- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানি এক গভীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল। এই চরম বিশৃঙ্খলা, অপমান এবং Weimar প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে তীব্র উগ্র জাতীয়তাবাদের বাণী ছড়িয়ে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসিবাদ জার্মানির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।
১। ভার্সাই চুক্তির অপমান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তি ছিল অত্যন্ত অপমানজনক এবং একপেশে। এই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির বিশাল ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের ওপর বিশাল অঙ্কের যুদ্ধক্ষতিপূরণ চাপানো হয়েছিল। জার্মান জনগণ এই চুক্তিকে একটি জাতীয় কলঙ্ক হিসেবে বিবেচনা করত এবং এর প্রতি চরম ক্ষুব্ধ ছিল। হিটলার এই গণঅসন্তোষকে পুঁজি করে চুক্তিটি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের মন জয় করেন।
২। অর্থনৈতিক মহামন্দা: ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা জার্মানির অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল। আমেরিকার ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়া বন্ধ করায় জার্মানির কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারায়। দেশে চরম বেকারত্ব, ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য দেখা দিলে সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে হিটলার জনগণকে চাকরি ও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন।
৩। ভীষণ মুদ্রাস্ফীতি: ১৯২০-এর দশকের শুরুতে জার্মানিতে মুদ্রাস্ফীতি এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে কাগজের টাকার মূল্য কাগজের টুকরোর সমান হয়ে যায়। এক টুকরো রুটি কিনতে মানুষকে বস্তা ভরে টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হতো, যা মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সাধারণ মানুষ তাদের জমানো সঞ্চয় হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব এবং সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। ভাইমার সরকারের এই অর্থনৈতিক ব্যর্থতা হিটলারের ক্ষমতায় আসার পথকে অনেক মসৃণ ও সহজ করে তোলে।
৪। ভাইমার সরকারের ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে গঠিত গণতান্ত্রিক ভাইমার প্রজাতন্ত্র দেশের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কোন্দল জনগণের মনে গণতন্ত্রের প্রতি তীব্র অনীহা তৈরি করে। মানুষ একটি স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী শাসনব্যবস্থার জন্য মনেপ্রাণে অপেক্ষা করছিল। হিটলার ভাইমার সরকারের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে দেশের একমাত্র ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
৫। হিটলারের ব্যক্তিত্ব: হিটলার ছিলেন অত্যন্ত চতুর, দূরদর্শী এবং এক জাদুকরী বাগ্মীতার অধিকারী নেতা। তাঁর কণ্ঠস্বর এবং আবেগঘন বক্তৃতা সাধারণ মানুষকে সহজেই সম্মোহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে পারত। তিনি জনসভায় এমনভাবে কথা বলতেন যেন জার্মানির সব সমস্যার সমাধান একমাত্র তাঁর কাছেই আছে। তাঁর এই অসামান্য নেতৃত্বগুণ এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
৬। কমিউনিজম আতঙ্ক: রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর জার্মানিতেও সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দেশের ধনী শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং ভূস্বামীরা তাদের সম্পত্তি হারানোর ভয়ে কমিউনিস্টদের তীব্র ঘৃণা ও ভয় করত। হিটলার নিজেকে কমিউনিজমের প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করায় এই প্রভাবশালী ধনী শ্রেণী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ফলে তারা নাৎসি দলকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন দিতে শুরু করে।
৭। নাৎসি প্রচারণানীতি: জোসেফ গোয়েবলসের পরিচালনায় নাৎসি দলের প্রচারণানীতি ছিল অত্যন্ত আধুনিক, বৈজ্ঞানিক এবং অবিশ্বাস্য রকমের কার্যকর। সংবাদপত্র, রেডিও, পোস্টার এবং বিশাল সব জনসভার মাধ্যমে হিটলারের মতাদর্শকে জার্মানির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তারা একটি মিথ্যাকে বারবার বলে সত্যে পরিণত করার কৌশল অবলম্বন করেছিল। এই সুনিপুণ প্রচারণার ফলে দেশের সাধারণ মানুষ খুব সহজেই নাৎসিবাদের মোহে অন্ধ হয়ে পড়ে।
৮। ইহুদিবিদ্বেষী মনোভাব: হিটলার জার্মানির সব ধরনের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যার জন্য সুকৌশলে ইহুদি সম্প্রদায়কে দায়ী করেছিলেন। তিনি প্রচার করেন যে, ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে। জার্মানদের মনে আগে থেকেই থাকা জাতিগত ক্ষোভকে তিনি ইহুদিবিদ্বেষে রূপ দিতে সক্ষম হন। এই বর্ণবাদী নীতি সাধারণ উগ্র জার্মানদের নাৎসি দলের দিকে ব্যাপকভাবে ধাবিত করেছিল।
৯। উগ্র জাতীয়তাবাদ: নাৎসি দল জার্মানদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আর্য জাতি। হিটলার প্রচার করেছিলেন যে আর্য রক্তে কোনো ভেজাল নেই এবং তারাই বিশ্ব শাসনের প্রকৃত অধিকারী। এই উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত ও অপমানিত জার্মানদের অহংকারকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। দেশের গৌরব ফিরিয়ে আনার এই উগ্র আকাঙ্ক্ষা তরুণ প্রজন্মকে নাৎসিবাদের দিকে অন্ধভাবে টেনে আনে।
১০। বেকারত্ব সমস্যা: মহামন্দার সময়ে জার্মানিতে বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিক্ষিত এবং কর্মক্ষম তরুণরা কাজ না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। হিটলার তাদের কর্মসংস্থান এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ভবিষ্যৎহীন এই বিশাল যুবসমাজ হিটলারের আশ্বাসে আশান্বিত হয়ে তাঁর দলের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
১১। সামরিক বাহিনীর সমর্থন: ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মান সামরিক বাহিনীকে মাত্র এক লাখ সদস্যে নামিয়ে এনে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। এতে দেশের গর্বিত সামরিক কর্মকর্তা এবং সেনারা ভাইমার সরকারের ওপর তীব্র অসন্তুষ্ট ছিল। হিটলার পুনরায় জার্মানিকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার এবং বিশাল সেনাবাহিনী গঠনের উন্মুক্ত ঘোষণা দেন। এই সামরিক পুনরুত্থানের প্রতিশ্রুতি পেয়ে দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও যুদ্ধফেরত সেনারা নাৎসিদের পাশে দাঁড়ায়।
১২। রাজনৈতিক সহিংসতা: নাৎসিদের একটি নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী ছিল যা ‘Stormtroopers’ বা SA নামে পরিচিত ছিল। এই বাহিনী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জনসভায় হামলা চালিয়ে দেশজুড়ে এক চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। তারা রাজপথে সমাজতান্ত্রিক ও অন্যান্য দলের কর্মীদের ওপর প্রকাশ্য সহিংসতা চালাত। এই ভীতিপ্রদ পরিবেশের কারণে সাধারণ মানুষ এবং বিরোধীরা নাৎসিদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলে।
১৩। ধনকুবেরদের অর্থায়ন: জার্মানির বড় বড় শিল্পপতি ও পুঁজিপতিরা নাৎসি দলকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিল। তারা ক্রুপ, থিসেন এর মতো বড় বড় কোম্পানির মালিক ছিলেন যারা বামপন্থী আন্দোলনকে ভয় পেতেন। এই বিশাল অর্থায়নের ফলে নাৎসি দল তাদের প্রচারণা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম দেশব্যাপী অত্যন্ত রাজকীয়ভাবে চালাতে পেরেছিল। অর্থের এই প্রাচুর্য নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের লড়াইকে অনেক বেশি বেগবান করেছিল।
১৪। ঐতিহাসিক রাজতন্ত্রের মোহ: জার্মানির সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ দীর্ঘকাল ধরে বিসমার্ক বা কাইজারের মতো শক্তিশালী একনায়কতান্ত্রিক শাসনে অভ্যস্ত ছিল। তারা নতুন আমদানিকৃত পশ্চিমা ধাঁচের দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি। তারা বিশ্বাস করত যে একজন শক্তিশালী নেতাই কেবল জার্মানিকে উদ্ধার করতে পারেন। হিটলারের একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব তাদের সেই পুরোনো রাজকীয় ঐতিহ্যের আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করেছিল।
১৫। কৃষকদের অসন্তোষ: বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে জার্মানির কৃষি খাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল এবং ফসলের দাম একদম কমে গিয়েছিল। ঋণের দায়ে জর্জরিত কৃষকেরা তাদের জমি হারিয়ে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ভাইমার সরকার গ্রামীণ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। হিটলার কৃষকদের ঋণ মওকুফ ও ভূসম্পত্তি রক্ষার আশ্বাস দিয়ে গ্রামীণ জার্মানির বিশাল ভোট ব্যাংক নিজের পক্ষে আনেন।
১৬। কূটনৈতিক ব্যর্থতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত ‘লিগ অব নেশনস’ বা জাতিপুঞ্জ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জার্মানির স্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। বিজয়ী রাষ্ট্রগুলো জার্মানিকে সব সময় আড়চোখে দেখত এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অবহেলা করত। ভাইমার সরকারের এই দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি জার্মানদের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। হিটলার আন্তর্জাতিক মঞ্চে জার্মানির হৃত গৌরব ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে মানুষের মন জয় করেন।
১৭। রাইখস্টাগ অগ্নিকাণ্ড: ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানির সংসদ ভবন বা রাইখস্টাগে একটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হিটলার অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই ঘটনার জন্য কমিউনিস্টদের দায়ী করেন এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এর মাধ্যমে তিনি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করেন এবং বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার শুরু করেন। এই সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল হিটলারের একচ্ছত্র ক্ষমতা দখলের পথ চূড়ান্তভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, হিটলারের একক প্রচেষ্টায় নয়, বরং তৎকালীন জার্মানির বহুমুখী সংকট নাৎসিবাদের উত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছিল। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক শূন্যতা এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভকে হিটলার অত্যন্ত চতুরভাবে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। এর ফলে জার্মানি একনায়কতন্ত্রের অন্ধকারের তলিয়ে যায়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহতম অধ্যায়।