- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ভূমিকা: বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিশ্বরাজনীতিতে দুটি ভয়াবহ ও উগ্র একনায়কতান্ত্রিক মতবাদের উত্থান ঘটেছিল—একটি ইতালির ফ্যাসিবাদ এবং অন্যটি জার্মানির নাৎসীবাদ। সাধারণ দৃষ্টিতে এদের একই রকম মনে হলেও গভীর আলোচনায় এদের আদর্শিক ও প্রয়োগগত ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক পার্থক্য চোখে পড়ে। নিচে তাদের মূল তফাতগুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
১। উত্থানের পটভূমি: ইতালিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর চরম অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং লিগ অব নেশনসের প্রতি জনগণের তীব্র অসন্তোষকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল। অন্যদিকে, জার্মানির নাৎসীবাদ গড়ে উঠেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের চরম গ্লানি এবং অপমানজনক ‘ভার্সাই চুক্তি’র প্রতিশোধ নেওয়ার উগ্র মানসিকতা থেকে। ফলে ফ্যাসিবাদের চেয়ে নাৎসীবাদের উত্থান ছিল অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং প্রতিশোধপরায়ণ।
২। মূল নেতা: ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি, যিনি নিজেকে ‘ইল দুচে’ বা সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পক্ষান্তরে, নাৎসীবাদ সম্পূর্ণভাবে আবর্তিত হয়েছিল অ্যাডলফ হিটলারের একক ব্যক্তিত্ব, উগ্র নেতৃত্ব এবং তাঁর রচিত ‘মেইন ক্যাম্প’ গ্রন্থের চরমপন্থী মতাদর্শকে কেন্দ্র করে। মুসোলিনির চেয়ে হিটলারের নেতৃত্ব ছিল অনেক বেশি সম্মোহনী, একগুঁয়ে এবং অনুসারীদের জন্য অন্ধভাবে বাধ্যতামূলক।
৩। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব: নাৎসীবাদের মূল ভিত্তিই ছিল চরম বর্ণবাদ এবং আর্য বা নর্ডিক জাতির রক্তের বিশুদ্ধতা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার এক উগ্র উন্মাদনা। হিটলার বিশ্বাস করতেন আর্যরাই পৃথিবীর একমাত্র শ্রেষ্ঠ জাতি এবং অন্য সব জাতি তাদের চেয়ে নিচু। কিন্তু মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের মূল ভিত্তি জাতি বা রক্ত ছিল না, বরং তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের গৌরব ফিরিয়ে আনা।
৪। ইহুদি বিদ্বেষ: নাৎসীবাদের অন্যতম প্রধান এবং ভয়ঙ্কর বৈশিষ্ট্য ছিল তীব্র ও প্রাতিষ্ঠানিক ইহুদি বিদ্বেষ, যার চরম পরিণতি ছিল ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা বা হলোকাস্ট। হিটলার ইহুদিদের জার্মানির সমস্ত সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করতেন এবং তাদের ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। তবে ফ্যাসিবাদের সূচনালগ্নে ইতালিতে এমন কোনো পদ্ধতিগত বা উগ্র ইহুদি বিদ্বেষের অস্তিত্ব ছিল না।
৫। রাষ্ট্রের ধারণা: ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে পবিত্র এবং চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যেখানে বলা হতো ‘রাষ্ট্রের বাইরে কিছুই নেই’। মুসোলিনির কাছে ব্যক্তি বা জাতির চেয়ে রাষ্ট্র কাঠামোটিই ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। অন্যদিকে, নাৎসীবাদ রাষ্ট্রকে কেবল একটি মাধ্যম মনে করত, যার মূল লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট ‘আর্য জাতি’র বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৬। মতাদর্শের ভিত্তি: ফ্যাসিবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় একনায়কতন্ত্রের দর্শন ছিল, যা রোমান ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের ওপর জোর দিত। পক্ষান্তরে, নাৎসীবাদ ছিল একাধারে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং চরম মাত্রায় একটি ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ও জীববৈজ্ঞানিক বর্ণবাদী মতাদর্শ। এই কারণে নাৎসীবাদ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সমাজকে ফ্যাসিবাদের চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।
৭। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: ফ্যাসিবাদী অর্থনীতিতে ‘কর্পোরেটিজম’ বা সমবায়বাদের প্রবর্তন করা হয়েছিল, যেখানে মালিক ও শ্রমিক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে একসঙ্গে কাজ করত। সেখানে ব্যক্তিগত সম্পত্তি টিকে থাকলেও তা পুরোপুরি রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে, নাৎসীবাদের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধকেন্দ্রিক এবং হিটলারের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সামরিকায়নের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একচেটিয়া ব্যবস্থা।
৮। সামাজিক ডারউইনবাদ: নাৎসীবাদ সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সামাজিক ডারউইনবাদ’ বা জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে চরমভাবে বিশ্বাস করত। হিটলার মনে করতেন কেবল শক্তিশালীরাই বেঁচে থাকবে এবং দুর্বলদের বিলুপ্ত হওয়াই প্রকৃতির নিয়ম। ফ্যাসিবাদের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব থাকলেও সমাজকে এভাবে পুরোপুরি জীববৈজ্ঞানিক লড়াইয়ের ময়দান হিসেবে তারা সংজ্ঞায়িত করেনি।
৯। দলের ভূমিকা: ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো ও রাজতন্ত্রকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে পারেনি। কিন্তু জার্মানিতে হিটলারের নাৎসী দল (NSDAP) রাষ্ট্রের সমস্ত অঙ্গকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিয়েছিল। নাৎসী বাহিনী বা এসএস (SS) ক্যাডাররা প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমান্তরাল এক সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করেছিল।
১০। ধর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: মুসোলিনি ইতালির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ অনুধাবন করে ক্যাথলিক চার্চ এবং পোপের সঙ্গে ‘ল্যাটারান চুক্তি’র মাধ্যমে একটি সমঝোতায় এসেছিলেন। তিনি ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। পক্ষান্তরে, নাৎসীবাদ খ্রিস্টধর্মের মৌলিক মানবিক মূল্যবোধের বিরোধী ছিল এবং হিটলার চার্চের ক্ষমতা খর্ব করে এক ধরণের নাস্তিক্যবাদী রাষ্ট্র গড়তে চেয়েছিলেন।
১১। সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য: ফ্যাসিবাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইতালির আধিপত্য বিস্তার করা এবং আফ্রিকার কিছু অংশে উপনিবেশ স্থাপন করে পুরনো রোমান সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করা। অপরদিকে, নাৎসীবাদের লক্ষ্য ছিল ‘লেবেনস্রাউম’ বা জার্মান জাতির জন্য পূর্ব ইউরোপে বিশাল বসবাসের জায়গা দখল করা। নাৎসীবাদ সমগ্র ইউরোপ তথা বিশ্বজুড়ে এক বিশাল আর্য সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন দেখত।
১২। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা: ফ্যাসিবাদী শাসনে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা বা রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হলেও সাধারণ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কিছুটা শিথিলতা ছিল। কিন্তু নাৎসীবাদে মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং চিন্তাগত স্বাধীনতা বলতে কিচ্ছু অবশিষ্ট রাখা হয়নি। হিটলারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘গেস্টাপো’ প্রতিটা নাগরিকের শোবার ঘর পর্যন্ত নজরদারির আওতায় নিয়ে এসেছিল।
১৩। নারী ও পরিবার: ফ্যাসিবাদ নারীদের মূলত ঐতিহ্যগত পারিবারিক দায়িত্ব পালন এবং রাষ্ট্রের জন্য বেশি বেশি সন্তান জন্মদানের জন্য উৎসাহিত করত। নাৎসীবাদও একই কাজ করত, তবে তাদের মূল শর্ত ছিল সন্তানকে অবশ্যই নিখাদ আর্য রক্তের হতে হবে। নাৎসী জার্মানিতে অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্মরোধ করতে নারীদের ওপর অমানবিক চিকিৎসা আইন চাপানো হয়েছিল।
১৪। শিল্প ও সংস্কৃতি: ফ্যাসিবাদী ইতালিতে আধুনিক শিল্প ও স্থাপত্যের কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা বা নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নাৎসী জার্মানিতে আধুনিক শিল্পকলাকে ‘ক্ষয়িষ্ণু শিল্প’ বা বিকৃত সংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। হিটলারের চিন্তাধারার বাইরের সমস্ত বই, চিত্রকলা এবং সঙ্গীতকে সেখানে পুড়িয়ে বা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।
১৫। শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থান: মুসোলিনি শ্রমিকদের ধর্মঘট করার অধিকার কেড়ে নিলেও রাষ্ট্রীয় কর্পোরেশনের মাধ্যমে তাদের কিছু সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নাৎসী শাসনে স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়নগুলো ভেঙে দিয়ে ‘জার্মান লেবার ফ্রন্ট’ গঠন করা হয়, যা শ্রমিকদের দাসে পরিণত করে। হিটলার শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করে পুঁজিপতিদের যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে বাধ্য করেছিলেন।
১৬। নিষ্ঠুরতার মাত্রা: ফ্যাসিবাদী শাসন অবশ্যই নিপীড়নমূলক ও স্বৈরাচারী ছিল, তবে সেখানে বিরোধীদের দমনে ঢালাও গণহত্যার পথ বেছে নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, নাৎসীবাদ ছিল ইতিহাসের চরমতম নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক এক শাসনব্যবস্থার নাম। তারা সুপরিকল্পিতভাবে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা গ্যাস চেম্বার বানিয়ে কোটি কোটি নিরীহ মানুষকে হত্যা করে চরম নির্মমতার নজির গড়েছিল।
১৭। চূড়ান্ত পরিণতি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ইতালির জনগণই মুসোলিনিকে বন্দি করে এবং পরে ১৯৪৫ সালে তাকে গুলি করে হত্যা করে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটায়। অন্য প্রান্তরে, জার্মানির পতনের মুহূর্তে হিটলার বার্লিনের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সস্ত্রীক আত্মহত্যা করেন এবং মিত্রবাহিনীর যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নাৎসীবাদের চিরতরে বিলুপ্তি ঘটে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীবাদ উভয়ই স্বৈরতন্ত্র এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের যমজ রূপ হলেও নাৎসীবাদ ছিল অনেক বেশি মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। ফ্যাসিবাদ যেখানে রাষ্ট্রকে সর্বশক্তিমান করতে চেয়েছিল, নাৎসীবাদ সেখানে বর্ণবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে মানবতাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর এই দুটি কালো অধ্যায় বিশ্ববাসীকে চিরদিনের জন্য একনায়কতন্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে গেছে।