- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে সামরিক অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসন ছিল একটি নিয়মিত চিত্র। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই প্রবণতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান ভূ-রাজনীতি, সচেতনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করেছে।
১। গণতান্ত্রিক সচেতনতা: বর্তমান যুগে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জনগণের মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন বুলেটের চেয়ে ব্যালটের শক্তিতে বেশি বিশ্বাস করে। সামরিক শাসন যে দেশের দীর্ঘমেয়াদী কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না, তা সাধারণ নাগরিকরা বুঝতে পেরেছেন। ফলে যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনগণের তীব্র প্রতিরোধ গড়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
২। বিশ্বায়ন ও যোগাযোগ: তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব এবং বিশ্বায়নের ফলে আজ কোনো দেশের সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা গোপন রাখা অসম্ভব। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্ববাসী স্বৈরাচারী পদক্ষেপের কথা জেনে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। এই তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া এবং জনমতের চাপ সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে থাকতে বাধ্য করে। তারা বুঝতে পারে যে আধুনিক যুগে জোর করে ক্ষমতা দখল করা সহজ নয়।
৩। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা: বর্তমানে কোনো দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটলে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পরাশক্তিগুলো দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, যা সামলানো সামরিক জান্তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার এই ভয় সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে রাখছে।
৪। আঞ্চলিক জোট: আফ্রিকান ইউনিয়ন (AU), আসিয়ান (ASEAN) বা ওএএস (OAS)-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো এখন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। কোনো সদস্য দেশে অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল হলে তাকে সরাসরি জোট থেকে বহিষ্কার বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এই আঞ্চলিক একাকীত্ব এবং রাজনৈতিক চাপ সামরিক অভ্যুত্থানের পথকে অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছে।
৫। সাহায্য বন্ধের হুমকি: তৃতীয় বিশ্বের অনগ্রসর দেশগুলো উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক সাহায্য, অনুদান এবং বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর ঋণের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে এই সমস্ত দাতা সংস্থা ও দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের আর্থিক সাহায্য ও ঋণ সুবিধা বন্ধ করে দেয়। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে অনুন্নত দেশগুলোর সামরিক নেতৃত্ব ক্ষমতা দখলের ঝুঁকি নিতে চায় না।
৬। আইনের শাসন: গত কয়েক দশকে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীন ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে। অতীতে অনেক সামরিক অভ্যুত্থানকে আদালত বৈধতা দিলেও, বর্তমান বিচারব্যবস্থা অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করছে। আইনি পরিণতি ও কঠোর শাস্তির এই ভয় সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষমতার লোভ থেকে দূরে রাখছে।
৭। নাগরিক সমাজ: আধুনিক বিশ্বে শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটি গড়ে উঠেছে। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। তাদের এই নিরলস ওয়াচডগ বা পাহারাদারের ভূমিকা রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশ ঠেকাতে একটি বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
৮। পেশাদারিত্বের বিকাশ: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও চিন্তাভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মধ্যে উচ্চ পেশাদারিত্বের বিকাশ ঘটেছে। তারা এখন নিজেদের মূল দায়িত্ব অর্থাৎ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং প্রতিরক্ষার কাজেই মনোনিবেশ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
৯। জাতিসংঘ শান্তিমিশন: জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলো ব্যাপক আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা লাভ করছে। কোনো দেশের সেনাবাহিনী যদি নিজ দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়, তবে জাতিসংঘ সেই দেশের শান্তিমিশনে অংশগ্রহণ বাতিল বা সীমিত করে দেয়। এই বিশাল মর্যাদাপূর্ণ সুযোগ এবং আর্থিক ক্ষতি এড়াতে সামরিক বাহিনী রাজনীতি থেকে দূরে থাকে।
১০। রাজনৈতিক পরিপক্কতা: অতীতে তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র কোন্দল ও অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করত। তবে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক বেশি পরিপক্ক ও দূরদর্শী আচরণ করছে। দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার বিরোধ যতই থাকুক না কেন, তারা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ অবস্থান নেয়, যা সামরিক বাহিনীকে নিরুৎসাহিত করে।
১১। অর্থনৈতিক সংস্কার: অর্থনৈতিক উন্মুক্তকরণ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রসারের ফলে ব্যবসায়ী সমাজ এখন রাজনীতিতে বড় প্রভাবক। যেকোনো দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলে পুঁজিবাজার ধসে পড়ে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয়। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে পর্দার আড়াল থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেন।
১২। মানবাধিকারের চাপ: বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। সামরিক শাসনামলে সাধারণত ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে থাকে, যার ওপর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কড়া নজর রাখে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বা বৈশ্বিক চাপের মুখে পড়ার ভয়ে সামরিক কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকছেন।
১৩। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: স্যাটেলাইট চ্যানেল, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং স্বাধীন সংবাদপত্রের কল্যাণে গণমাধ্যম এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। যেকোনো অন্যায় বা সামরিক তৎপরতার খবর মুহূর্তের মধ্যে জনগণের সামনে চলে আসে। গণমাধ্যমের এই তীব্র নজরদারি ও সাহসিকতার কারণে পর্দার আড়ালে বসে সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করা এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
১৪। বৈদেশিক নীতি: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বর্তমান বৈদেশিক নীতিতে গণতন্ত্রের প্রসারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে স্বৈরাচারী বা সামরিক সরকারকে তারা কোনো ধরনের কূটনৈতিক স্বীকৃতি বা সহযোগিতা দেবে না। এই দৃঢ় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ভয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপ হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ।
১৫। শিক্ষার প্রসার: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক সচেতনতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষিত তরুণ সমাজ স্বৈরতন্ত্র বা সামরিক শাসনের চেয়ে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বেশি পছন্দ করে। এই বিশাল তরুণ ও সচেতন জনগোষ্ঠীকে দমন করে সামরিক শাসন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলেই সেনাবাহিনী এখন রাজনীতিবিমুখ হচ্ছে।
১৬। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান: গত শতাব্দীর স্নায়ুযুদ্ধের সময় পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সামরিক অভ্যুত্থানে মদদ দিত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতির সেই মেরুকরণ আর নেই। এখন কোনো পরাশক্তিই সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থানকে সমর্থন বা অর্থায়ন করে না, যা এই প্রবণতা হ্রাসের অন্যতম বড় কারণ।
১৭। সাংবিধানিক সুরক্ষা: আধুনিক সময়ে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ তাদের সংবিধানে এমন কিছু কঠোর ধারা যুক্ত করেছে, যা সামরিক অভ্যুত্থানকে চিরতরে নিষিদ্ধ করে। সংবিধান লঙ্ঘন বা স্থগিত করার শাস্তিকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সাংবিধানিক কঠোরতা ও আইনি প্রাচীর সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে সীমাবদ্ধ রাখতে এবং আইন মেনে চলতে বাধ্য করছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের চিরবিদায় সম্পূর্ণ না হলেও, তা যে উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে তা অনস্বীকার্য। বিশ্বায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক পরিপক্কতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই মূলত এই পরিবর্তন এনেছে। এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে আগামী দিনে এই দেশগুলোতে গণতন্ত্র আরও সুসংহত হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের এই অনুপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি ও আশাব্যঞ্জক।