- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। দীর্ঘদিনের সামরিক শাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদের ফল ছিল এই গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের পতন ঘটে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান কারণসমূহ:
১। স্বৈরাচারী শাসন: ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দীর্ঘ সময় রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাঁর শাসনামলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয় এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
২। গণতন্ত্রের সংকট: ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। দীর্ঘ সামরিক শাসনের কারণে জনগণের সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, যা পরবর্তীতে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
৩। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন: এরশাদ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন দমন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সভা-সমাবেশে বাধা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। এসব কারণে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়।
৪। ছাত্র আন্দোলন: ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৮০-এর দশক থেকেই ছাত্রদের ধারাবাহিক আন্দোলন এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের ভিত্তি শক্তিশালী করে।
৫। তিন জোটের আন্দোলন: ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলোর ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তিন জোট স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করে। তাদের যৌথ কর্মসূচি জনগণের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
৬। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা: এরশাদ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তারা মনে করত, এসব নির্বাচনে জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। তাই নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আন্দোলনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
৭। অর্থনৈতিক সমস্যা: এরশাদ সরকারের সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, আয় বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সমস্যাগুলো সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়।
৮। বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা: গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এরশাদ সরকারের সময়ে গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। সংবাদপত্র ও বিরোধী মতের ওপর নিয়ন্ত্রণ জনগণের অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে এবং আন্দোলনের পরিবেশ তৈরি করে।
৯। স্বৈরাচারবিরোধী জনমত: দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সংকট ও জনগণের অধিকার সীমিত হওয়ার কারণে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। ছাত্র, শ্রমিক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। এই ঐক্যবদ্ধ জনমত গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল।
১০। গণতান্ত্রিক শাসনের আকাঙ্ক্ষা: বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে নির্বাচিত সরকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান ছিল। জনগণ চেয়েছিল তাদের ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের অধিকার নিশ্চিত হোক। এই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফলে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।