- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অনন্য দলিল হলো মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে এই অধিকারগুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এগুলো কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং জনগণের মৌলিক মানবিক মর্যাদা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার রাষ্ট্রীয় ও আইনি গ্যারান্টি।
মৌলিক অধিকারসমূহের বিস্তারিত আলোচনা
১। আইন মেনে চলা: সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার রয়েছে। আইন বহির্ভূত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না যা মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার ক্ষতি করে। এটি মূলত ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করে।
২। আইনের দৃষ্টিতে সমতা: অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং প্রত্যেকেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থান নির্বাহে কোনো বৈষম্য করা হয় না। রাষ্ট্র সবার জন্য সমান সুযোগ এবং আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ বাধ্য।
৩। বৈষম্যহীনতা: ২৮ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করতে নিষেধ করে। সরকারি বা জনসাধারণের যেকোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ থাকবে। তবে নারী, শিশু বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ বিধান করতে পারবে।
৪। সরকারি নিয়োগের সমতা: ২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে বা চাকরিতে নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ থাকবে। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানের কারণে কেউ অযোগ্য হবেন না। তবে নাগরিকদের অনগ্রসর অংশের জন্য রাষ্ট্র কোটা বা বিশেষ সুবিধা প্রদানের আইন প্রণয়ন করতে পারবে।
৫। উপাধি বিলোপ: সংবিধানে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া কোনো নাগরিক বিদেশী কোনো রাষ্ট্র থেকে কোনো উপাধি গ্রহণ করতে পারবেন না। এটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম সামাজিক ভেদাভেদ তৈরি রোধ করতে সাহায্য করে। এই নিয়মটি মূলত সমতার নীতিকে আরও বেশি সুদৃঢ় করে তোলে।
৬। জীবন ধারণের অধিকার: ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে তাঁর জীবন বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। প্রত্যেক নাগরিকের বেঁচে থাকার এবং নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা উপভোগ করার প্রাকৃতিক ও মৌলিক অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের এই জীবন রক্ষার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
৭। গ্রেফতার থেকে সুরক্ষা: ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে কেন গ্রেফতার করা হলো তা না জানিয়ে কাস্টডিতে রাখা যাবে না। গ্রেফতারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করতে হবে। আদালতের আদেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে।
৮। জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ: দেশের ৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব ধরনের জবরদস্তিমূলক শ্রম বা বেগার খাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘন করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে বা জনগণের বাধ্যতামূলক দেশসেবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
৯। চলাফেরার স্বাধীনতা: ৩৬ অনুচ্ছেদ দেশের প্রত্যেক নাগরিককে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধে চলাফেরা, বসবাস এবং দেশ ত্যাগ ও পুনরায় প্রবেশের অধিকার দিয়েছে। জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে নাগরিকগণ এই স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন। দেশের অভ্যন্তরে কোথাও যাতায়াতে রাষ্ট্র অযথা কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।
১০। সমাবেশের স্বাধীনতা: ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে এবং অস্ত্র ছাড়া সমবেত হওয়ার ও জনসভা করার অধিকার রয়েছে। জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে এই অধিকার ভোগ করা যাবে। এটি মূলত গণতান্ত্রিক চেতনা ও রাজনৈতিক চর্চাকে অনেক বেশি বেগবান ও মজবুত করে তোলে।
১১। সংগঠন করার স্বাধীনতা: ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের নাগরিকগণের যেকোনো সমিতি, ইউনিয়ন বা রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। তবে জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা বা দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ মানতে হবে। দেশের আইনবিরোধী বা সন্ত্রাসী কোনো সংগঠন বা সমিতি গঠন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১২। পেশার স্বাধীনতা: ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যোগ্যতাসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকের আইনসঙ্গত যেকোনো পেশা, বৃত্তি, ব্যবসা বা বাণিজ্যের অধিকার থাকবে। রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে তাঁর পছন্দসই বৈধ পেশা গ্রহণে বাধা দিতে পারবে না। তবে কোনো পেশার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত বা কারিগরি যোগ্যতা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
১৩। ধর্মীয় স্বাধীনতা: ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন ও প্রচার করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার থাকবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীকে তাঁর নিজস্ব ধর্মীয় শিক্ষার বাইরে অন্য কোনো শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য করা যাবে না।
১৪। সম্পত্তির অধিকার: ৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের আইনানুযায়ী সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর বা অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করার অধিকার থাকবে। আইনের কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে রাষ্ট্র গ্রহণ বা বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না। রাষ্ট্র যদি কোনো সম্পত্তি জনস্বার্থে গ্রহণ করে, তবে তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে।
১৫। গৃহ ও যোগাযোগের অধিকার: ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ গৃহে প্রবেশ ও নিরাপত্তার অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করে। চিঠিপত্র ও যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমের গোপনীয়তা রক্ষা করার নিশ্চয়তাও এই অনুচ্ছেদে দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনানুযায়ী এতে যুক্তিসঙ্গত ও পরিমিত বাধা-নিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।
১৬। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা: ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাক-স্বাধীনতা, ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে। তবে দেশের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং নৈতিকতার স্বার্থে এতে কিছু যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ থাকবে।
১৭। মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ: ৪৪ অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি মৌলিক অধিকারগুলো আদালতে গিয়ে কার্যকর বা বলবৎ করার অধিকার দেয়। যদি কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তবে তিনি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়ের করতে পারেন। আদালত তখন লঙ্ঘিত মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ বা আদেশ জারি করেন।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের সংবিধানে সন্নিবেশিত মৌলিক অধিকারগুলো নাগরিকদের সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের মূল ভিত্তি। এগুলো শুধু কাগজের কথা নয়, বরং জনগণের গণতান্ত্রিক ও মানবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমেই এই অধিকারগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণে এই অধিকারগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।