- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আদিম যুগ থেকে মানুষ ক্রমশ পরিবর্তন ও উন্নতির দিকে এগিয়েছে। এই অগ্রগতির যাত্রাপথেই জন্ম নিয়েছে আধুনিকীকরণ। এটি কেবল প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, বরং জীবনযাত্রার মান, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতার একটি সামগ্রিক রূপান্তর। আধুনিকীকরণ মানুষকে প্রথাগত জীবনের সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে এনে এক নতুন, উন্নত এবং যুক্তিবাদী সমাজের পথে পরিচালিত করে।
আধুনিকীকরণ শব্দটি এসেছে ইংরেজী “Modernization” থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো ‘আধুনিক করে তোলা’ বা ‘আধুনিক রূপান্তর’।
আধুনিকীকরণ একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া যা একটি সমাজকে প্রথাগত অবস্থা থেকে উন্নত ও শিল্পোন্নত অবস্থায় নিয়ে আসে। এটি সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিসহ জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পায়ন, নগরায়ন, উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ। এই প্রক্রিয়া পুরনো রীতিনীতি, চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে একটি নতুন, যুক্তিযুক্ত এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করে।
১. উইলিয়াম এফ. অগবার্ন (W. F. Ogburn): তাঁর মতে, আধুনিকীকরণ হলো একটি সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া যেখানে বস্তুগত সংস্কৃতির পরিবর্তন অবস্তুগত সংস্কৃতির পরিবর্তনের চেয়ে দ্রুত হয়, যা সাংস্কৃতিক ব্যবধান (Cultural lag) তৈরি করে।
২. গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড (Gabriel Almond): তিনি আধুনিকীকরণকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা একটি প্রথাগত রাজনৈতিক কাঠামোকে আধুনিক ও সক্ষম কাঠামোতে রূপান্তরিত করে।
৩. স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): তিনি আধুনিকীকরণকে একটি বৈপ্লবিক ও জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে প্রথাগত, কৃষিভিত্তিক সমাজ শিল্পোন্নত, নগরভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হয়।
৪. কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস আধুনিকীকরণকে পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায়।
৫. এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): ডুর্খেইম আধুনিকীকরণকে শ্রম বিভাজনের (Division of labor) ক্রমবিকাশ হিসেবে দেখেছেন, যা সমাজকে যান্ত্রিক সংহতি (Mechanical solidarity) থেকে জৈব সংহতি (Organic solidarity) তে রূপান্তর করে।
৬. ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ওয়েবার আধুনিকীকরণকে যুক্তিবাদী (Rationalization) প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে সমাজ ধর্মীয় বা প্রথাগত মূল্যবোধ থেকে সরে এসে যুক্তিনির্ভর এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে প্রবেশ করে।
৭. অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে, আধুনিকীকরণ হলো কোনো কিছুকে আধুনিক করে তোলার প্রক্রিয়া বা অবস্থা; আধুনিক রীতিনীতি, ধারণা বা প্রযুক্তি গ্রহণ করা। (The process or state of becoming modern; the adoption of modern methods, ideas, or technology.)
৮. ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): তাদের মতে, আধুনিকীকরণ হলো সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া যা একটি প্রথাগত সমাজকে আধুনিক সমাজে রূপান্তরিত করে।
৯. এল.ডি. হোয়াইট (L. D. White): হোয়াইটের মতে, আধুনিকীকরণ হলো সেই পদ্ধতি যার মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্যবাহী থেকে আধুনিক এবং কার্যকর রূপ লাভ করে।
১০. অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাঁদের মতে, আধুনিকীকরণ হলো সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যা একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো এবং কার্যকারিতাকে আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্গঠন করে।
১১. সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): তাঁরা আধুনিকীকরণকে একটি বহুমুখী প্রক্রিয়া হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা সমাজের প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোগুলিকে পরিবর্তন করে। (Modernization is a multi-faceted process that transforms the technological, economic, social, and political structures of a society.)
১২. ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): ওয়াল্ডো আধুনিকীকরণকে একটি প্রশাসনিক বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে নতুনভাবে সংগঠিত করে।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা আধুনিকীকরণকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, এটি এমন একটি ধারাবাহিক ও বহুমুখী সামাজিক প্রক্রিয়া যা সমাজের প্রথাগত কাঠামো, প্রতিষ্ঠান এবং জীবনযাত্রাকে নতুন প্রযুক্তি, যুক্তিবাদী চিন্তা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের মাধ্যমে শিল্পোন্নত ও উন্নত রূপ দেয়।
উপসংহার: আধুনিকীকরণ কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি মানব সভ্যতার চলমান বিবর্তনের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এটি প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস এবং সম্পর্কের মধ্যেও গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে। যদিও এই প্রক্রিয়া সমাজে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করে, যেমন সাংস্কৃতিক ব্যবধান বা পরিবেশগত সমস্যা, তবুও এটি উন্নত জীবন, জ্ঞান এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। আধুনিকীকরণ তাই একাধারে অগ্রগতি এবং অভিযোজনের একটি অবিরাম যাত্রা।
আধুনিকীকরণ হলো পুরোনো ব্যবস্থা থেকে নতুন ও উন্নত ব্যবস্থায় উত্তরণের একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া।
আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়া বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে শুরু হয়েছে। শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয় ১৭৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে, যা আধুনিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল। ১৯৫০-এর দশকে পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীগণ এই প্রক্রিয়াকে একটি তত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে অনেক উন্নয়নশীল দেশ আধুনিকীকরণের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে, যার ফলে তাদের জিডিপি (GDP) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। যেমন, ১৯৯০ সালে চীনে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হয়, যা দেশটির দ্রুত আধুনিকীকরণের পথ খুলে দেয়। ২০২২ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ বিলিয়নেরও বেশি, যা তথ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের ব্যাপক বিস্তারকে নির্দেশ করে।

