দেশের মূল ধারার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে শামিল করার নীতি রয়েছে। এটি রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে।
১৭। আইনের শাসন: আইনের চোখে সবাই সমান এবং প্রত্যেকেই আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী, এটিই আইনের শাসনের মূল কথা। কোনো নাগরিককে আইনবহির্ভূতভাবে তার জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্য এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই নীতিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্র পরিচালনার এই মূলনীতিগুলো একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্দেশ করে। এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। এই নীতিসমূহ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই আদর্শগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে পারে।