- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নয় বছরের শাসনকাল এক বিতর্কিত অধ্যায়। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর একনায়কতান্ত্রিক শাসন স্থায়ী হয়। তীব্র গণ-আন্দোলন এবং সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের মুখে অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এই সামরিক সরকারের পতন ঘটে।
এরশাদ সরকারের পতনের কারণসমূহ
১। সামরিক অভ্যুত্থান: ১৯৮২ সালে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এই অসাংবিধানিক ক্ষমতা গ্রহণকে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেনি। একটি গণতান্ত্রিক ধারাকে জোরপূর্বক নসাৎ করার কারণে প্রথম দিন থেকেই তাঁর সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অসন্তোষই পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের পতনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
২। গণতন্ত্র হত্যা: এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে ধ্বংস করে ফেলেন। মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয় এবং সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। দীর্ঘ নয় বছর ধরে দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়ে জনগণের মনে যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল, তা একসময় গণ-বিস্ফোরণে রূপ নেয় এবং সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে।
৩। ভোট কারচুপি: এরশাদ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ প্রহসনমূলক। মিডিয়া ক্যু এবং ব্যাপক ভোট কারচুপির মাধ্যমে জোর করে নিজেদের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হতো। জনগণ ভোটকেন্দ্রে না গেলেও ভোটার উপস্থিতির কাল্পনিক তথ্য প্রচার করা হতো। এই প্রহসনের নির্বাচনের ফলে সরকারের প্রতি জনগণের চরম অনাস্থা তৈরি হয়, যা তাঁর পতনকে অনিবার্য করে তোলে।
৪। রাজনৈতিক ঐক্য: এরশাদের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব ঐক্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাত দল এবং বামপন্থীদের পাঁচ দলীয় জোট একসঙ্গে আন্দোলনে নামে। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে দলগুলো স্বৈরাচার বিরোধী তিন জোটের রূপরেখা ঘোষণা করে। এই ইস্পাতকঠিন রাজনৈতিক ঐক্যের সামনে এরশাদ সরকার সম্পূর্ণ একঘরে ও দুর্বল হয়ে পড়ে।
৫। ছাত্র আন্দোলন: বাংলাদেশের সকল ঐতিহাসিক আন্দোলনের মতো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রসমাজ মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ গঠন করে। জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, ফারুক ও জিহাদের মতো অসংখ্য ছাত্রনেতার আত্মত্যাগ আন্দোলনকে দাবানলের মতো দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়। ছাত্রদের এই আপসহীন ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ এরশাদ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
৬। নূর হোসেনের আত্মত্যাগ: ১৯৯০ সালের ১০ই নভেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেনের শাহাদাত বরণ ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর বুকে ও পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এই কালজয়ী স্লোগান। পুলিশের গুলিতে তাঁর এই নির্মম মৃত্যু দেশের সাধারণ মানুষের বিবেককে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। নূর হোসেনের রক্তে ভেজা সেই শার্ট আন্দোলনের নতুন প্রতীক হয়ে ওঠে এবং রাজপথ জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
৭। ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড: ১৯৯০ সালের ২৭শে নভেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব ডা. শামসুল আলম মিলনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। একজন পেশাজীবী চিকিৎসককে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার ঘটনায় দেশের সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবী সমাজ স্তব্ধ হয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের পর চিকিৎসকরা একযোগে কর্মবিরতি শুরু করেন এবং আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। ডা. মিলনের শাহাদাত এরশাদ সরকারের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল।
৮। পেশাজীবীদের ভূমিকা: স্বৈরাচার বিরোধী এই আন্দোলনে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও শিক্ষকসহ সকল স্তরের পেশাজীবী সমাজ প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের প্রতি তীব্র অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। পেশাজীবীদের সম্মিলিত সংগঠন ‘সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ’ আন্দোলনের সপক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। এই বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণীর অসহযোগিতার কারণে সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছিল।
৯। সাংস্কৃতিক জাগরণ: স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দেশের কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও শিল্পীরা তাঁদের লেখনী এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ গঠন করে কবিতার মাধ্যমে স্বৈরাচারের দুঃশাসনের চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা হতো। রাজপথে পথনাটক, গণসঙ্গীত এবং আবৃত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে আন্দোলনের প্রতি উজ্জীবিত করা হতো। এই সাংস্কৃতিক জাগরণ আন্দোলনের পক্ষে একটি বিশাল জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১০। অর্থনৈতিক বিপর্যয়: এরশাদ সরকারের আমলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং স্বজনপ্রীতির কারণে দেশের অর্থনীতি প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং বেকারত্ব সাধারণ মানুষের জীবনকে এক দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ নিজেদের বাঁচার তাগিদেই স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
১১। ব্যাপক দুর্নীতি: এরশাদ সরকারের নয় বছরের শাসনামল ছিল দুর্নীতি ও লুটপাটের এক কালো অধ্যায়। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট, ভুয়া প্রকল্প তৈরি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। সরকারের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সীমাহীন দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খবর যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষ এই সরকারকে হঠাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
১২। উপজেলা পদ্ধতি: এরশাদ গ্রামীণ জনগণের সমর্থন পাওয়ার আশায় এবং ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেছিলেন। কিন্তু এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না হয়ে গ্রামীণ পর্যায়ে দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। গ্রামীণ টাউট ও প্রভাবশালীদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে এরশাদ একটি নিজস্ব বলয় তৈরি করতে চেয়েছিলেন। জনগণের ট্যাক্সের টাকার এই অপব্যবহার গ্রামীণ সমাজেও সরকারের বিরুদ্ধে এক ধরণের নীরব অসন্তোষ তৈরি করেছিল।
১৩। সংবাদপত্রের ওপর দমন: এরশাদ সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করেছিল এবং গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল। সরকারের সমালোচনা করে কোনো সংবাদ প্রকাশ করলে সেই পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হতো এবং সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হতো। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওতে কেবল সরকারের গুণগান গেয়ে ভুয়া খবর প্রচার করা হতো, যা মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। তথ্যের এই অবরুদ্ধ পরিবেশ মানুষকে বিকল্প উপায়ে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করে।
১৪। আন্তর্জাতিক চাপ: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে, যার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং স্বৈরাচারী শাসকদের প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন কমে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ দাতা গোষ্ঠীগুলো এরশাদ সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্র হরণের জন্য চাপ দিতে থাকে। বিদেশি সাহায্য বন্ধের হুমকি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক চাপ এরশাদকে মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল করে ফেলেছিল।
১৫। জনগণের অসহযোগ: আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এসে সাধারণ জনগণ এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দেন এবং ট্যাক্স বা খাজনা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে এবং সরকারের কোনো আদেশ কেউ মানছিল না। এই সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ফলে এরশাদ সরকারের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছিল।
১৬। সান্ধ্য আইন অমান্য: আন্দোলন দমন করতে এরশাদ সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং সান্ধ্য আইন বা কারফিউ ঘোষণা করে। কিন্তু স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করতে বীর জনতা সেই কঠোর সান্ধ্য আইন ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। লাখ লাখ মানুষের মিছিলের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে। জনগণের এই অকুতোভয় মনোভাব প্রমাণ করেছিল যে বুলেটের ভয় দেখিয়ে আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
১৭। সামরিক বাহিনীর অনীহা: এরশাদ সরকারের পতনের চূড়ান্ত কারণ ছিল দেশের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়া। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দীন খান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দেশের এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী জনগণের ওপর গুলি চালাবে না। নিজের মূল শক্তির উৎস সেনাবাহিনী যখন এরশাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তাঁর সামনে পদত্যাগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প রাস্তা খোলা ছিল না।
উপসংহার: ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র, জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর এক গৌরবময় বিজয়। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, দীর্ঘ ত্যাগ এবং সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ মাত্র নয় বছরের এক স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। এই পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ সুগম হয় এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারা প্রবর্তিত হয়। এরশাদ সরকারের পতন প্রমাণ করে যে, জনগণের শক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই।