- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো রাজনৈতিক সন্ত্রাস। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সহিংসতাকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে। তাই টেকসই জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে এই সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির লাগাম টানা এবং তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা আজ সময়ের দাবি।
রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণের উপায়সমূহ:
১। গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনের প্রধান হাতিয়ার হলো लोकतांत्रिक প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবে না থেকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে, তখন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য দলগুলো সহিংসতার পথ পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় অংশ নেবে।
২। আইনের শাসন: সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের পরিচয় যা-ই হোক না কেন, তাদের অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় বা প্রশ্রয় যেন অপরাধীরা না পায়, প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসন যখন কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন অপরাধীরা সহিংসতা করতে ভয় পাবে এবং রাজনৈতিক সন্ত্রাস অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
৩। সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য এবং সহনশীলতার মনোভাব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ও বিরোধী দল একে অপরকে শত্রু ভাবার মানসিকতা পরিহার করে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতীয় সংকটে একসঙ্গে বসে আলোচনা করার সংস্কৃতি চালু করলে রাজনৈতিক দূরত্বের অবসান ঘটে। এই সহনশীল পরিবেশ তৃণমূল কর্মীদের মাঝেও প্রতিফলিত হয়, যা মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাস সরাসরি কমিয়ে আনে।
৪। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ: অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা ও বেকারত্ব তরুণ সমাজকে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের দিকে ধাবিত করার অন্যতম প্রধান কারণ। রাষ্ট্রকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। দেশের সম্পদ যখন সুষমভাবে বণ্টিত হবে এবং সবাই অর্থনৈতিক সুযোগ পাবে, তখন কেউ সহজে প্রলোভনে পড়বে না। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নাগরিকরা কখনোই রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার বা ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে চায় না।
৫। শিক্ষার প্রসার: নৈতিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষার প্রসার রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ভূমিকা পালন করতে পারে। যুবসমাজকে কেবল পুথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত না করে তাদের মাঝে দেশপ্রেম, মানবিকতা ও পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দিতে হবে। সচেতন ও শিক্ষিত নাগরিক সমাজ সহজেই রাজনৈতিক দলগুলোর কুৎসিত চক্রান্ত ও সহিংসতার কুফল বুঝতে পারে। ফলে তারা অন্ধভাবে কোনো দলের হয়ে সহিংস কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে রাখে।
৬। বেকারত্ব দূরীকরণ: যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মূলধারার অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করা গেলে রাজনৈতিক সন্ত্রাস অনেকাংশে কমে যায়। উন্নয়নশীল দেশে বেকার যুবকদের সামান্য অর্থের লোভ দেখিয়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। সরকার যদি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তরুণদের ব্যস্ত ও স্বাবলম্বী রাখতে পারে, তবে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াবে না। কর্মসংস্থান যুবসমাজকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।
৭। স্বাধীন গণমাধ্যম: সমাজ থেকে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দূর করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী ও অপরিসীম। দেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে কোনো ভয়ভীতি ছাড়া নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করার স্বাধীনতা দিতে হবে। গণমাধ্যম যখন সন্ত্রাসের গডফাদার ও অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করবে, তখন সমাজ ও রাজনীতিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। এই সামাজিক নজরদারি রাজনৈতিক দলগুলোকে সহিংস পথ পরিহার করে জনকল্যাণমুখী রাজনীতি করতে বাধ্য করবে।
৮। সুশীল সমাজের ভূমিকা: রাজনৈতিক সন্ত্রাস প্রতিরোধে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সুশীল সমাজ নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে পারে। তারা বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে সহিংসতার ভয়াবহতা জনগণের সামনে তুলে ধরে সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাদের এই গঠনমূলক সমালোচনা ও সামাজিক চাপ রাজনৈতিক দলগুলোকে শান্তিকামী আচরণ করতে বাধ্য করে।
৯। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারি প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিকরণ মুক্ত রাখতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসন যদি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ না করে, তবে অপরাধীরা পার পাবে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কেবল দেশের প্রচলিত আইন ও জননিরাপত্তার স্বার্থে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসনের এই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে এবং সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করে।
১০। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা রাজনৈতিক সন্ত্রাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সরকারকে অত্যন্ত কঠোর হস্তে দেশ থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ, কেনাবেচা এবং এর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে সব ধরনের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরি। সমাজে যখন অস্ত্রের সহজলভ্যতার অবসান ঘটবে, তখন রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেও সহজে বড় ধরনের সহিংসতা করতে পারবে না।
১১। সুষ্ঠু নির্বাচন: একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা রাজনৈতিক অসন্তোষ দূর করার মূল চাবিকাঠি। নাগরিকরা যখন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, তখন ক্ষোভের জন্ম হয় না। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সব রাজনৈতিক দল ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায় এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণের ফলে ক্ষমতার জন্য রাস্তায় নেমে ভাঙচুর বা সন্ত্রাসের পথ বাছতে হয় না।
১২। সংলাপ ও সমঝোতা: যেকোনো রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে। আলোচনার টেবিলে বসে সমঝোতার মাধ্যমে বড় বড় রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, যা সহিংসতার আশঙ্কা দূর করে। উন্নয়নশীল দেশে দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবই অনেক সময় মাঠপর্যায়ে সহিংস রূপ ধারণ করে। তাই নিয়মিত আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সংলাপের আয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
১৩। ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা: সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সঠিক ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সব ধর্মই মানবতাবোধ, অহিংসা, ভ্রাতৃত্ব এবং পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, যা তরুণ সমাজকে অপরাধ থেকে দূরে রাখে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে যদি যুবসমাজকে রাজনৈতিক সহিংসতার কুফল এবং শান্তির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চেতনা মানুষকে যেকোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে।
১৪। অপরাজনীতি বর্জন: রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থে সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করার বা তাদের লালন-পালন করার অপসংস্কৃতি বর্জন করতে হবে। কোনো অপরাধীকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রক্ষা করার মানসিকতা ত্যাগ করা দলগুলোর নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দলগুলো যখন অপরাধীদের দল থেকে বহিষ্কার করবে এবং তাদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করবে, তখন সন্ত্রাসীরা একা হয়ে পড়বে। এই রাজনৈতিক সদিচ্ছা সমাজ থেকে স্থায়ীভাবে সন্ত্রাস ও সহিংসতা দূর করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
১৫। আইনি সংস্কার: যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত প্রচলিত আইনগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা উচিত। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলার বিচার সম্পন্ন করে অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর গলে যেন কোনো বড় মাপের সন্ত্রাসী বা গডফাদার পার পেয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কঠোর ও আধুনিক আইনি কাঠামো অপরাধীদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে এবং সন্ত্রাস ছড়ানো বন্ধ করে।
১৬। যুব উন্নয়ন কর্মসূচি: তরুণদের সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে দেশব্যাপী বিভিন্ন যুব উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞান চর্চা এবং সমাজসেবামূলক কাজে যুবসমাজকে নিয়োজিত করলে তাদের মানসিক বিকাশ ইতিবাচক হয়। অবসাদ ও হতাশাগ্রস্ত তরুণরাই সাধারণত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ফাঁদে পা দেয়, তাই তাদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা উচিত। এই কর্মসূচিগুলো তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করে দেশের মূল্যবান মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে।
১৭। আঞ্চলিক সহযোগিতা: বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক সন্ত্রাস কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, অনেক সময় এর সাথে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক যোগসূত্র থাকে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সীমান্ত নিরাপত্তা, অপরাধী প্রত্যর্পণ এবং তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে গিয়ে আত্মগোপন বা আশ্রয় লাভ করতে পারবে না। এই যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহে রাজনৈতিক সন্ত্রাস কেবল একটি আইনশৃঙ্খলাগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক ব্যাধি। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুশাসন এবং জনগণের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সব পক্ষ যদি জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তবেই একটি শান্তিময়, সহিংসতামুক্ত এবং সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হবে।